খুব ছোটবেলার কথা। তখন স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার দিনগুলো আমার কাছে অন্যরকম ছিল। বই খাতা নিয়ে ভয়, তার চেয়েও বেশি ছিল মায়ের চোখের দিকে তাকালে পাওয়া এক ধরনের সাহস।
আমাদের সংসারে তখন অভাব ছিল। এমন অভাব, যার কথা কাউকে আলাদা করে বলতে হতো না। ঘরের জিনিসপত্র, চাল ডাল, বাজার সদাই, সবকিছুর মধ্যেই অভাবটা চুপচাপ বসে থাকত। বাবা খেতখামারে কাজ করতেন। সারাদিন পরিশ্রম করে যে টাকা হাতে আসত, তাতে সংসার চলত কোনো রকমে। ডিম ছিল আমাদের কাছে নিত্যদিনের খাবার নয়। ডিম মানে ছিল একটু ভালো কিছু। বিশেষ কোনো দিন।
সেদিন পরীক্ষায় যাওয়ার আগে মা আমার জন্য একটা ডিম ভেজে দিলেন।
ডিমটা ভাজার সময় আমি খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কড়াইয়ে ডিম পড়ার শব্দটা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। খুব সাধারণ একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে আমার শৈশবের কত কিছু যেন মিশে আছে।
মা ডিমটা ভাজছিলেন। আমি হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। পরীক্ষার আগে একটা ডিম ভাজি খেতে পারব, এই আনন্দটাও তখন কম ছিল না।
ঠিক তখনই পরিবারের একজন সদস্য পাশ থেকে মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ডিম ভাজি খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে পরীক্ষায় ডিম পাবা, আন্ডা পাবা।
কথাটা মজা করে বলা হয়েছিল কি না, সেটা আজ আর জানি না। কিন্তু শিশুমনে মজা আর কটাক্ষের পার্থক্য বোঝার বয়স তখন হয়নি। শুধু বুঝেছিলাম, আমার ডিম ভাজিটা নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে।
মা কিছু বললেন না।
শুধু হাসলেন।
মায়ের সেই হাসিটা আজও আমার মনে আছে।
সেটা আনন্দের হাসি ছিল না। আবার কষ্টের হাসিও ঠিক বলা যাবে না। যেন অভাবের সঙ্গে বহুদিন বসবাস করতে করতে মানুষ যে ধরনের হাসি শিখে যায়, সেই হাসি। যে হাসির মধ্যে প্রতিবাদ থাকে না, অভিযোগ থাকে না, থাকে শুধু মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত শক্তি।
মা হয়তো জানতেন, ডিম কেনাটা আমাদের সংসারের জন্য সহজ ছিল না। বাবা সারাদিন খেতে কাজ করেন। সংসারের কত খরচ। চাল লাগবে, ডাল লাগবে, লবণ লাগবে, কাপড় লাগবে। সেখানে সন্তানের পরীক্ষার আগে একটা ডিম কিনে দেওয়া, সেটাও যেন মায়ের কাছে একটা ছোটখাটো উৎসব।
আর সেই উৎসবটাকেই কেউ একজন কথার মধ্যে একটু ছোট করে দিলেন।
মা তবু হাসলেন।
আমি ডিমটা খেলাম।
তারপর স্কুলে চলে গেলাম পরীক্ষা দিতে।
সেদিনের পরীক্ষায় কী লিখেছিলাম, কত নম্বর পেয়েছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু ডিম ভাজিটার কথা মনে আছে। মায়ের মুখের সেই হাসিটাও মনে আছে।
জীবনে পরে অনেক দামি খাবার খেয়েছি। রেস্টুরেন্টে বসে অনেক রকমের খাবার সামনে এসেছে। কিন্তু সেই একটা ডিম ভাজির মতো কোনো খাবার আর কখনো মনে হয়নি।
কারণ খাবারটা শুধু ডিম ছিল না।
ওটার মধ্যে মায়ের ভালোবাসা ছিল।
বাবার সামর্থ্যের সীমা ছিল।
সংসারের অভাব ছিল।
আর ছিল একজন মায়ের নীরব চেষ্টা, সন্তান যেন অন্তত পরীক্ষার দিনটায় মনে করে, তার জন্যও কিছু একটা ভালো আছে।
সেদিনের পর আর কতদিন ডিম ভাজি খেয়েছি, তার হিসাব নেই। সত্যি বলতে, তেমন খাওয়াই হয়নি। আমাদের সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা জিনিস বুঝেছি।
গরিব মানুষের ঘরে খাবার কখনো শুধু খাবার থাকে না। একটা ডিম কখনো কখনো মায়ের ভালোবাসার সমান হয়ে যায়। একটা নতুন জামা হয়ে যায় বাবার সারাদিনের ঘাম। আর একমুঠো ভাত হয়ে যায় সংসারের সমস্ত না বলা ভালোবাসা।
তাই আজও কোথাও ডিম ভাজার গন্ধ পেলে আমার মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
মা কড়াইয়ে ডিম ভাজছেন।
আমি চুপ করে তাকিয়ে আছি।
পাশ থেকে কেউ একজন কথা বলছেন।
মা কিছু বলছেন না।
শুধু হাসছেন।
সেই হাসির মানে আমি তখন বুঝিনি।
এখন বুঝি।
ওটা ছিল অভাবের সামনে মায়ের হাসি।
সন্তানের সামনে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখার হাসি।
আর হয়তো পৃথিবীকে না জানিয়ে মাকে বলার মতো একটা কথা ছিল, আমার সন্তান যেন অন্তত আজকে মনে করে, তার মা তার জন্য কিছু করতে পেরেছে।
