বিদেশের ব্যস্ত জীবন কখনো কখনো মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়। চারপাশে অনেক মানুষ থাকে, অনেক শব্দ থাকে, অনেক ব্যস্ততা থাকে, তবুও মনের ভেতরে কোথাও একটা নীরবতা জমে থাকে।সেই নীরবতার সময়গুলোতে আমার মন ছুটে যায় নয়টিলার মাজারের দিকে।
করের হাট থেকে কাছাকাছি পাহাড়ের কোলে থাকা এই জায়গাটি আমার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি যেন আমার নিজের সঙ্গে কথা বলার একটি জায়গা।
এখানে এলে মনে হয়, পাহাড়গুলো যেন মানুষের না বলা কথাগুলো শুনতে পারে।চারপাশে সবুজ পাহাড়। দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি। নিচ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে। মাঝে মাঝে গাড়ি চলে যায়, আবার সবকিছু আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ আর পাহাড়ের নীরবতা মিলে এখানে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে।বিদেশের ব্যস্ততা, জীবনের নানা চিন্তা, মনের ভেতরের অস্থিরতা, সবকিছু নিয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে যাই, তখন আমি সেখানে যাই। কিছুক্ষণ বসি। চোখ বন্ধ করি। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলি।
একদিনের কথা
সেদিনও আমি নয়টিলার মাজারে গিয়েছিলাম। উপরে বসে কিছুক্ষণ ধ্যান করলাম। তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম।সিঁড়িগুলো অনেক লম্বা। পাহাড়ের বুক চিরে নিচের রাস্তা পর্যন্ত নেমে গেছে। এক পাশে সবুজ পাহাড়, অন্য পাশে গভীর খাদ। দূরে গাড়িগুলো ছোট ছোট খেলনার মতো মনে হচ্ছিল।কিছুদূর নামার পর একটু ক্লান্ত লাগল। তাই একটি সিঁড়ির ধাপে বসে পড়লাম।ঠিক তখনই একটি ছেলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
ছেলেটিকে আগে কখনো দেখিনি। সাধারণ পোশাক। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল তার চোখ দুটি।সেখানে একটা লজ্জা ছিল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে করে বলল,স্যার, আমাকে একশো টাকা দেবেন? আমি পরে দিয়ে দেব। বাড়ি যাওয়ার ভাড়া নেই।কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু কথাটার ভেতরে যে কষ্ট ছিল, সেটা খুব সাধারণ ছিল না।আমরা প্রতিদিন কত মানুষকে দেখি। কেউ সাহায্য চায়, কেউ হাত বাড়ায়। কিন্তু সবাই একই রকম নয়। কারও হাতে চাওয়ার অভ্যাস থাকে, আবার কেউ অনেক কষ্টে নিজের আত্মসম্মান ধরে রেখে শেষবারের মতো সাহায্য চায়।এই ছেলেটির মধ্যে আমি সেই দ্বিতীয় মানুষটিকেই দেখেছিলাম।তার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে টাকা চাইতে আসেনি, সে আসলে তার একটা কঠিন সময় পার করার জন্য একটু আশ্রয় চাইতে এসেছে।আমি জানতাম, হয়তো এই টাকা আর আমার কাছে ফিরে আসবে না। হয়তো সে যে কথা বলেছে, তা রাখতে পারবে না।কিন্তু সেদিন আমি হিসাব করিনি।কারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় লাভ ক্ষতির হিসাব করতে হয় না।
আমি পকেট থেকে টাকা বের করে তাকে একশো টাকা নয়, পাঁচশো টাকা দিলাম।
ছেলেটি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো সে ভাবেনি এমন কিছু হবে। তারপর দুই হাত জোড় করে আমাকে ধন্যবাদ দিল।তার চোখে তখন যে কৃতজ্ঞতা দেখেছিলাম, সেটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া।সে চলে গেল।আমি বসে রইলাম সেই সিঁড়ির ধাপে।ভাবছিলাম, মানুষ আসলে কত অদ্ভুত। কারও কাছে পাঁচশো টাকা খুব সামান্য, আবার কারও কাছে সেটাই হতে পারে বাড়ি ফেরার সাহস।সেদিন নয়টিলার মাজারে আমি শুধু ধ্যান করতে যাইনি। সেদিন আমি একজন মানুষের ভেতরের কষ্ট দেখেছিলাম।আমরা অনেক সময় বড় বড় কাজ করার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু জীবন সবসময় বড় সুযোগ দেয় না।কখনো কখনো একটি ছোট সাহায্য, একটি ভালো কথা, একটি সহানুভূতির হাত, কারও জীবনে অনেক বড় আশার আলো হয়ে আসে।মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার কাছে কত টাকা আছে, তা নয়।মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, অন্য একজন মানুষের কষ্ট দেখে তার হৃদয় কতটা নরম হয়।
