Ecommerce/blog/news portal

ব্লেজার

দুই হাজার সালের দিকের কথা, সবে এসএসসি পাস করেছি, সামনে কলেজ জীবন, বুকের ভেতর তখন কত স্বপ্ন, কত আনন্দ, কত অকারণ উত্তেজনা, জীবনটা তখন এত ছোট ছিল যে সামান্য কিছুতেই মনে হতো পৃথিবীটা বুঝি আমাদের হাতের মুঠোয়।শীতের এক সকালে কক্সবাজার যাওয়ার আয়োজন হলো, আমাদের এলাকা থেকে একটা বাস ভাড়া করা হয়েছিল, সঙ্গে প্রায় ষাট, সত্তরজন তরুণ, কারও বন্ধু, কারও সহপাঠী, কারও পরিচিত মুখ, সবাই মিলে যেন এক টুকরো তারুণ্য বাসের ভেতর উঠেছিল।রাতে বাস ছাড়ল, সারারাত গল্প, হাসাহাসি, গান আর জানালার বাইরে অন্ধকার রাস্তা, ভোরের দিকে যখন কক্সবাজার পৌঁছালাম, তখন মনে হলো জীবনে এর চেয়ে সুন্দর সকাল আর হয় না।সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন আমি প্রথম বুঝেছিলাম, পৃথিবী আসলে কত বড়।অনেকে সমুদ্রের পানিতে নেমে গোসল করছিল, কেউ দৌড়াচ্ছিল, কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছিল, আর আমরা কয়েকজন দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলাম।ইচ্ছে ছিল আমরাও পানিতে নামব, সমুদ্রের ঢেউ শরীরে লাগাব, কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো সবকিছু করা যায় না, সবার অতিরিক্ত কাপড় ছিল না, সামর্থ্যও ছিল না, তাই সমুদ্রের পানিতে নামা হলো না।আমরা শুধু সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটলাম।তবু সেদিন আনন্দের কোনো কমতি ছিল না।দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামল, আমরা ঘুরতে ঘুরতে গেলাম শুটকির বাজার, তারপর বার্মিজ মার্কেট।চারদিকে কত রঙ, কত মানুষ, কত জিনিস, মনে হচ্ছিল চোখ দুটো শুধু দেখেই যাবে, কিন্তু পকেটটা ছিল বড়ই লাজুক।তখন আমার পকেটে ছিল মোটামুটি সাড়ে তিনশো টাকা।সেই বয়সে সাড়ে তিনশো টাকা আমার কাছে কমও ছিল না, আবার বেশি কিছু কেনার মতো টাকাও ছিল না।হঠাৎ একটা কালো ব্লেজারের দিকে চোখ আটকে গেল।কেন জানি না, ব্লেজারটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল।কালো রঙের সেই ব্লেজারটা যেন আমার চোখে শুধু একটা পোশাক ছিল না, মনে হচ্ছিল এটা কিনতে পারলে আমিও বুঝি একটু বড় হয়ে যাব, একটু সুন্দর হয়ে যাব, কলেজে গিয়ে একদিন এটা গায়ে দিয়ে দাঁড়ালে হয়তো কেউ তাকিয়ে বলবে, ছেলেটাকে বেশ মানিয়েছে।দোকানদার দাম চাইল পাঁচশো টাকা।আমি পকেটের দিকে তাকালাম, তারপর মানুষটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমার কাছে সাড়ে তিনশো টাকা আছে।তিনি রাজি হলেন না।আমি চলে এলাম।কিন্তু মনটা পড়ে রইল সেই কালো ব্লেজারের কাছে।প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবার গেলাম।আবার বললাম, ভাই, আমার কাছে সাড়ে তিনশো টাকাই আছে, এর বেশি দিতে পারব না।তিনি বললেন, আমার কেনা দামই চারশো টাকা, আপনি চারশো টাকা দিতে পারবেন।আমি চুপ করে গেলাম।আমার কাছে তখন সাড়ে তিনশো টাকার বেশি সত্যিই ছিল না।লোকটা হয়তো আমার অবস্থা বুঝেছিলেন, কিন্তু ব্যবসার জায়গায় মায়া দিয়ে তো আর সবসময় হিসাব চলে না।আবার ফিরে এলাম।কিছুক্ষণ পর আবার গেলাম।শেষবারের মতো বললাম, ভাই, সাড়ে তিনশো টাকা নেন, ব্লেজারটা আমাকে দিয়ে দেন।তিনি দিলেন না।আমি আর কিছু বললাম না।চুপচাপ ফিরে এলাম আমাদের বাসের কাছে।কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়ল কক্সবাজার থেকে।সমুদ্র পেছনে পড়ে রইল, বাজার পেছনে পড়ে রইল, বন্ধুরা গল্প করতে করতে বাড়ির পথে ফিরল, কিন্তু আমার ভেতরে একটা কালো ব্লেজার আটকে রইল।সেদিন হয়তো আমি একটা ব্লেজার কিনতে পারিনি, কিন্তু আসলে শুধু একটা পোশাকই হারাইনি, হারিয়েছিলাম আমার কিশোর বয়সের একটা ছোট্ট স্বপ্ন।আজ এত বছর পরও মাঝে মাঝে সেই রাতটার কথা মনে পড়ে।মনে পড়ে বার্মিজ মার্কেটের সেই দোকানটা, মনে পড়ে দোকানির মুখ, মনে পড়ে আমার সাড়ে তিনশো টাকা, আর মনে পড়ে সেই কালো ব্লেজারটা।জীবনে কত দামি পোশাক পরেছি, কত কিছু কিনেছি, কত কিছু হারিয়েছি, কিন্তু সেই সাড়ে তিনশো টাকায় কিনতে না পারা কালো ব্লেজারটার কথা আজও ভুলতে পারিনি।কারণ কিছু জিনিস আমরা না কিনেও সারাজীবন বয়ে বেড়াই।কিছু আফসোসের কোনো দাম থাকে না।আর কিছু স্বপ্ন, পূরণ না হয়েও মানুষের মনের ভেতর সারাজীবন সুন্দর থেকে যায়।সেই কালো ব্লেজারটা আমার কেনা হয়নি, কিন্তু আজও আমার স্মৃতির সবচেয়ে যত্নে রাখা আলমারিতে সেটাই যেন ঝুলে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart