Ecommerce/blog/news portal

পলাশ চন্দ্র দে। আমার বন্ধু


আমাদের গ্রামখানি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া এক টুকরো স্বর্গ। গ্রামের পূর্ব দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়, যার গায়ে সকালের রোদ পড়লে সোনার মতো ঝিলমিল করে ওঠে। ছোটবেলায় আমরা দল বেঁধে সেই পাহাড়ে যেতাম কাঠ কাটতে। কাঁধে দা, নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠতাম, পথের ধারে বুনো ফুলের গন্ধ আর পাখির ডাকে মন ভরে যেত। কাঠ কেটে বোঝা বাঁধতাম, তারপর ঘামে ভেজা গায়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরতাম।

বর্ষাকাল এলে আমাদের গ্রামের রূপ পাল্টে যেত সম্পূর্ণ। মাঠঘাট জলে ভরে যেত, খাল-বিল একাকার হয়ে যেত চারদিকে। তখন আমরা মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়তাম । কই, শিং, মাগুর, পুঁটি মাছে ভরে যেত আমাদের ডালা। কাদামাখা শরীরে, ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফেরার সেই আনন্দ আজও ভুলিনি।

সন্ধ্যা নামলে গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত প্রদীপ। তখন বিদ্যুৎ ছিলো না।, দূর থেকে ভেসে আসত রাখালের বাঁশির সুর।আর শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক।এমনি করে পাহাড়, ছোট নদী, মাঠ, আর সহজ-সরল মানুষের ভালোবাসায় গড়া আমাদের গ্রাম আজও আমার স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে আছে।

মেহেদিনগরেই আমার ছোটবেলা কেটেছে।

আর এই মেহেদিনগরেই আমার একজন বন্ধু ছিল।তার নাম পলাশ।

পলাশ কে এখন মনে করলে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেটা হলো একটা ফুটফুটে সুন্দর ছেলে। চেহারায় একটা অদ্ভুত মায়া ছিল। চুলগুলো ছিল কোকড়ানো। ছোটবেলায় তার মা যখন চুল আঁচড়ে দিতেন, তখন চুলগুলো পুরোপুরি বশ মানত না। একটু পরেই আবার কোকড়ানো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।মায়ের কাছে পলাশ ছিল আদরের ছেলে। বাবার কাছেও।

বাড়ির সবার চোখের মণি ছিল সে।

আমাদের বন্ধুত্বটা খুব বড় কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হয়নি

। আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম। পাশাপাশি বসতাম। একসঙ্গে পড়তাম। একসঙ্গে হাসতাম। কখনো অঙ্ক বুঝতে না পারলে একজন আরেকজনকে বুঝিয়ে দিতাম।হারাধন স্যারের কাছে আমরা দুজন অঙ্ক পড়তাম।হারাধন স্যার অঙ্ক খুব সুন্দর করে বুঝাতেন। তার পড়ানোর মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ ছিল। কঠিন অঙ্কও তিনি এমনভাবে বুঝাতেন, মনে হতো অঙ্ক আসলে কঠিন কোনো জিনিস না। শুধু ঠিক জায়গাটা বুঝে ফেলতে হয়।পলাশ অঙ্কে খুব ভালো ছিল।আসলে ভালো বললে কম বলা হয়। অঙ্কের ওপর তার একটা আলাদা দখল ছিল। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোও খুব ভালো বুঝত। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, এই ছেলেটা যদি ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে, অনেক দূর যাবে।

এসএসসিতে আমরা দুজনেই ভালো করলাম। তারপর দুজনেই নিজামপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলাম।সেই সময় আমাদের জীবনটা ছিল খুব সুন্দর।দুজনেই কলেজের হোস্টেলে রুম নিলাম। একই রুমে থাকতাম। একই মেসে খাওয়া দাওয়া করতাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে কাটত।পলাশ বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হলো।আমি বিজ্ঞান থেকে ভালো ফল করেও আর্টসে ভর্তি হলাম।

আমার জীবনে তখন একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। কে আমাকে কোন পথে যেতে হবে সেটা বলবে, এমন কেউ ছিল না। পড়াশোনায় আমি খারাপ ছিলাম না। বরং নিজের প্রতি একটু বেশি বিশ্বাস ছিল। কিন্তু জীবনের পথ দেখানোর মতো কোনো গাইড ছিল না।কখনো কখনো একটা ছেলে খুব মেধাবী হয়েও শুধু পথ দেখানোর অভাবে অন্যদিকে চলে যায়।আমার জীবনেও হয়তো তেমন কিছু হয়েছিল।

কিন্তু পলাশ বিজ্ঞানেই রয়ে গেল।হোস্টেলের সেই ছোট্ট রুমটা এখনো মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে।দুজনের বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা খাটে কাপড়। টেবিলের ওপর খাতা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে কলেজের মাঠ দেখা যায়।রাতে পড়তে পড়তে কখন যে ঘুম চলে আসত, বুঝতাম না।সকালে একজন আরেকজনকে ডাকতাম।এই ওঠ।ক্লাস আছে।আরেকটু ঘুমাই।আরে বেটা,আরেকটু ঘুমালে স্যার তোরে উঠায় দিবে।এই ছিল আমাদের জীবন।

বাড়িতে যাওয়ার আগে বলত, তোর বাড়িতে কোনো খবর দেয়া লাগবে?কখনো পলাশ বাড়িতে যেত।সে বাড়িতে গিয়ে আমার পরিবারের কাছে আমার খবর দিত।আবার আমি যখন বাড়িতে আসতাম, তাকে হোস্টেলে রেখে তার বাড়িতে গিয়ে খবর দিতাম।এই ছোট ছোট কাজগুলো তখন আমাদের কাছে কোনো বিশেষ ব্যাপার ছিল না।বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই।

তখন বোঝা যায় না, কোন স্মৃতিটা একদিন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে।পলাশের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল।তার মা আমাকে খুব পছন্দ করতেন।আমি তাকে মাসিমা বলে ডাকতাম।মাসিমা আমাকে দেখলেই খুব আদর করতেন।কখনো লাড্ডু দিতেন।আমি লাড্ডু খেতাম আর ভাবতাম, এই বাড়িতে আসলে আমার নিজের বাড়ির মতোই লাগে।পলাশের বোনও আমাকে খুব শ্রদ্ধা করত। বড় ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে আমার প্রতি তার একটা আলাদা সম্মান ছিল।

পলাশ ও আমাদের বাড়িতে আসত।আমার বাবার অসুখ বিসুখ হলে সে ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে আসত। কখনো ইঞ্জেকশন নিয়ে আসত। কখনো স্যালাইন নিয়ে আসত।তখন বুঝিনি, বন্ধুত্বের অর্থ অনেক সময় বড় বড় কথা নয়।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, একজন অসুস্থ মানুষের জন্য ওষুধ নিয়ে বাড়িতে চলে আসা।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তার বাবার পাশে দাঁড়ানো।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, বন্ধুর মা তোমাকে লাড্ডু দিলে নিজের মায়ের মতো করে সেই লাড্ডু খেয়ে ফেলা।পলাশ এমনই একজন বন্ধু ছিল।

তারপর জীবন বদলাতে শুরু করল।পলাশের পড়াশোনা আর বেশি দূর এগোতে পারল না।ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ল।তারপর সংসারের চাপ এসে তার সামনে দাঁড়াল।

বোনের বিয়ে।

পারিবারিক দায়িত্ব।টাকার অভাব।

আর তার ওপর বাবার মৃত্যু।

বাবা মারা যাওয়ার পর ওর ওপর দায়িত্ব যেন এক লাফে অনেক গুণ বেড়ে গেল।

একটা ছেলে তখন আর শুধু ছেলে থাকে না।সে হয়ে যায় পরিবারের ভরসা।মায়ের ভরসা।বোনের ভরসা।ঘরের ভরসা।নিজের স্বপ্ন তখন অনেক সময় নিজের কাছেই ছোট হয়ে যায়।

পলাশ ও হয়তো নিজের স্বপ্নগুলো এক এক করে সরিয়ে রাখছিল।তারপর সে ফার্মেসির কাজে ঢুকে গেল।মেহেদিনগর রোডে তাদের ফার্মেসি ছিল।তার বাবা আগে ফার্মেসি চালাতেন। পরে পলাশ সেখানে বসত।ফার্মেসিটা ভালোই চলত।গ্রামের মানুষ তাকে চিনত।কেউ ওষুধ নিতে আসত।কেউ অসুখের কথা বলত।কেউ পরামর্শ চাইত।পলাশ ধৈর্য ধরে সবার কথা শুনত।তার স্বভাবটাই এমন ছিল।মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলতে পারত।আমার তখন বিদেশ নিয়ে অনেক ব্যস্ততা ছিল।এই অংশটা আজ আর বলব না।কারণ কিছু গল্পের কিছু দরজা পরে খুলতে হয়।আজ শুধু এতটুকুই থাক।আমি দূরে ছিলাম।ও মেহেদিনগরে ছিল।ফার্মেসিতে বসত।সংসার করত।মায়ের দেখাশোনা করত।নিজের মতো করে জীবন চালানোর চেষ্টা করত।

তারপর একদিন খবর পেলাম, ওর জীবনে ভালো সময় নেই।ধার হয়েছে।অনেক ধার।গ্রামের অনেক মানুষের কাছ থেকে সে টাকা নিয়েছিল।সম্ভবত সব ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি।মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া খুব সহজ।ফেরত দেওয়াটা কঠিন।আর টাকা ফেরত দিতে না পারলে মানুষ শুধু টাকা হারায় না, নিজের মুখটাও হারাতে শুরু করে।একসময় নিজের গ্রামের রাস্তায় হাঁটাও কঠিন হয়ে যায়।কারণ পরিচিত প্রতিটি মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, এই মানুষটার কাছ থেকে তো টাকা নিয়েছি।এই মানুষটাকে তো এখনো দিতে পারিনি।মানুষের চোখের দিকে তাকানো তখন কঠিন হয়ে যায়।পলাশ ও হয়তো সেই কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল।

এক সময় সে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার দিতে বলেছিলো।আমি তাকে টাকা দিয়েছিলাম।সে পরে সেই টাকা আমাকে ফেরত দিয়েছিল।এই ঘটনাটা খুব ছোট মনে হতে পারে।কিন্তু আমার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ।কারণ ও কৃতজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার মানুষ ছিল না।টাকা নেওয়ার সময় সে যেভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল, সেটা আমার মনে আছে।আর টাকা ফেরত দেওয়ার সময়ও তার মধ্যে সেই মানুষটাকেই দেখেছিলাম।

তারপর ধীরে ধীরে সে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেল।শুধু আমার কাছ থেকে না।আমাদের গ্রাম থেকে।তারপর একদিন শুনলাম, সে তার মা, বোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে মেহেদিনগর ছেড়ে চলে গেছে।নিজের বাড়িঘর রেখে।নিজের চেনা রাস্তা রেখে।নিজের শৈশব রেখে।নিজের বন্ধুদের রেখে।একটা মানুষ যখন গ্রাম ছেড়ে যায়, সে শুধু একটা বাড়ি ছেড়ে যায় না।সে তার শৈশবের একটা অংশও রেখে যায়।

মেহেদিনগরের যে রাস্তায় সে হাঁটত, সেই রাস্তা হয়তো এখনো আছে।যে ফার্মেসিতে সে বসত, হয়তো সেই জায়গাটাও আছে।যে পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা কত কথা বলেছি, পুকুরটাও হয়তো আছে।শুধু পলাশ নেই।

কখনো কখনো একটা মানুষ চলে গেলে পৃথিবীর কোনো কিছুই বদলায় না।সূর্য ঠিক আগের মতো ওঠে।ধানের ক্ষেত ঠিক আগের মতো দোলে।বৃষ্টির পানি ঠিক আগের মতো পুকুরে পড়ে।আজানের শব্দ ঠিক আগের মতো আসে।মানুষ বাজারে যায়।দোকান খোলে।দোকান বন্ধ হয়।শুধু একজন মানুষ থাকে না।আর সেই একজন মানুষের অনুপস্থিতিটা একজন বন্ধুর কাছে পুরো পৃথিবীর অনুপস্থিতির মতো লাগে।

পলাশ কোথায় আছে,

আমি জানি না

।আজও জানি না

।কেউ কেউ বলে, সে অন্য কোথাও আছে

।কেউ বলে, অন্য জেলায় গেছে

।কেউ বলে, অনেক দূরে চলে গেছে

।কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারে না।আমি মাঝে মাঝে ভাবি, সে কি কখনো মেহেদিনগরের কথা ভাবে

।সে কি কখনো সেই পুরোনো ফার্মেসির কথা ভাবে।

সে কি হারাধন স্যারের কথা মনে করে।

সে কি সেই হোস্টেলের ছোট্ট রুমটার কথা মনে করে।

যেখানে দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে বই পড়ত।সে কি মনে করে, একজন বন্ধু বাড়িতে গেলে আরেকজন তার বাড়িতে খবর দিয়ে আসত

।সে কি মনে করে, তার মা আমাকে লাড্ডু দিতেন।

আমি মনে করি।

অনেক মনে করি

।বিশেষ করে যখন গ্রামের কোনো পুরোনো মানুষকে দেখি।

যখন মেহেদিনগরের কোনো পুরোনো রাস্তার কথা মনে পড়ে।যখন কোনো ফার্মেসির সামনে দাঁড়ানো একজন ছেলেকে দেখি

।তখন মনে হয়, এই তো পলাশ।

কিন্তু কাছে গেলে দেখি, সে পলাশ নয়।

মানুষের জীবনে কিছু বন্ধু থাকে, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলার দরকার হয় না।বছরের পর বছর দেখা না হলেও বন্ধুত্বটা কোথাও একটা জায়গায় থেকে যায়।পলাশ আমার কাছে তেমনই একজন।

তার সঙ্গে হয়তো আজ কথা নেই।

তার ঠিকানা নেই।

তার ফোন নম্বর নেই।

কিন্তু তার স্মৃতি আছে।

স্মৃতি কখনো ঠিকানা চায় না।স্মৃতি কখনো ফোন নম্বর চায় না।স্মৃতি নিজের মতো করে মানুষের ভেতরে বাস করে।

মেহেদিনগর আমার কাছে শুধু একটা গ্রাম নয়।

এটা আমার শৈশব।

আমার কৈশোর।

আমার বন্ধুদের হাসি।

আমার স্কুল।

হারাধন স্যারের অঙ্ক।

নিজামপুর কলেজের হোস্টেলের ছোট্ট রুম।

মেসের খাবার।

বাড়ি যাওয়ার ব্যস্ততা।

আর সেই সব স্মৃতির মধ্যে পলাশ একটা খুব উজ্জ্বল চরিত্র।

আমি তাকে মনে রাখি একজন ভালো বন্ধু হিসেবে।

একজন মেধাবী ছেলে হিসেবে।

একজন আন্তরিক মানুষ হিসেবে।

একজন মায়ের আদরের ছেলে হিসেবে।

একজন বোনের বড় ভাই হিসেবে।

একজন বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো মানুষ হিসেবে।

জীবন সব মেধাবী মানুষকে তাদের প্রাপ্য জায়গায় পৌঁছে দেয় না।

কেউ কেউ দারুণ অঙ্ক জানে, কিন্তু জীবনের অঙ্কে হেরে যায়।

কেউ বিজ্ঞান বোঝে, কিন্তু সংসারের হিসাব বুঝতে বুঝতে নিজের জীবনটাই হারিয়ে ফেলে

।কেউ অনেক বড় স্বপ্ন দেখে, কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব এসে সেই স্বপ্নের ওপর চুপচাপ একটা পর্দা টেনে দেয়।

পলাশ ও হয়তো তেমন একজন মানুষ।সে হেরে গিয়েছিল কি না, আমি জানি না।

হয়তো সে হারেনি।

হয়তো অন্য কোথাও গিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করেছে।

হয়তো কোনো শহরের ছোট্ট একটা দোকানে বসে এখনো মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে

।হয়তো তার নিজের সন্তান হয়েছে।

হয়তো কোনো একদিন তার সন্তান তাকে জিজ্ঞেস করেছে, বাবা, তোমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল না।

তখন হয়তো পলাশ একটু চুপ করে থেকেছে।তারপর বলেছে, ছিল।

খুব ভালো একটা বন্ধু ছিল।তার নাম ছিল মোকতার।

এইটুকু ভাবলেই আমার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা হয়।

কারণ আমি জানি না, পলাশ কোথায়।কিন্তু আমি চাই সে ভালো থাকুক।

যেখানেই থাকুক।

যে ঘরে থাকুক।

যে মানুষের সঙ্গে থাকুক।

যে জীবনের ভেতর থাকুক।

তার মা যদি বেঁচে থাকেন, তিনি যেন ভালো থাকেন।

তার বোন যেন ভালো থাকে।তার পরিবারের সবাই যেন ভালো থাকে।

আর পলাশ যদি কোনোদিন এই লেখা পড়ে, আমি তাকে শুধু একটা কথা বলতে চাই

।বন্ধু, তুই আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাস নাই।তুই শুধু আমার চোখের আড়ালে চলে গেছিস

।মানুষ চোখের আড়ালে যেতে পারে।মনের আড়ালে যেতে পারে না।

মেহেদিনগরের কোনো একটা বিকেলে যদি হঠাৎ তোর মনে পড়ে যায়, আমরা দুইজন একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম, হারাধন স্যারের কাছে অঙ্ক করতাম, নিজামপুর কলেজের হোস্টেলের একই রুমে থাকতাম, তাহলে মনে করিস, ওই দূরে কোথাও একজন বন্ধু এখনো তোকে মনে করে।

তোর মায়ের দেওয়া লাড্ডুর স্বাদও হয়তো আমার জিহ্বায় নেই।

কিন্তু সেই আদরটা এখনো মনে আছে।তোর ফার্মেসির

গন্ধও হয়তো এখন আর মনে পড়ে না।

কিন্তু তুই যে মানুষের মতো মানুষ ছিলি, সেই কথাটা মনে আছে

।তুই যে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতিস, সেই কথাটা মনে আছে।

তুই যে আমার খবর আমার বাড়িতে পৌঁছে দিতিস

, সেই কথাটা মনে আছে।

পলাশকে আমার মনে পড়ে।

খুব মনে পড়ে।

মেহেদিনগরের বাতাসে এখনো কখনো কখনো আমি সেই ছেলেটাকে খুঁজি

।কোকড়ানো চুল।

ফুটফুটে মুখ

।চোখে স্বপ্ন।

হাতে বই।

পাশে আমি

।হারাধন স্যারের অঙ্কের খাতা সামনে

।জীবন তখন কত সহজ ছিল।

আমরা জানতাম না, একদিন আমাদের একজন অন্যজনের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।

আমরা জানতাম না, একদিন একই গ্রামের দুই বন্ধু হয়েও একজন আরেকজনের ঠিকানা জানবে না।

আমরা জানতাম না, জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কেউ কেউ একদিন এত দূরে চলে যায় যে তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য কোনো রাস্তা থাকে না।

তবুও বন্ধুত্বের কিছু রাস্তা কখনো বন্ধ হয় না।সেই রাস্তা স্মৃতির ভেতর দিয়ে যায়।আর সেই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি মাঝে মাঝে আবার মেহেদিনগরে ফিরে যাই।দেখি, চারদিকে সবুজ।ধানের গন্ধ।পুকুরের পানি।বিকেলের নরম আলো।দূরে আজানের শব্দ।মানুষের মুখে হাসি।আর রাস্তার এক পাশে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।কোকড়ানো চুল।ফুটফুটে সুন্দর মুখ।আমি কাছে যাই।সে হাসে।আমি বলি, কিরে পলাশ , কেমন আছিস।সে কিছু বলে না।শুধু হাসে।তারপর ধীরে ধীরে মেহেদিনগরের বিকেলের ভেতর মিশে যায়।আমি দাঁড়িয়ে থাকি।অনেকক্ষণ।তারপর বুঝতে পারি, পলাশ কোথাও যায়নি।সে আমার শৈশবের ভেতরেই আছে।আমার গ্রামের ভেতরেই আছে।আমার স্মৃতির ভেতরেই আছে।কিছু মানুষ জীবন থেকে চলে যায়।কিন্তু আমাদের ভেতর থেকে কোনোদিন যায় না।পলাশ ও যায়নি।যতদিন মেহেদিনগরের সবুজ থাকবে, যতদিন পুরোনো স্কুলের কথা মনে পড়বে, যতদিন হারাধন স্যারের অঙ্কের কথা মনে পড়বে, যতদিন কোনো পুরোনো বন্ধুর কথা মনে পড়ে বুকের ভেতর হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস উঠবে, ততদিন পলাশ আমার সঙ্গে থাকবে।হয়তো দেখা হবে না।হয়তো কথা হবে না।হয়তো তার ঠিকানাও কোনোদিন জানা হবে না।তবুও বন্ধু, তুই ভালো থাকিস।জীবন যদি কখনো আবার আমাদের দুই বন্ধুকে একই রাস্তায় দাঁড় করায়, তাহলে এবার কিন্তু তোকে যেতে দেব না।

অনেক কথা জমে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart