Ecommerce/blog/news portal

হঠাৎ বৃষ্টি

বৃষ্টি হলে তোমাকে মনে পড়ে

বৃষ্টি হলে আমার একটা অদ্ভুত সমস্যা হয়।

আমি কাজ করতে পারি না।

কেউ যদি তখন আমাকে খুব জরুরি কোনো কাজও দেয়, আমি কাজটা হাতে নিয়ে বসে থাকি। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারি, আমি কাজ করছি না। জানালার দিকে তাকিয়ে আছি।

বৃষ্টির দিকে।

বৃষ্টির দিকে তাকালে কেন জানি তার কথা মনে পড়ে।

এটা অবশ্য নতুন কোনো ব্যাপার না। বহু বছর ধরে হচ্ছে।

আজ বিকেলেও বৃষ্টি হচ্ছে।

আমি জানালার পাশে বসে আছি। চায়ের কাপটা অনেকক্ষণ ধরে টেবিলের ওপর পড়ে আছে। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না।

বৃষ্টির শব্দ শুনছি।

টুপটাপ।

তারপর একটু জোরে।

তারপর আবার ধীরে।

এই শব্দের মধ্যেই হঠাৎ মনে হলো, সে বুঝি পাশের ঘর থেকে বলবে,

ভাইয়া, তুমি আবার বৃষ্টিতে ভিজতে বের হইছো?

আমি হেসে ফেললাম।

ঘরে আমি একা।

তবুও হাসলাম।

মানুষের স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার কথাগুলো থেকে যায়। এমনকি তার বলা সাধারণ কথাগুলোও।

একসময় যে কথাগুলো শুনে বিরক্ত লাগত, পরে সেই কথাগুলোর জন্যই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।

সে আমাকে ভাইয়া ডাকত।

ডাকটা খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু সে যেভাবে ডাকত, সেটা সাধারণ ছিল না।

একটু টেনে।

একটু দুষ্টুমি করে।

কখনো সামনে থেকে বলত,

ভাইয়া।

আমি তাকালেই হাসত।

আমি বলতাম,

কী?

সে বলত,

কিছু না।

আমি বলতাম,

তাহলে ডাকলে কেন?

সে বলত,

ডাকতে ইচ্ছে করছে তাই ডাকছি।

এই মেয়েটার যুক্তির কোনো ঠিক ছিল না।

তবে তার সব যুক্তি আমি মেনে নিতাম।

একদিন খুব বৃষ্টি হলো।

সেদিন আমি বাইরে ছিলাম।

ছাতা ছিল না।

সত্যি বলতে কী, ছাতা থাকলেও হয়তো ব্যবহার করতাম না।

বৃষ্টিতে ভিজতে আমার ভালো লাগে।

বৃষ্টিতে ভিজলে মনে হয়, পৃথিবীটা কিছুক্ষণের জন্য মানুষকে ক্ষমা করে দিয়েছে।

রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়।

দোকানের শাটারের নিচে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।

রিকশাগুলো ধীরে চলে।

গাছের পাতাগুলো ধুয়ে যায়।

শহরটা কিছুক্ষণের জন্য খুব শান্ত হয়ে যায়।

সেদিনও আমি ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরলাম।

দরজার সামনে দাঁড়াতেই সে দরজা খুলে দিল।

আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

আবার ভিজে এসেছো।

আমি বললাম,

হুম।

সে বলল,

ছাতা ছিল না?

আমি বললাম,

ছিল।

সে অবাক হয়ে বলল,

ছিল?

হ্যাঁ।

তাহলে ব্যবহার করো নাই কেন?

আমি বললাম,

বৃষ্টিটা সুন্দর ছিল।

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

তুমি আসলেই একটা পাগল।

আমি বললাম,

জানি।

সে আর কিছু বলল না।

ভেতরে গিয়ে একটা টাওয়াল নিয়ে এল।

তারপর আমার মাথা মুছতে শুরু করল।

আমি বললাম,

দাও, আমি নিজেই মুছতে পারব।

সে বলল,

চুপ।

আমি আবার বললাম,

সত্যি বলছি, দাও।

সে এবার একটু রাগ করে বলল,

ভাইয়া, তুমি চুপ করে দাঁড়াও তো।

আমি চুপ করে গেলাম।

সে খুব যত্ন করে আমার চুল মুছছিল।

চুল থেকে পানি ঝরছিল।

তারপর কপাল মুছে দিল।

গাল মুছে দিল।

আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

সে বলল,

কী দেখো?

আমি বললাম,

তোমাকে।

সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

আমাকে দেখার কী আছে?

আমি বললাম,

আছে।

সে চোখ ছোট করে বলল,

কী আছে?

আমি বললাম,

অনেক কিছু আছে।

সে আর কথা বলল না।

শুধু মুচকি হাসল।

সেই হাসিটা আমি এখনো মনে করতে পারি।

কিছু কিছু হাসি মানুষের চোখে ছবি হয়ে থেকে যায়।

বৃষ্টি থামার পরও সেই ছবি মুছে যায় না।

সেদিন সে আমাকে শুকনো জামা এনে দিয়েছিল।

তারপর বলেছিল,

ঠান্ডা লাগবে।

আমি বলেছিলাম,

লাগবে না।

সে বলেছিল,

লাগবে।

আমি বলেছিলাম,

তুমি ডাক্তার নাকি?

সে বলেছিল,

ডাক্তার হতে হয় না। তোমাকে চিনি বলেই জানি।

আমি হাসলাম।

সে বলল,

এখন হাসছো। রাতে জ্বর এলে তখন বুঝবা।

আমি বললাম,

তখন তুমি থাকবে তো?

সে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

তারপর বলল,

থাকব।

কী অদ্ভুত।

একটা শব্দ।

থাকব।

সেদিন সেই শব্দটার কোনো মূল্য বুঝিনি।

আজ বুঝি।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর অর্থ মানুষ পরে বুঝতে শেখে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমরা জানালার পাশে বসেছিলাম।

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।

জানালার কাচে পানি জমে ছিল।

সে আঙুল দিয়ে কাচের ওপর একটা গোল দাগ করছিল।

আমি বললাম,

কী করছো?

সে বলল,

কিছু না।

আমি বললাম,

সবসময় কিছু না করো কেন?

সে বলল,

তুমি তো সবকিছুর উত্তর চাও।

আমি বললাম,

চাই।

সে বলল,

তাহলে বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করো।

আমি বললাম,

বৃষ্টি উত্তর দেবে?

সে বলল,

দেবে।

আমি বললাম,

কী উত্তর দেবে?

সে একটু ভেবে বলল,

যাকে মনে পড়ে, সে কাছে না থাকলেও তার কথা মনে থাকে।

আমি চুপ করে গেলাম।

সে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার চুলের কয়েকটা গোছা মুখের ওপর এসে পড়েছিল।

আমি হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েও দিলাম না।

কিছু কিছু মুহূর্তে মানুষ খুব সাধারণ একটা কাজ করতে গিয়েও ভয় পায়।

ভয় হয়, মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে যাবে।

আমাদের তখন কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না।

বড় কোনো পরিকল্পনাও ছিল না।

আমাদের সুখ ছিল খুব ছোট।

একসঙ্গে চা খাওয়া।

বৃষ্টিতে জানালার পাশে বসা।

আমি বাইরে থেকে ফিরলে তার টাওয়াল এগিয়ে দেওয়া।

আমার দেরি হলে তার রাগ করা।

আমি অসুস্থ হলে তার চিন্তা করা।

আর মাঝে মাঝে সেই দুষ্টুমি করে বলা,

ভাইয়া।

আমি কখনো তাকে জিজ্ঞেস করিনি,

তুমি আমাকে এত যত্ন করো কেন?

জিজ্ঞেস করলে হয়তো সে হাসত।

হয়তো বলত,

জানি না।

অথবা হয়তো বলত,

তুমি বুঝবে না।

মানুষ অনেক সময় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো করে না।

কারণ সে ধরে নেয়, সময় আছে।

পরে জিজ্ঞেস করবে।

পরে কথা বলবে।

পরে দেখা হবে।

পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু সেই পরে সবসময় আসে না।

একদিন সে সত্যিই চলে গেল।

কোথায় গেল, কেন গেল, সেটা এই গল্পে বলার মতো কোনো সুন্দর উত্তর নেই।

শুধু এটুকু সত্যি, তার পর থেকে বৃষ্টি আমার কাছে আর আগের মতো নেই।

বৃষ্টি এখনো সুন্দর।

কিন্তু বৃষ্টির সৌন্দর্যের মধ্যে একটা কষ্ট মিশে গেছে।

আজও বৃষ্টি হলে মনে হয়, দরজাটা খুলবে।

সে দাঁড়িয়ে থাকবে।

হাতে টাওয়াল।

চোখে রাগ।

মুখে হাসি।

বলবে,

আবার ভিজে এসেছো ভাইয়া?

আমি হয়তো বলব,

হুম।

সে বলবে,

ছাতা ছিল না?

আমি বলব,

ছিল।

সে বলবে,

ব্যবহার করো নাই কেন?

আমি বলব,

বৃষ্টি সুন্দর ছিল।

তারপর সে হয়তো আগের মতোই মাথা নাড়বে।

বলবে,

তুমি আসলেই একটা পাগল।

আমি বলব,

জানি।

তারপর সে আমার মাথা মুছে দেবে।

এই কল্পনাটা আমি মাঝে মাঝে এত স্পষ্টভাবে দেখি যে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাই, আমি একা।

তারপর হঠাৎ বাস্তবতা ফিরে আসে।

ঘরটা নীরব।

জানালার পাশে কেউ নেই।

টেবিলে এক কাপ ঠান্ডা চা।

বাইরে বৃষ্টি।

আর আমার ভেতরে অনেক পুরোনো একটা বিকেল।

আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াই।

বৃষ্টির দিকে তাকাই।

অনেকক্ষণ।

তারপর খুব আস্তে বলি,

তুমি কি জানো, তোমার সেই টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছে দেওয়ার স্মৃতিটা আজও আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভালোবাসাগুলোর একটা?

তুমি কি জানো, তোমার সেই দুষ্টুমি করে ভাইয়া ডাকাটা আজও আমার কানে বাজে?

তুমি কি জানো, জানালার পাশে তোমার সঙ্গে বসে বৃষ্টি দেখার সেই সময়টুকুর জন্য আজও আমার মন খারাপ করে?

সম্ভবত সে কিছুই জানে না।

হয়তো জানে।

কে জানে।

ভালোবাসার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মানুষ চলে যাওয়ার পরও ভালোবাসা চলে যায় না।

বরং কখনো কখনো আরও গভীর হয়।

কারণ তখন ভালোবাসার সঙ্গে মিশে যায় স্মৃতি।

আর স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায় আফসোস।

কেন সেদিন একটু বেশি সময় তার পাশে বসিনি?

কেন তার হাতটা ধরে বলিনি, তুমি আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ?

কেন তাকে বলিনি, বৃষ্টি যতবার আসবে, তোমাকে আমার মনে পড়বে?

কেন?

এই কেনগুলোর কোনো উত্তর নেই।

বৃষ্টি হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর জানে।

তাই বৃষ্টি এলে আমি জানালার পাশে বসি।

চুপ করে থাকি।

কখনো চোখ বন্ধ করি।

তারপর মনে মনে একটা পুরোনো দরজা খুলি।

দরজার ওপাশে সে দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে একটা টাওয়াল।

মুখে সেই পরিচিত হাসি।

সে বলছে,

ভাইয়া, আবার বৃষ্টিতে ভিজে এসেছো?

আমি হেসে বলি,

হুম।

সে মাথা নাড়ে।

তারপর আমার মাথা মুছতে শুরু করে।

বাইরে বৃষ্টি পড়ে।

জানালার পাশে আমরা দুজন বসে থাকি।

কেউ কোনো কথা বলে না।

কারণ কিছু ভালোবাসার গল্পে শেষ পর্যন্ত কোনো সংলাপ থাকে না।

শুধু বৃষ্টি থাকে।

একটা জানালা থাকে।

দুজন মানুষের পাশাপাশি বসে থাকার স্মৃতি থাকে।

আর থাকে একজন মানুষ, যে অনেক দূরে চলে গিয়েও বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় ফিরে আসে।

আমার জীবনে সে ঠিক তেমনই।

বৃষ্টি হলেই ফিরে আসে।

দরজা খুলে দাঁড়ায়।

হাতে টাওয়াল নেয়।

দুষ্টুমি করে বলে,

ভাইয়া।

আর আমি বুঝতে পারি,

কিছু মানুষকে কখনো হারানো যায় না।

তারা আমাদের জীবনে না থেকেও থেকে যায়।

খুব নিঃশব্দে।

খুব গভীরভাবে।

ঠিক বৃষ্টির মতো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart