Ecommerce/blog/news portal

moktaar

Welcome to Moktaar Innoor! We are dedicated to providing high-quality products and exceptional customer service. Our mission is to deliver the best shopping experience to our valued customers across the UAE and beyond. With a passion for excellence and a commitment to customer satisfaction, we strive to offer premium products at competitive prices. Our team works tirelessly to ensure every order is handled with care and delivered promptly. We believe in building long-lasting relationships with our customers based on trust and reliability. Thank you for choosing Moktaar Innoor — your satisfaction is our greatest reward. Shop with confidence

বর্ডার হাটে শাহরুখ!

একদিন বারোইয়ারহাট থেকে রওনা দিলাম শ্রীনগর বর্ডার হাটের উদ্দেশ্যে। শুনেছি মঙ্গলবার বর্ডার হাট বসে, ভারতীয় জিনিসপত্র সস্তায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশি আর ভারতীয়দের একটা সুন্দর মিলনমেলাও হয় সেখানে।সকাল সকাল গিয়ে দেখি মানুষের বিশাল লাইন। সবাই সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও দাঁড়াইলাম। মনে মনে ভাবলাম, আজকে ভারতীয় কিছু জিনিস কিনব, ভারতের একটু অংশ দেখব, আর সুযোগ পেলে শাহরুখ খানকেও একবার দেখে আসব।বিকেল তিনটার দিকে অবশেষে আমাদের সিরিয়াল আসল। একশো টাকার মতো দিয়ে ঢুকে গেলাম।ভারতীয় দোকান ঘুরে দেখি আমূলের বাটার, ঘি, নানা রকম পণ্য। সবই সুন্দর, সবই সস্তা। কিন্তু জানি না কেন, কিছুই কেনার মতো মনে হলো না।তারপর বাংলাদেশি দোকানে গেলাম। দেখি ইলিশ মাছ।জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, ইলিশ কত?দোকানদার বললেন, আটশো।আমি তো খুশিতে শেষ। বললাম, ভাই, এক কেজি দেন।তিনি বললেন, আটশো রুপি।আমি বললাম, বাংলাদেশি টাকা দিলে হবে না?তিনি বললেন, না ভাই, ইন্ডিয়ান রুপি লাগবে।আমি তখন চুপ।বাংলাদেশি মানুষ, বাংলাদেশের ইলিশ, বাংলাদেশি টাকা আমার পকেটে, তবু ইলিশ কিনতে পারলাম না।শেষে কিছু হালকা ফালকা জিনিস কিনে ঘুরতে লাগলাম।হঠাৎ মনে হলো, আরে, বর্ডার হাটে আসছি, ভারতেও ঢুকলাম, শাহরুখ খানকে তো দেখা উচিত।চারদিকে তাকালাম।শাহরুখ খান নাই।আরেকদিকে তাকালাম।শাহরুখ খান নাই।শেষবার একটু ভালো করে তাকালাম।শাহরুখ খান তো দূরের কথা, অমিতাভ বচ্চনও নাই।তখন বুঝলাম, বর্ডার হাটে ভারতীয় পণ্য পাওয়া যায়, বাংলাদেশের ইলিশ পাওয়া যায়, দুই বাংলার মানুষ পাওয়া যায়, কিন্তু শাহরুখ খান পাওয়া যায় না।সেদিন সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বর্ডার পার হওয়া সহজ, কিন্তু শাহরুখ খানের দেখা পাওয়া বড় কঠিন।শেষে শাহরুখ খানকে না দেখেই বারোইয়ারহাটে ফিরলাম।মনটা অবশ্য তখনও বলতেছিল, ভাই, এত দূর আইলাম, শাহরুখ খানটারে অন্তত একবার দেখাইতে পারতা!

বর্ডার হাটে শাহরুখ! Read More »

ডিম ভাজি

খুব ছোটবেলার কথা। তখন স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার দিনগুলো আমার কাছে অন্যরকম ছিল। বই খাতা নিয়ে ভয়, তার চেয়েও বেশি ছিল মায়ের চোখের দিকে তাকালে পাওয়া এক ধরনের সাহস। আমাদের সংসারে তখন অভাব ছিল। এমন অভাব, যার কথা কাউকে আলাদা করে বলতে হতো না। ঘরের জিনিসপত্র, চাল ডাল, বাজার সদাই, সবকিছুর মধ্যেই অভাবটা চুপচাপ বসে থাকত। বাবা খেতখামারে কাজ করতেন। সারাদিন পরিশ্রম করে যে টাকা হাতে আসত, তাতে সংসার চলত কোনো রকমে। ডিম ছিল আমাদের কাছে নিত্যদিনের খাবার নয়। ডিম মানে ছিল একটু ভালো কিছু। বিশেষ কোনো দিন। সেদিন পরীক্ষায় যাওয়ার আগে মা আমার জন্য একটা ডিম ভেজে দিলেন। ডিমটা ভাজার সময় আমি খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কড়াইয়ে ডিম পড়ার শব্দটা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। খুব সাধারণ একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে আমার শৈশবের কত কিছু যেন মিশে আছে। মা ডিমটা ভাজছিলেন। আমি হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। পরীক্ষার আগে একটা ডিম ভাজি খেতে পারব, এই আনন্দটাও তখন কম ছিল না। ঠিক তখনই পরিবারের একজন সদস্য পাশ থেকে মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ডিম ভাজি খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে পরীক্ষায় ডিম পাবা, আন্ডা পাবা। কথাটা মজা করে বলা হয়েছিল কি না, সেটা আজ আর জানি না। কিন্তু শিশুমনে মজা আর কটাক্ষের পার্থক্য বোঝার বয়স তখন হয়নি। শুধু বুঝেছিলাম, আমার ডিম ভাজিটা নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। মা কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন। মায়ের সেই হাসিটা আজও আমার মনে আছে। সেটা আনন্দের হাসি ছিল না। আবার কষ্টের হাসিও ঠিক বলা যাবে না। যেন অভাবের সঙ্গে বহুদিন বসবাস করতে করতে মানুষ যে ধরনের হাসি শিখে যায়, সেই হাসি। যে হাসির মধ্যে প্রতিবাদ থাকে না, অভিযোগ থাকে না, থাকে শুধু মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত শক্তি। মা হয়তো জানতেন, ডিম কেনাটা আমাদের সংসারের জন্য সহজ ছিল না। বাবা সারাদিন খেতে কাজ করেন। সংসারের কত খরচ। চাল লাগবে, ডাল লাগবে, লবণ লাগবে, কাপড় লাগবে। সেখানে সন্তানের পরীক্ষার আগে একটা ডিম কিনে দেওয়া, সেটাও যেন মায়ের কাছে একটা ছোটখাটো উৎসব। আর সেই উৎসবটাকেই কেউ একজন কথার মধ্যে একটু ছোট করে দিলেন। মা তবু হাসলেন। আমি ডিমটা খেলাম। তারপর স্কুলে চলে গেলাম পরীক্ষা দিতে। সেদিনের পরীক্ষায় কী লিখেছিলাম, কত নম্বর পেয়েছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু ডিম ভাজিটার কথা মনে আছে। মায়ের মুখের সেই হাসিটাও মনে আছে। জীবনে পরে অনেক দামি খাবার খেয়েছি। রেস্টুরেন্টে বসে অনেক রকমের খাবার সামনে এসেছে। কিন্তু সেই একটা ডিম ভাজির মতো কোনো খাবার আর কখনো মনে হয়নি। কারণ খাবারটা শুধু ডিম ছিল না। ওটার মধ্যে মায়ের ভালোবাসা ছিল। বাবার সামর্থ্যের সীমা ছিল। সংসারের অভাব ছিল। আর ছিল একজন মায়ের নীরব চেষ্টা, সন্তান যেন অন্তত পরীক্ষার দিনটায় মনে করে, তার জন্যও কিছু একটা ভালো আছে। সেদিনের পর আর কতদিন ডিম ভাজি খেয়েছি, তার হিসাব নেই। সত্যি বলতে, তেমন খাওয়াই হয়নি। আমাদের সামর্থ্যের বাইরে ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা জিনিস বুঝেছি। গরিব মানুষের ঘরে খাবার কখনো শুধু খাবার থাকে না। একটা ডিম কখনো কখনো মায়ের ভালোবাসার সমান হয়ে যায়। একটা নতুন জামা হয়ে যায় বাবার সারাদিনের ঘাম। আর একমুঠো ভাত হয়ে যায় সংসারের সমস্ত না বলা ভালোবাসা। তাই আজও কোথাও ডিম ভাজার গন্ধ পেলে আমার মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মা কড়াইয়ে ডিম ভাজছেন। আমি চুপ করে তাকিয়ে আছি। পাশ থেকে কেউ একজন কথা বলছেন। মা কিছু বলছেন না। শুধু হাসছেন। সেই হাসির মানে আমি তখন বুঝিনি। এখন বুঝি। ওটা ছিল অভাবের সামনে মায়ের হাসি। সন্তানের সামনে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখার হাসি। আর হয়তো পৃথিবীকে না জানিয়ে মাকে বলার মতো একটা কথা ছিল, আমার সন্তান যেন অন্তত আজকে মনে করে, তার মা তার জন্য কিছু করতে পেরেছে।

ডিম ভাজি Read More »

সেই রাতের সিনেমা

তখন আমি খুব ছোট। প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের গ্রামে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সন্ধ্যা নামলেই পুরো গ্রামটা কেমন জানি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যেত। হারিকেন জ্বালানো হতো ঘরে। সেই হারিকেনের হলুদ আলোয় মা রান্না করতেন, আমরা পড়তে বসতাম। পড়ার চেয়ে অবশ্য হারিকেনের কাচের ভেতর আগুনটা দেখতে আমার বেশি ভালো লাগত। রাতে শীত পড়লে খেতা, কম্বল আর কাঁথা মিলিয়ে শরীর ঢেকে শুয়ে থাকতে হতো। বাইরে তখন অন্ধকার। এত অন্ধকার যে নিজের উঠোনটাকেও অপরিচিত মনে হতো। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকত। হুঁক্কা হুয়া। তারপর আরেক জায়গা থেকে উত্তর আসত। হুঁক্কা হুয়া। আমরা ছোটরা তখন সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঢুকে যেতাম। বাইরে যাওয়ার সাহস ছিল না। আধুনিকতা বলতে আমাদের গ্রামে তখন বিশেষ কিছু ছিল না। টেলিভিশন ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। বিনোদন বলতে মানুষের সঙ্গে মানুষের গল্প, উঠোনে বসে আড্ডা, কখনো মেলা, কখনো যাত্রা, আর কোনো বাড়িতে অতিথি এলে সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তবে পাশের একটা হিন্দু গ্রামে একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল। টেলিভিশন। ব্যাটারি দিয়ে চলত সেই টেলিভিশন। আমাদের কাছে ব্যাপারটা প্রায় জাদুর মতো ছিল। কেউ একজন খবর নিয়ে আসত, অমুক বাড়িতে টেলিভিশন চলছে। ব্যস, খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত না। হিন্দু মুসলমান সবাই ছুটে যেত। তাদের বাড়ির ঘরের ভেতরে টেলিভিশন চালানো হলে আমরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখতাম। কোনো কোনো দিন তারা উঠোনে টেলিভিশন বসিয়ে দিত। তখন আর জানালার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হতো না। সবাই উঠোনে বসে দেখতাম। সেই সময় ধর্মের কথা মাথায় আসত না। কার বাড়ি হিন্দুর, কার বাড়ি মুসলমানের, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা ছিল না। আমাদের কাছে টেলিভিশন ছিল টেলিভিশন। আর সিনেমা ছিল সিনেমা। একদিন খবর এলো, আরেক হিন্দু বাড়িতে ভিসিআর এসেছে। বাংলা সিনেমা দেখাবে। ভিসিআর কী জিনিস, সেটা তখন পুরোপুরি বুঝতাম না। শুধু জানতাম, ভিসিআর মানে বড় কিছু। সেখানে সিনেমা দেখা যায়। রুবেলের সিনেমা হতে পারে। আবার আলিফ লায়লাও হতে পারে। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা। আমাকে সিনেমা দেখতে যেতে হবে। বাবার কাছে গিয়ে বললাম, বাবা, আমি ভিসিআর দেখব। আমাকে দিয়ে আসো। বাবা প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ রাত হয়ে যাবে। আমি বায়না ধরলাম। শেষ পর্যন্ত বাবা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন। সম্ভবত রাত তখন দশটা। আমার কাছে দশটা বাজা মানে তখন অনেক রাত। রাস্তার দুই পাশে অন্ধকার। কোথাও কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই। মাঝে মাঝে বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিলাম। হিন্দু বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখি উঠোনে মানুষের ভিড়।বাবা আমাকে সে বাড়িতে পৌছিয়ে দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন। টেলিভিশন বসানো হয়েছে। চারপাশে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। কেউ মাটিতে বসেছে, কেউ গাছের শেকড়ের ওপর বসেছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমি একটা গাছের গোড়ার কাছে বসে পড়লাম। তারপর সিনেমা শুরু হলো। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। এখন ভাবলে অবাক লাগে, তখন একটা টেলিভিশনের পর্দা আমাদের কাছে কত বড় আনন্দ ছিল। আজ ঘরে ঘরে টেলিভিশন। একজন মানুষের হাতে একটা মোবাইল। সেখানে চাইলে হাজারটা সিনেমা দেখা যায়। কিন্তু সেই সময় একটা সিনেমা দেখার জন্য আমাদের কত আয়োজন। কত মানুষের বাড়িতে যাওয়া। কত দূরের রাস্তা পার হওয়া। কত রাত জাগা। কত অপেক্ষা। সিনেমায় কী দেখেছিলাম, আজ আর মনে নেই। হয়তো আলিফ লায়লা ছিল। হয়তো রুবেলের কোনো বাংলা সিনেমা। নায়ক কে ছিল, খলনায়ক কে ছিল, গল্পটা কী ছিল, কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে, আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত সিনেমা চলল। একসময় টেলিভিশন বন্ধ হয়ে গেল। মানুষজন যে যার বাড়ির দিকে চলে যেতে শুরু করল। আমি উঠলাম। তারপর বুঝলাম, আমার সামনে আসল সিনেমা এখন শুরু হবে। বাড়ি যেতে হবে। একা। যে পথে বাবার হাত ধরে এসেছিলাম, সেই পথেই এবার আমাকে একা ফিরতে হবে। আমার বয়স তখন এত কম যে অন্ধকার রাস্তা দেখলেই বুকের ভেতর কেমন একটা ভয় জমে যেত। তার ওপর চারদিকে কোনো আলো নেই। দূরে কোথাও হারিকেনের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। তারপর সেটাও হারিয়ে গেল। আমি হাঁটছি। ছোট ছোট পা। মনে হচ্ছে, আমার পেছনে কেউ হাঁটছে। আমি থেমে যাই। পেছনে তাকাই। কেউ নেই। আবার হাঁটি। আবার মনে হয়, কেউ আছে। আবার তাকাই। কেউ নেই। হঠাৎ দূরে শিয়াল ডাকল। হুঁক্কা হুয়া। আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। তখন আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী কাজটি আমি করছি। একটা ছোট ছেলে, অন্ধকার গ্রামের রাস্তা দিয়ে একা বাড়ি ফিরছে। কোনো টর্চ নেই। কোনো বিদ্যুতের আলো নেই। কোনো মোবাইল নেই। কাউকে ফোন করে বলার উপায় নেই, বাবা আমি ভয় পাচ্ছি। শুধু নিজের দুই পা। আর বুকের ভেতর একটা ছোট্ট সাহস। শেষ পর্যন্ত বাড়ি দেখা গেল। আমাদের ঘরের হারিকেনের আলো দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। সেই আলোটা দেখে মনে হলো, পৃথিবীর সব আলো যেন আমাদের বাড়ির ওই ছোট্ট হারিকেনের ভেতর এসে জড়ো হয়েছে। আমি দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলাম। বাবা হয়তো তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ কাঁথার নিচে ঢুকে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছিল না। চোখ বন্ধ করলেই সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছিল। তারপর শিয়ালের ডাক। হুঁক্কা হুয়া। হঠাৎ মনে হলো, সিনেমার চেয়েও বড় একটা সিনেমা আমি দেখে ফেলেছি। সেটা ছিল আমার নিজের গ্রামের রাত। অনেক বছর পরে বুঝেছি, আমাদের ছোটবেলার দারিদ্র্যটা আসলে শুধু অভাবের গল্প ছিল না। আমাদের আনন্দও ছিল খুব অল্প জিনিসের মধ্যে। একটা ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন। একটা ভিসিআর। একটা সিনেমা। একটা হিন্দু বাড়ির উঠোন। আর সেই উঠোনে হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বসে থাকা কিছু ছোট ছোট শিশু। কারও হাতে টাকা ছিল না। কারও ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। কারও কাছে বিনোদনের আলাদা ব্যবস্থা ছিল না। তবু আনন্দ ছিল। মানুষের বাড়িতে মানুষ যেত। একজনের আনন্দ আরেকজন ভাগ করে নিত। আজ আমাদের ঘরে আলো আছে, টেলিভিশন আছে, মোবাইল আছে, ইন্টারনেট আছে। বিনোদনের অভাব নেই। কিন্তু সেই অন্ধকার গ্রামের রাতের মতো আনন্দটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আর আমার সেই ছোট্ট বয়সের সবচেয়ে বড় সিনেমাটার নাম ছিল, বাড়ি ফেরার পথ। সিনেমাটা আজ আর মনে নেই। কিন্তু সেই অন্ধকার রাস্তা, বাবার হাত ধরে হিন্দু বাড়িতে যাওয়া, উঠোনে বসে টেলিভিশন দেখা, শিয়ালের ডাক, আর দূর থেকে দেখা আমাদের ঘরের ছোট্ট হারিকেনের আলো, এগুলো এখনো মনে আছে। জীবনের কিছু সিনেমা পর্দায় দেখা যায় না। সেগুলো মানুষ নিজের জীবন দিয়ে দেখে। তারপর সারাজীবন মনে রাখে।

সেই রাতের সিনেমা Read More »

প্রুশিয়ান পদ্ধতি বাংলাদেশ থেকে উঠে যাক

১. প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে কীপ্রুশিয়া ছিল মধ্য ইউরোপের একটি শক্তিশালী রাজ্য, যার কেন্দ্র ছিল জার্মান অঞ্চলে। ১৮ শতকের শেষভাগ এবং ১৯ শতকের শুরুতে সেখানে রাষ্ট্রের অধীনে একটি সংগঠিত গণশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে।এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল,শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে যাওয়া,নির্দিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী পড়াশোনা,একটি নির্ধারিত পাঠ্যক্রম,প্রশিক্ষিত শিক্ষক,শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় তদারকি,পরীক্ষা,শৃঙ্খলা,নিয়মিত সময়সূচি,এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।১৭১৭ সালের একটি আদেশে স্কুলে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছিল। তবে সেটি বাস্তবে অনেক জায়গায় দুর্বলভাবে কার্যকর হয়েছিল। ১৭৬৩ সালে ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের সময়ের Generallandschulreglement বা General School Regulation ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত করে। পরবর্তী সময়ে ১৭৯৪ সালের আইন এবং ১৯ শতকের সংস্কারগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করে।অর্থাৎ, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন আইন, সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে।২. কেন প্রুশিয়া এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিলএখানেই বিষয়টা সবচেয়ে আকর্ষণীয়।অনেক জায়গায় বলা হয়, প্রুশিয়া নাকি শুধু কারখানার শ্রমিক বানানোর জন্য স্কুল তৈরি করেছিল। এই কথাটা অতিরঞ্জিত এবং ইতিহাসের দিক থেকে পুরোপুরি নির্ভুল নয়।প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য একসঙ্গে কাজ করেছিল।প্রথমত, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা।দ্বিতীয়ত, জনগণের মধ্যে মৌলিক সাক্ষরতা তৈরি করা।তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নাগরিক তৈরি করা।চতুর্থত, প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থার জন্য শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা।পঞ্চমত, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলা তৈরি করা।১৮০৬ সালে নেপোলিয়নের কাছে প্রুশিয়ার পরাজয়ের পর শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রয়োজন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর উইলহেল্ম ফন হামবোল্টসহ সংস্কারকরা শিক্ষা নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।অর্থাৎ ব্যাপারটা শুধু,স্কুল বানিয়ে শ্রমিক তৈরি করা।এত সরল ছিল না।বরং বলা যায়,রাষ্ট্রকে আধুনিক করার জন্য জনগণকে সংগঠিতভাবে শিক্ষিত করা।৩. এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কী ছিলএখানে আপনি আজকের স্কুলের সঙ্গে অনেক মিল দেখতে পাবেন।বয়স অনুযায়ী শ্রেণিএকই বয়সের শিশুদের একসঙ্গে রাখা।নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমসব শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট বিষয় শেখানো।প্রশিক্ষিত শিক্ষকশিক্ষকতা শুধু কেউ জানে আর অন্যকে পড়ায়, এমন বিষয় না রেখে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।নিয়মিত পরীক্ষাশিক্ষার্থীর জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরি হয়।রাষ্ট্রীয় তদারকিশিক্ষা শুধু পরিবার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয় না হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়।শৃঙ্খলাসময় মেনে স্কুলে যাওয়া, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানার ওপর গুরুত্ব ছিল।নাগরিক তৈরিশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পড়তে লিখতে শেখানো নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপযোগী নাগরিক তৈরি করাও ছিল।এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনেকগুলো পরবর্তীতে ইউরোপ, আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের গণশিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে প্রবেশ করে।৪. আমেরিকাতেও এর প্রভাব পড়েছিলএটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ইতিহাস।আমেরিকার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ হোরেস ম্যান ১৮৪০ এর দশকে ইউরোপ ভ্রমণ করেন এবং প্রুশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।তারপর তিনি Massachusetts এর শিক্ষা সংস্কারে প্রুশিয়ান অভিজ্ঞতার কিছু বিষয় ব্যবহার করার পক্ষে অবস্থান নেন।বিশেষ করে,প্রশিক্ষিত শিক্ষক,সবার জন্য সাধারণ শিক্ষা,রাষ্ট্রীয় সহায়তা,শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ,এবং একটি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা।এসব ধারণা আমেরিকার public school আন্দোলনে প্রভাব ফেলে।অর্থাৎ আজ আমরা যে mass public education বা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় স্কুলব্যবস্থা দেখি, তার ইতিহাসে প্রুশিয়ার ভূমিকা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।৫. তাহলে স্কুল কি আসলে মানুষকে বাধ্য, অনুগত এবং একই রকম বানানোর জন্য তৈরি হয়েছিলএখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি আছে।প্রুশিয়ান ব্যবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সামাজিক দায়িত্বের ওপর জোর ছিল, এটা ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন করা যায়। আধুনিক গবেষণাতেও দেখা যায় যে প্রুশিয়ার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র গঠন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।কিন্তু ইন্টারনেটে প্রচলিত একটি গল্প আছে,প্রুশিয়া কারখানার জন্য বাধ্য শ্রমিক বানাতে স্কুল তৈরি করেছিল।এই দাবিটা খুব সাবধানে নিতে হবে।কারণ প্রুশিয়ান গণশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকটাই এমন সময়ে তৈরি হয় যখন আধুনিক শিল্পকারখানা আজকের অর্থে এখনও বিকশিত হয়নি। গবেষণায় বরং রাষ্ট্র নির্মাণ, সামরিক প্রয়োজন, প্রশাসনিক দক্ষতা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা যায়।তাই আমি এটাকে এভাবে বলব,প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্র নির্মাণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু এটাকে শুধু শ্রমিক বানানোর কারখানা বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।৬. প্রুশিয়ান মডেলের একটা অন্ধকার দিকও ছিলএটা স্বীকার করা জরুরি।শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসার ফলে শিক্ষা যেমন সবার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে, তেমনি রাষ্ট্র চাইলে শিক্ষাকে নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করতে পেরেছে।এর একটি পরিষ্কার উদাহরণ হলো প্রুশিয়ার পোলিশ জনগোষ্ঠী।১৯ শতকের শেষ দিকে প্রুশিয়ার কিছু অঞ্চলে স্কুলকে জার্মান ভাষা ও জার্মান জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। পোলিশ শিশুদের জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, এর ফলে অনেক পোলিশ পরিবারের মধ্যে স্কুলের বিরুদ্ধে বিরূপতাও তৈরি হয়েছিল।অর্থাৎ,শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করতে পারে, আবার রাষ্ট্রের হাতে গেলে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট চিন্তার মধ্যে ঢোকানোর মাধ্যমও হতে পারে।এই জায়গাটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।৭. এখন আসি আপনার বলা আরেকটি সম্ভাব্য শব্দে, ফ্রেইরিয়ান শিক্ষাআপনি যদি আসলে Freirean Education শুনে থাকেন, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।এর নাম এসেছে ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে থেকে।তার বিখ্যাত বই Pedagogy of the Oppressed।ফ্রেইরে প্রচলিত এমন শিক্ষার সমালোচনা করেন যেখানে,শিক্ষক সব জানেন,ছাত্র কিছু জানে না,শিক্ষক জ্ঞান ছাত্রের মাথায় ঢুকিয়ে দেন,ছাত্র মুখস্থ করে,পরীক্ষা দেয়,তারপর আবার ভুলে যায়।ফ্রেইরে এই পদ্ধতিকে Banking Model of Education বলে সমালোচনা করেছিলেন।তার পরিবর্তে তিনি চেয়েছিলেন,শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী দুজনেই প্রশ্ন করবে, আলোচনা করবে, বাস্তব জীবনকে বিশ্লেষণ করবে এবং একসঙ্গে জ্ঞান তৈরি করবে।এখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়।বরং,মানুষ যেন নিজের সমাজকে বুঝতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে পারে।এটাকে বলা হয় critical consciousness, বাংলায় বলা যায় সমালোচনামূলক সচেতনতা।৮. প্রুশিয়ান আর ফ্রেইরিয়ান মডেলের পার্থক্যবিষয়প্রুশিয়ান মডেলফ্রেইরিয়ান মডেলমূল চিন্তাসংগঠিত গণশিক্ষামুক্তিকামী শিক্ষাশিক্ষককর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা বেশিসংলাপের অংশীদারছাত্রনির্ধারিত পাঠ অনুসরণ করেপ্রশ্ন ও আলোচনায় অংশ নেয়পাঠ্যক্রমনির্দিষ্ট ও কাঠামোবদ্ধবাস্তব জীবন ও সমস্যাভিত্তিকশৃঙ্খলাগুরুত্বপূর্ণস্বাধীন চিন্তা গুরুত্বপূর্ণপরীক্ষাগুরুত্বপূর্ণপরীক্ষার চেয়ে শেখার প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণউদ্দেশ্যশিক্ষিত ও সংগঠিত নাগরিকসচেতন ও সমালোচনামূলক মানুষরাষ্ট্রের ভূমিকাশক্তিশালীক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করার সুযোগফ্রেইরিয়ান শিক্ষায় সংলাপ, সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে আরও সমতাভিত্তিক করার ওপর জোর দেওয়া হয়।৯. তাহলে আপনি সম্ভবত কোনটার কথা শুনেছেনআমার গবেষণার ভিত্তিতে আমার প্রথম অনুমান হচ্ছে আপনি Prussian Education System বা প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থার কথা শুনেছেন।কারণ বাংলায় কেউ ইংরেজি Prussian model of education উচ্চারণ করলে সেটা অনেকের কানে,প্রুশিয়ান,ফ্রুশিয়ান,ফার্সিয়ান,ফ্রেশিয়ান,এরকম শোনাতে পারে।আর এই মডেল নিয়েই বর্তমানে প্রচুর আলোচনা হয়, বিশেষ করে কেন আধুনিক স্কুলে একই বয়সের শিশু একই শ্রেণিতে বসে, কেন ঘণ্টা বাজে, কেন নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস, নির্দিষ্ট সিলেবাস, পরীক্ষা, গ্রেড, শিক্ষক এবং নিয়ম, এসবের ইতিহাস কোথা থেকে এসেছে, এই প্রশ্নে।১০. কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো অন্য জায়গায়প্রুশিয়ান মডেল আমাদের একটা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।শিক্ষার উদ্দেশ্য আসলে কী।শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু,চাকরি পাওয়া,পরীক্ষায় পাস করা,ডিগ্রি পাওয়া,ভালো বেতন পাওয়া।নাকি,মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো,প্রশ্ন করতে শেখানো,ভুল থেকে শিখতে শেখানো,অন্য ধর্মের মানুষকে সম্মান করতে শেখানো,অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখানো,নিজেকে চিনতে শেখানো,এবং নিজের সমাজকে একটু ভালো করার ক্ষমতা তৈরি করা।আমার গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নে, আধুনিক শিক্ষার সবচেয়ে ভালো পথ সম্ভবত একটি মাত্র পুরনো মডেলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়।প্রুশিয়ান মডেল থেকে নেওয়া যায় গণশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কাঠামো, শৃঙ্খলা এবং সবার

প্রুশিয়ান পদ্ধতি বাংলাদেশ থেকে উঠে যাক Read More »

আত্মমূল্যায়ন

মানুষ বারবার নিজের ভুলের কথা সবার সামনে বলে, এর একটা বড় কারণ হতে পারে মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো বের করে দেওয়ার প্রয়োজন। সব মানুষ নিজের কষ্ট, অপরাধবোধ কিংবা আফসোস নিজের মধ্যে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারে না। কাউকে নিজের ভুলের গল্প বলা অনেক সময় নিজের কাছেই নিজের বিচার করার একটা উপায় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ তখন আসলে অন্যদের কাছে শুধু গল্প করে না, নিজের অতীতকে নতুন করে বুঝতে চায়। সে যেন বলতে চায়, আমি ভুল করেছি, আমি সেটা এখন বুঝি। আমার তখনকার আমি আর আজকের আমি এক মানুষ হলেও চিন্তায় এক মানুষ নই।একাকিত্ব এই অনুভূতিকে অবশ্যই বাড়িয়ে দিতে পারে। মানুষ যখন ব্যস্ত থাকে, তখন বর্তমানের কাজ তাকে ধরে রাখে। কিন্তু যখন চারপাশ নীরব হয়ে যায়, কথা বলার মানুষ কমে যায়, কিংবা জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ নিজের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্ক পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। বিশেষ করে রাতে, একা বসে থাকলে, বিদেশে বা পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকলে, কোনো পুরোনো জায়গা দেখলে, কোনো গান শুনলে, কিংবা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বয়স পার হলে অতীত হঠাৎ খুব জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। তখন মনে হয়, এত বছর আমি কোথায় ছিলাম, কী করেছি, আর কত কিছু অন্যভাবে করা যেত।তবে এটাকে শুধু একাকিত্বের ফল বললে পুরো বিষয়টা ধরা হবে না। এর সঙ্গে বয়সজনিত আত্মমূল্যায়নও জড়িত। মানুষ জীবনের একটা পর্যায়ে এসে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতের দিকে বেশি তাকাতে শুরু করে। তখন সে নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে না দেখে একটা সম্পূর্ণ গল্প হিসেবে দেখতে চায়। কোন সিদ্ধান্ত আমাকে কোথায় নিয়ে গেল, কোন ভুলের কারণে কী হারালাম, কোন মানুষকে অবহেলা করেছি, কোথায় নিজের অহংকার আমাকে আটকে দিয়েছে, এসব প্রশ্ন তখন বারবার ফিরে আসে। মন যেন নিজের জীবনের একটা হিসাব মেলাতে বসে।আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের মস্তিষ্ক ভুলকে অনেক সময় সাফল্যের চেয়ে বেশি শক্তভাবে মনে রাখে। কারণ ভুলের সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে থাকে, লজ্জা, ভয়, অনুশোচনা, অপমান, হারানোর কষ্ট। তাই বহু বছর আগের একটা ঘটনা হঠাৎ করেই মনে পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যে ভুলের কোনো সুন্দর সমাপ্তি হয়নি, যে সম্পর্কের শেষটা ভালো হয়নি, কিংবা যে সিদ্ধান্তের ফলাফল আজও মনে দাগ কেটে আছে, সেগুলো মনের ভেতরে অসমাপ্ত গল্পের মতো পড়ে থাকে। সুযোগ পেলেই সেই গল্প আবার সামনে আসে।আর সবার সামনে বারবার বলার বিষয়টির মধ্যেও একটা গভীর মানসিক প্রয়োজন থাকতে পারে। মানুষ অনেক সময় নিজের ভুলকে স্বীকার করার মাধ্যমে সেই ভুলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে চায়। যতক্ষণ কোনো ভুল শুধু নিজের ভেতরে লুকানো থাকে, ততক্ষণ সেটা একটা গোপন বোঝার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ বলে, হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি, তখন সেই ভুলটা ধীরে ধীরে তার পরিচয় না হয়ে তার জীবনের একটা অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। তবে এখানে একটা সাবধানতার জায়গাও আছে। নিজের ভুল স্বীকার করা ভালো, কিন্তু একই ভুলকে বারবার স্মরণ করে নিজেকে শাস্তি দেওয়া ভালো নয়। অনুশোচনা মানুষকে বদলায়, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মদোষ মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়।সবচেয়ে গভীর সত্যটা সম্ভবত এখানে। মানুষ অতীতের ভুল নিয়ে তখনই বেশি ভাবে, যখন বর্তমানের মানুষটি অতীতের মানুষটির চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে গেছে। আজ আপনি যে ভুলটা বুঝতে পারছেন, সেই ভুল করার সময় আপনি আজকের মতো জ্ঞানী ছিলেন না। তাই অতীতের নিজেকে বর্তমানের জ্ঞান দিয়ে বিচার করলে অনুশোচনা তৈরি হবেই। বরং নিজের অতীতকে এভাবে দেখা দরকার, আমি ভুল করেছি, কারণ তখন আমি যতটুকু বুঝতাম, ততটুকু দিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আজ আমি সেটা বুঝতে পারছি, এটাই প্রমাণ যে আমি বদলেছি।শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে ভুলের শেষ নাই, ভুলের কলাও অন্ত নাই। কিন্তু মানুষের সৌন্দর্য ভুল না করায় নয়, ভুল করার পর নিজেকে বুঝতে শেখায়। একটা বয়সের পর মানুষ যখন নিজের পুরোনো ভুলগুলো মনে করে, তখন আসলে সে শুধু অতীতকে মনে করে না, সে নিজের পরিবর্তনটাকেও দেখতে পায়। তাই অতীত বারবার সামনে আসা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনো কখনো এটা মনের একটা নীরব ডাক, নিজেকে ক্ষমা করো, যা হয়ে গেছে তা থেকে শিক্ষা নাও, আর বাকি জীবনটা একটু বেশি সচেতন হয়ে বাঁচো। কারণ অতীতকে বদলানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু অতীতের অর্থ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের আছে।

আত্মমূল্যায়ন Read More »

সেদিন অন্ধকার ছাদে

সেদিন ছাদের ওপর আমরা দুজন পাশাপাশি বসেছিলাম। চারপাশে রাত নেমে এসেছিল, অথচ আমাদের ভেতরে তখনও অনেক কথা জেগে ছিল। জীবনের এমন কিছু কথা, যেগুলো মুখে উচ্চারণ করতে গেলেই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।হঠাৎ সে বলল, সে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়।কথাটা শুনে আমার ভেতরে কী হয়েছিল, সেটা তাকে বুঝতে দিইনি। কিছু কষ্ট মানুষ কাউকে দেখাতে পারে না। কিছু ব্যথা নিজের বুকের ভেতরেই চুপচাপ রেখে দিতে হয়। আমি শুধু শান্ত গলায় বললাম, ঠিক আছে, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।সে আমার কথাটা বিশ্বাস করল। আমার আশ্বাসে হয়তো তার বুকের ভেতরের ভয়টা একটু কমে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার চোখের পানি কমল না। বরং কান্না যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার কথা শুনে যদি সে আশ্বস্তই হয়ে থাকে, তাহলে তার কান্না থামছে না কেন।হয়তো মানুষ সবসময় নিজের মনকে নিজের কথায় বোঝাতে পারে না। মুখ বলে চলে যেতে চাই, অথচ হৃদয় তখনও পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো সে সত্যিই চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু চলে যাওয়ার কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসাগুলো একসঙ্গে জেগে উঠেছিল।আমি বারবার তাকে বলছিলাম, ভয় পেয়ো না, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।কথাগুলো বলতে বলতে আমার নিজের বুকের ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল।কারণ আমি জানতাম, কাউকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো তাকে নিজের কাছে আটকে না রাখা। সে যদি আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে ভালো থাকতে চায়, তাহলে তাকে ধরে রাখার অধিকার আমার নেই।কিন্তু এই কথাটা বলা যত সহজ, মেনে নেওয়া তত সহজ নয়।সেদিন ছাদের অন্ধকারে আমি আমার নিজের কষ্টটাকে বুকের ভেতর শক্ত করে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি তোমাকে এক মুহূর্তও আটকে রাখব না।অথচ আমার ভেতরে তখন অন্য একটা মানুষ কাঁদছিল।সে মানুষটা জানত, যাকে এতদিন নিজের জীবনের অংশ ভেবে এসেছে, একদিন হয়তো তাকেই নিজের হাতে অন্য কোথাও রেখে আসতে হবে। তারপর ফিরে আসতে হবে একা। পাশে থাকবে না তার পরিচিত কণ্ঠ, থাকবে না তার অভিমান, থাকবে না হঠাৎ করে তাকিয়ে থাকা দুটি চোখ।থাকবে শুধু স্মৃতি।সেদিন তার কান্নার কারণ আমি বুঝতে পারিনি। আজ মনে হয়, হয়তো সে আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার বেদনায় কাঁদছিল না। হয়তো সে কাঁদছিল এই ভেবে, যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে, সেই মানুষটিই তাকে নিজের হাতে তার পছন্দের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজি হয়ে গেছে।ভালোবাসার মধ্যে এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে।কখনো কখনো ভালোবাসা মানে কাছে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে মুক্ত করে দেওয়া, যাকে নিজের বুকের ভেতর সারাজীবন লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে।সেদিন আমি তাকে শুধু আশ্বস্ত করেছিলাম।বলেছিলাম, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।কিন্তু কথাটার ভেতরে যে কতটা কান্না ছিল, কতটা ভয় ছিল, কতটা হারিয়ে ফেলার বেদনা ছিল, সেটা আমি তাকে বুঝতে দিইনি।কারণ কিছু কষ্ট প্রকাশ করলে মানুষ দুর্বল হয়ে যায়, আর কিছু কষ্ট বুকের ভেতর সযত্নে রেখে দিলে মানুষ সারাজীবন সেই কষ্ট নিয়েই বেঁচে থাকে।সেদিন ছাদের ওপর দুজন মানুষ বসেছিল।একজন চলে যেতে চেয়েছিল।আর একজন তাকে যেতে দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছিল।কিন্তু দুজনের চোখেই ছিল একই বেদনা।একজনের কান্না চোখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, আর অন্যজনের কান্না বুকের ভেতর চেপে রাখা ছিল।হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য এটাই, মানুষটি চলে যেতে চায়, আর তুমি তাকে আটকাতে পারো, তবুও আটকাও না।শুধু বলো, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।তারপর একদিন সত্যিই তাকে রেখে এসে, নিজের কাছে ফিরে আসো।একেবারে একা।

সেদিন অন্ধকার ছাদে Read More »

সমুদ্রের তীরে একবার সারাইছিলাম..

মাসকটে বাংলাদেশ এম্বাসির সামনে দাঁড়ালে আমার একটা জিনিস খুব ভালো লাগে। সমুদ্রের শব্দ শোনা যায়। আরব সাগর খুব কাছে। দিনের বেলা সমুদ্র দেখা যায়, আর রাতের বেলা সমুদ্র দেখা যায় না, শুধু তার শব্দ শোনা যায়।সমুদ্র দেখা আর সমুদ্রের শব্দ শোনার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। সমুদ্র দেখা যায় চোখ দিয়ে, আর সমুদ্রের শব্দ শোনা যায় মনে।তবে সেদিন রাতে আমরা সমুদ্রের সৌন্দর্য নিয়ে খুব একটা ভাবিনি।আমরা ছিলাম তিনজন।রাতের আহওয়ানা দিয়ে এম্বাসির কাছে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ হতে হতে রাত হয়ে গেল। তারপর এমন একটা সময় হলো, যখন মানুষের সামনে জীবনের সবচেয়ে জরুরি কিছু প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়।আমাদের একজন বন্ধু বলল, ভাই, আমার তো খুব সমস্যা হয়েছে।আমি বললাম, কী সমস্যা।সে বলল, প্রস্রাবের চাপ ।আমি বললাম, ও।সে এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি এই সমস্যার সমাধান না করলে বাংলাদেশ ও ওমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।চারপাশে তাকালাম।এম্বাসি বন্ধ। আশেপাশে কোনো হোটেল নেই। দোকানপাটও বন্ধ। বড় বড় সুন্দর বিল্ডিং আছে, কিন্তু সেগুলো এমন সুন্দর যে সেখানে প্রস্রাব করার কথা চিন্তা করাটাই অন্যায়।বন্ধু বলল, আমি একটু দেখি।সে চলে গেল।কিছুক্ষণ পর ফিরে এল।তার মুখ দেখে মনে হলো সে জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।বলল, ভাই, কোথাও জায়গা নাই।আমি বললাম, কোথাও নাই।সে বলল, কোথাও নাই। চারদিকে শুধু বিল্ডিং। এত সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং, কিন্তু একটা জায়গাও নাই।আমি চুপ করে রইলাম।কারণ আমি জানতাম জায়গা আছে।জায়গাটা একটু অস্বাভাবিক।আমি কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রের দিকে গিয়ে নিজের কাজ সেরে এসেছি।জায়গাটা ছিল সমুদ্রের একেবারে কিনারে। চারপাশ অন্ধকার। মানুষজন নেই। শুধু ঢেউয়ের শব্দ।বন্ধুকে বললাম, আমার সঙ্গে আসেন।সে বলল, কোথায়।বললাম, চলেন।সে আমার পেছনে হাঁটতে লাগল।সমুদ্রের কাছে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।বললাম, এই জায়গাটা দেখেন।সে চারপাশে তাকিয়ে বলল, এখানে তো কিছু নাই।আমি বললাম, সেটাই তো সুবিধা।সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।তারপর সমুদ্রের দিকে তাকাল।সমুদ্র তখন খুব শান্তভাবে ঢেউ ভাঙছে।বন্ধু বলল, ভাই, জায়গাটা আসলেই খারাপ না।আমি বললাম, আমি তো আগেই বলেছি।সে একটু দূরে চলে গেল।আমি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এল।মুখে প্রশান্তির হাসি।বলল, ভাই।আমি বললাম, কী।বলল, আপনার বুদ্ধি আছে।আমি বললাম, এটা নতুন কিছু না।সে বলল, না ভাই, আজকে বুঝলাম।আমি আর কিছু বললাম না।কারণ তখন সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আরও সুন্দর লাগছিল।আমার মনে হলো, মানুষ আসলে বড় অদ্ভুত প্রাণী। সারাদিন বড় বড় বিল্ডিং বানায়, রাস্তা বানায়, অফিস বানায়, হোটেল বানায়। কিন্তু মাঝরাতে নিজের সবচেয়ে সাধারণ প্রয়োজনটুকুর জন্য একটা ছোট জায়গা খুঁজে পায় না।শেষ পর্যন্ত তাকে সমুদ্রের কাছে যেতে হয়।সেদিন রাতে আমরা তিনজন আবার এম্বাসির সামনে এসে দাঁড়ালাম।কেউ কোনো কথা বললাম না।শুধু সমুদ্রের শব্দ শুনলাম।আমাদের মধ্যে একজন হঠাৎ বলল, ভাই, কাল সকালে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে রাতে কোথায় ছিলেন।আমি বললাম, বলবেন সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম।সে বলল, আর যদি জিজ্ঞেস করে সমুদ্র কেমন ছিল।আমি বললাম, বলবেন খুব শান্ত ছিল।সে মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে।আরব সাগর তখনও ঢেউ ভাঙছিল।সে আমাদের কথা শুনছিল কি না, জানি না।তবে আমার মনে হয়, সমুদ্র অনেক কিছুই শোনে।শুধু কাউকে বলে না।

সমুদ্রের তীরে একবার সারাইছিলাম.. Read More »

আন্ডা গ্রামের সেই বুনো শুয়োর

শীতকাল ছিল।কোন বছর, সেটা এখন আর মনে নেই। তখন আমি ক্লাস ফাইভ না হয় সিক্সে পড়ি। বয়সটা এমন, রাতে একা বাথরুমে যেতেও বুকের মধ্যে কেমন জানি করত, আবার বন্ধুদের সামনে ভাব নিতাম, আমি কোনো কিছুতেই ভয় পাই না।আমাদের তখন অভাবের সংসার। লুঙ্গি ছিল, হাফ প্যান্ট ছিল, দুটো শার্ট ছিল কি না, সেটাও ঠিক মনে নেই। লুঙ্গিটা কতদিন পর পর ধোয়া হতো, তার হিসাব ছিল না। জামারও একই অবস্থা। কে ধুয়ে দিত, মা না আমি, সেটাও মনে নেই।তবে একটা জিনিস মনে আছে, শীতের ভোরে ঘুম থেকে ওঠা।সেই ভোরগুলো ছিল অন্যরকম।চারপাশ গুডগুডে অন্ধকার। এত কুয়াশা থাকত যে, হাত বাড়ালে নিজের হাতটাও যেন ঠিকমতো দেখা যেত না। দূরের কোনো বাড়ি থেকে মোরগ ডাকত। কোথাও কোনো মানুষ নেই। মাঝে মাঝে কুয়াশার ভেতর দিয়ে কোনো অচেনা শব্দ ভেসে আসত।সেদিনও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম।মসজিদে নামাজ পড়তে যাব।চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠলাম। গায়ে তখন শীতের কাপড় বলতে তেমন কিছুই নেই। ছোট ছোট পা ফেলে মসজিদের দিকে হাঁটছি।রাস্তার দুই পাশে কুয়াশা।মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে পড়ল হিন্দুদের চিতা খোলা (যেখানে লাশ পড়ানো হয় )চিতাখোলা জায়গাটা দিনের বেলায় খুব পরিচিত ছিল। কতবার যে ওই রাস্তা দিয়ে গেছি। কিন্তু সেদিন ভোরে জায়গাটাকে একেবারে অন্যরকম লাগছিল।আমি হাঁটতে হাঁটতে চিতাখোলার কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ কুয়াশার মধ্যে সাদা একটা জিনিস দেখতে পেলাম।রাস্তার পাশে।প্রথমে মনে হলো, কেউ হয়তো সাদা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে।আমি থেমে গেলাম।বুকের ভেতর ধক করে উঠল।সাদা জিনিসটা নড়ছে কি না বুঝতে পারছিলাম না।কুয়াশা একটু নড়ল।সাদা জিনিসটাও যেন নড়ল।আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলাম।তারপর মনে হলো, না, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তো ভয় আরো বাড়বে।আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করলাম।এক পা।দুই পা।তিন পা।হঠাৎ চিতাখোলার ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।ক্যাঁক।আমি থেমে গেলাম।তারপর আবার।ক্যাঁক ক্যাঁক।এর সঙ্গে কেমন যেন ঘষাঘষির শব্দ।মনে হলো, কেউ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছে।আমার শরীর ঠান্ডার মধ্যে থেকেও ঘেমে গেল।আমি তখনো নিজেকে বোঝাচ্ছি, কিছু না। নিশ্চয়ই কোনো পশু হবে।কিন্তু ছোট মানুষ যখন ভয় পায়, তখন যুক্তি খুব বেশি কাজ করে না।আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।মসজিদ আর খুব বেশি দূরে নয়।তবু মনে হচ্ছিল, রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না।এরপর হিন্দুদের বাড়িগুলোর সামনে আসতেই আবার থেমে গেলাম।কারণ রাস্তার একপাশে কালো একটা জিনিস পড়ে আছে।বড়।একেবারে কালো।কুয়াশার মধ্যে জিনিসটা এমনভাবে পড়ে ছিল যে, প্রথম দেখায় মনে হলো, কোনো মানুষ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে।আমার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল।আমি আর দাঁড়ালাম না।দৌড় দিলাম।পেছনে কী আছে, একবারও তাকালাম না।মনে হচ্ছিল, পেছন থেকে কেউ আমাকে ডাকবে।কেউ হয়তো বলবে,এই যে…আমি আরো জোরে দৌড়ালাম।মসজিদে ঢুকে পড়লাম।ভেতরে তখন কয়েকজন মানুষ এসেছে। তাদের দেখে মনে হলো, আমি যেন আবার মানুষের পৃথিবীতে ফিরে এসেছি।নামাজ পড়লাম।কিন্তু নামাজের মধ্যে বারবার সেই কালো জিনিসটার কথা মনে হচ্ছিল।মানুষটা কে ছিল?মরে পড়ে ছিল?নাকি কেউ আমাকে দেখে লুকিয়ে ছিল?নামাজ শেষ হলো।বাইরে বের হওয়ার সময় বুকের ভেতর আবার ভয় ঢুকে গেল।কারণ আমাকে সেই রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে।কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বাইরে এসে দেখি রাস্তা একেবারে ফাঁকা।কুয়াশা আছে।চিতাখোলা আছে।হিন্দুদের বাড়িগুলো আছে।কিন্তু সেই কালো জিনিসটা নেই।একেবারেই নেই।আমি যেখানে দেখেছিলাম, ঠিক সেই জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম।মাটিতে কিছুই নেই।আমি বুঝতেই পারছিলাম না, জিনিসটা গেল কোথায়।সেদিন বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলিনি।কিছুদিন পর শুনলাম, আগের রাতে নাকি একটা বুনো শুয়োর ধরা পড়েছিল।মেরে ফেলার পর সেটাকে ওই রাস্তার পাশে রাখা হয়েছিল।শুনে আমার ভয় কিছুটা কমল।ভাবলাম, তাহলে সাদা জিনিসটা কী ছিল?আর সেই ক্যাঁক ক্যাঁক শব্দ?হয়তো অন্য কোনো শুয়োর ছিল।হয়তো কুয়াশার মধ্যে চোখের ভুল হয়েছিল।অনেক বছর কেটে গেছে।এখন ভাবলে মনে হয়, সেদিন যা দেখেছিলাম, তার সবকিছুরই হয়তো একটা স্বাভাবিক ব্যাখ্যা আছে।হয়তো কালো জিনিসটা সত্যিই বুনো শুয়োর ছিল।হয়তো সাদা জিনিসটাও কুয়াশায় ঢাকা কোনো কাপড় বা গাছের ডাল ছিল।হয়তো সেই শব্দও কোনো পশুর।কিন্তু একটা প্রশ্ন আজও আমার মাথায় আসে।আমি যখন মসজিদে যাওয়ার সময় কালো জিনিসটা দেখেছিলাম, তখন সেটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা জিনিসটা কী ছিল?কারণ বুনো শুয়োরটার কথা পরে শুনেছি।সাদা জিনিসটার কথা কাউকে কোনোদিন বলতে শুনিনি।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো,নামাজ শেষে যখন আমি ফিরে এলাম, কালো জিনিসটা যেখানে ছিল, সেখানে শুধু কুয়াশায় ভেজা ঘাস ছিল।কিছুই ছিল না।কখনো কখনো শীতের খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে এখনো সেই রাস্তার কথা মনে পড়ে।মনে হয়, কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা ছোট ছেলে হাঁটছে।তার গায়ে পুরোনো একটা জামা।পরনে লুঙ্গি।সামনে চিতাখোলা আর কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সাদা কিছু একটা।ছেলেটা থেমে গেছে।সাদা জিনিসটাও যেন থেমে গেছে।তারপর খুব আস্তে একটা শব্দ হচ্ছে।ক্যাঁক…ক্যাঁক…আর ছেলেটা দৌড়াচ্ছে মসজিদের দিকে।কিন্তু আজও সে জানে না,সেদিন সে আসলে কী দেখেছিল।

আন্ডা গ্রামের সেই বুনো শুয়োর Read More »

রিয়েল ভূতের গল্প

সেদিন রাতটা ছিল অস্বাভাবিক অন্ধকার। মেহেদীনগর গ্রামটা শীতের কুয়াশায় এমনভাবে ঢাকা পড়েছিল, মনে হচ্ছিল, গ্রামের পরিচিত পথঘাটগুলোও যেন নিজেদের চেহারা ভুলে গেছে। ভোরে ঘুম ভাঙল। বাইরে তখনো আলো ফোটেনি। চারদিকে কনকনে ঠান্ডা। আমি উঠে কালো ফ্যান পরলাম, কালো ব্লেজার গায়ে চাপালাম, পায়ে জুতো দিলাম, মাথায় দিলাম কালো কানটুপি। তারপর বেরিয়ে পড়লাম মর্নিং ওয়াকে। মেহেদীনগর আমার নিজের গ্রাম। দিনের বেলায় এই গ্রামের প্রতিটি রাস্তা আমার চেনা। কোন বাঁকে কোন গাছ, কোন বাড়ির সামনে কোন পুকুর, কোন রাস্তার পাশে কোন বাঁশঝাড়, সবই পরিচিত। কিন্তু সেই ভোরে গ্রামটাকে চিনতে পারছিলাম না। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পরিচিত কোনো গ্রামের ভেতর দিয়ে নয়, অন্য কোনো অচেনা জায়গার ভেতর দিয়ে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আমাদের মসজিদের পাশের কবরস্থানে। সেখানেই আমার বাবা শায়িত আছেন। কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছি। দেশে ফেরার পর এটাই ছিল প্রথমবার বাবার কবর জিয়ারত করতে আসা। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নীরবে ছিলাম। চারদিকে তখন শুধু কুয়াশা। কোনো মানুষের শব্দ নেই। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। আবার সব চুপ। আমি বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ঘুরে তাকালাম। কেউ নেই। শুধু কুয়াশা। আর সেই কুয়াশার ভেতর কবরগুলোর অস্পষ্ট ছায়া। আমি ধীরে ধীরে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসছিলাম। ঠিক তখনই দূর থেকে একজন মানুষকে আসতে দেখলাম। আমাদের গ্রামেরই পরিচিত মানুষ। ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। কনকনে ঠান্ডায় তিনি কাঁপছিলেন। হাঁটছিলেন দ্রুত। কিন্তু আমাকে দেখার পর তার হাঁটা হঠাৎ থেমে গেল। তিনি স্থির হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তখন কবরস্থান থেকে বের হচ্ছি। মাথায় কালো কানটুপি। গায়ে কালো ব্লেজার। কালো প্যান্ট। পায়ে কালো জুতো। চারদিকে ঘন কুয়াশা। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি কবরস্থান থেকে বের হয়ে। লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তিনি ভয় পেয়েছেন। আমি বললাম, চাচা, আসসালামু আলাইকুম। তিনি সালামের জবাব দিলেন না। বরং এক পা পিছিয়ে গেলেন। তারপর দ্রুত মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। আমি আবার সালাম দিলাম। তিনি এবারও ফিরে তাকালেন না। শুধু দ্রুত পা চালিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর নিজের পোশাকের দিকে তাকালাম। কালো পোশাক। কালো টুপি। কবরস্থান থেকে বের হচ্ছি। ভোরের আগে। চারদিকে কুয়াশা। তার ওপর কয়েকদিন ধরে আমাকে গ্রামের মানুষ দেখেনি। হঠাৎ অন্ধকারে আমাকে দেখে তিনি হয়তো চিনতেই পারেননি। তার মনে হয়তো তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, এই মানুষটা কে। মানুষ তো হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। হয়তো কোনো ডাকাত। হয়তো কোনো অচেনা লোক। অথবা কুয়াশার ভেতর কবরস্থান থেকে উঠে আসা কোনো অশরীরী ছায়া। কিন্তু সত্যিটা ছিল খুব সাধারণ। আমি ছিলাম তার পরিচিত সেই মানুষটাই। শুধু কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে ফিরে এসেছি। আর সেদিন ভোরে কালো পোশাক পরে বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অন্ধকার সব সময় সত্যিটাকে দেখায় না। অন্ধকার মানুষের চোখের সামনে নিজের একটা গল্প তৈরি করে। আর সেই গল্পে, একজন পরিচিত মানুষও কখনো কখনো হয়ে যায় অচেনা। মেহেদীনগরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে লোকটার কাছে আমি হয়তো মানুষ ছিলাম না। আমি ছিলাম, কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসা এক কালো অবয়ব। আর সেই দৃশ্যের ভয়টা আজও আমার মনে আছে। কারণ আমি জানতাম আমি কে। কিন্তু সেই মানুষটা জানত না, সে কাকে দেখে ভয় পেয়েছিল।

রিয়েল ভূতের গল্প Read More »

tambula vs কিংফিশার

প্রবাস জীবন মানেই যে শুধু কাজ আর টাকা কামানো, তা কিন্তু না। মাঝে মাঝে প্রবাসী মানুষও একটু আনন্দ করতে চায়, একটু ঘুরতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে বসে হাসতে চায়। কারণ প্রবাসে হাসিটাও অনেক সময় হিসাব করে কিনতে হয়। অনেক বছর আগের কথা। সোহারের ফেলাজ দৌয়ার এর পাশে একটা হোটেল আছে। হোটেলটার নাম আর মনে নাই। নাম মনে না থাকলেও ঘটনাটা বেশ মনে আছে। হোটেলের বাইরে একটা জায়গা ছিল, যেখানে শুধু তাম্বুলা খেলার আয়োজন হতো। প্রবাসীদের জন্য জায়গাটা ছিল একরকম বিনোদনের মাঠ। একদিন আমি, রাউজনের মানিক আর আবু তোরাবের রাহাত ভাই মিলে ঠিক করলাম, রাতে তাম্বুলা খেলতে যাব। রাত তখন প্রায় নয়টা। আমরা রওনা দিলাম। দশটার দিকে গিয়ে পৌঁছলাম। মানিক আর রাহাত ভাইয়ের আবার ফেলাজ দৌয়ারের আশেপাশে আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত ছিল। তারা আমাকে তাম্বুলার মাঠের কাছে নামিয়ে দিয়ে বলল, আপনি খেলেন, আমরা দাওয়াত খেয়ে আবার আইতেছি। আমি একা বসে গেলাম তাম্বুলা খেলতে। ওদিকে তারা দাওয়াত খেতে গেল। তখন আমার মাথায় একটা মহৎ চিন্তা আসল। যেহেতু বন্ধুরা নাই, তাম্বুলা শুরু হতে একটু সময় আছে, হোটেলটা একটু ঘুরে দেখা যাক। হোটেলে ঢুকে দেখি, সেখানে তিনটা বার আছে। একটা ইন্ডিয়ান বার, যেখানে নাচ গান হয়। আরবি একটা বার আছে। আরেকটা সম্ভবত তুর্কি বার। তখন মনে হলো, প্রবাস জীবনে তাম্বুলার পাশাপাশি একটু আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিও দেখে আসি। প্রথমে গেলাম আরবি বারে। সেখানে দেখি একজন ভারতীয় মহিলা বিয়ার সার্ভ করতেছেন। আমি একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে খুব ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, কী দেব? আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, কিংফিশার আছে? আমার মুখ থেকে কিংফিশার শব্দটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, মহিলার চোখ দুটো একটু বড় হয়ে গেল। তিনি বললেন, না স্যার, কিংফিশার আমাদের এখানে নাই। অন্য কোনো ব্র্যান্ড নেবেন? আমি ভাবলাম, কিংফিশার নাই তো নাই। মন যখন চায় নাই, তখন অন্য কিছু দিয়ে মনকে বুঝিয়ে লাভ কী। তাই কোনো অর্ডার না দিয়েই উঠে পড়লাম। বের হয়ে দেখি, যে ইন্ডিয়ান বারটা আগে বন্ধ ছিল, সেটা এখন খুলে গেছে। মনে হলো, আল্লাহ যখন একটা দরজা বন্ধ করেন, আরেকটা দরজা খুলে দেন। আমি ইন্ডিয়ান বারের দিকে হাঁটা দিলাম। ভেতরে ঢুকে বসার আগেই একজন এসে বললেন, স্যার, আপনার জুতা অ্যালাউড না। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, সত্যিই সেদিন স্নিকার পরে গেছি। আমি মনে মনে বললাম, প্রবাসে মানুষ হিসেবে আমার যত স্বাধীনতা থাকুক, স্নিকার পরে বারে ঢোকার স্বাধীনতা নাই। কাজেই সেদিন নাচ গানও দেখা হলো না। কিংফিশারও খাওয়া হলো না। বারেও বসা হলো না। আমি আবার তাম্বুলার মাঠে ফিরে এলাম। তখন বুঝলাম, জীবনে সব আনন্দ নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী আসে না। কোনো কোনো আনন্দের জন্য আলাদা পরিকল্পনাও লাগে না। কিছুক্ষণ পর রাহাত ভাই আর মানিক দাওয়াত খেয়ে ফিরে এল। আবার তিনজন মিলে তাম্বুলায় বসে গেলাম। রাত বাড়তে লাগল। প্রবাসীদের হাসাহাসি, চিৎকার, জেতার আনন্দ আর হারার আফসোসে জায়গাটা জমে উঠল। শেষ পর্যন্ত আমি আর রাহাত ভাই হারলাম। কিন্তু মানিক একটা খেলায় জিতে গেল। মানিকের মুখের হাসি দেখে মনে হলো, আজকের রাতের সব খরচ যেন ও একাই উঠিয়ে ফেলেছে। খেলা শেষ করে আমরা আবার রাতের বেলা বুরেমির দিকে রওনা দিলাম। গাড়ি চলতে চলতে রাত গভীর হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত রাত দুইটার দিকে বুরেমি পৌঁছলাম। সেদিন বারেও ঢোকা হলো, আবার ঢোকাও হলো না। কিংফিশারও পাওয়া হলো না। নাচও দেখা হলো না। স্নিকারও কোনো কাজে লাগল না। কিন্তু তাম্বুলা খেলা হলো। বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি হলো। রাত জেগে গল্প হলো। আর একটা ছোট্ট রাত প্রবাস জীবনের অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে গেল। প্রবাসে আসলে আনন্দের জায়গা খুব বেশি না। দিনের পর দিন কাজ, দায়িত্ব, হিসাব নিকাশ আর পরিবারের চিন্তা। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে বন্ধুরা যখন পাশে থাকে, তখন একটা তাম্বুলার মাঠও পাঁচ তারকা বিনোদনের জায়গা হয়ে যায়। সেদিন একটা জিনিস বুঝেছিলাম, আনন্দ সব সময় বারের ভেতরে থাকে না। কখনো কখনো আনন্দ একটা তাম্বুলার টেবিলে বসে থাকে। কখনো বন্ধুর হাসির মধ্যে থাকে। কখনো রাত দুইটার গাড়ির যাত্রায় থাকে। আর কখনো কিংফিশার না পেয়েও মানুষ খুব আনন্দে বাড়ি ফিরতে পারে। প্রবাস জীবন এমনই। টাকা কামাই করতে এসে মানুষ শেষ পর্যন্ত কিছু টাকা দিয়ে নয়, কিছু গল্প দিয়ে দেশে ফেরে। সেই গল্পগুলোর দামই হয়তো সবচেয়ে বেশি।

tambula vs কিংফিশার Read More »

Shopping Cart