
আজকে যদি একজন হিন্দু মারা যায়, কাল নিরাপদ থাকবে না কোনো মুসলমান। পরশু নিরাপদ থাকবে না কোনো মানুষ।কথাটা মনে রাখবেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কখনো একজনকে মেরে থেমে থাকে না। আগুন যখন ঘরে লাগে, সে ঘরের মালিকের ধর্ম দেখে পোড়ে না। আজ যে মানুষটা হিন্দু বলে আক্রান্ত হচ্ছে, কাল একই উগ্রতার শিকার হতে পারে একজন মুসলমান, একজন বৌদ্ধ, একজন খ্রিস্টান, একজন নাস্তিক, এমনকি একজন সাধারণ মানুষও।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু কোনো একটি ধর্মের মানুষের ওপর হামলা নয়। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মানুষ যখন অন্য মানুষের কষ্ট দেখে চুপ থাকতে শেখে।আজ যদি আমরা বলি, হিন্দু মরছে, আমার কী, তাহলে কাল অন্য কেউ মরলে আরেকজন বলবে, আমার কী। এইভাবে একটা সমাজ ধীরে ধীরে মানুষের সমাজ থেকে উগ্রতার সমাজে পরিণত হয়।বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব নিয়েও নিরাপত্তা সতর্কতা রয়েছে।তাই আজ হিন্দুর নিরাপত্তার প্রশ্নটা শুধু হিন্দুর প্রশ্ন না। এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কারণ রাষ্ট্র যদি একজন নাগরিককে তার ধর্মের কারণে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই নিরাপদ থাকে না।আমি কোনো ধর্মকে দায়ী করছি না। ইসলাম কোনো অপরাধীর ব্যক্তিগত উগ্রতাকে সমর্থন করে না, হিন্দুধর্মও করে না, বৌদ্ধধর্মও করে না, খ্রিস্টধর্মও করে না, ইহুদিধর্মও করে না। অপরাধীর পরিচয় আগে অপরাধী, তার ধর্ম পরে।আমাদের ভয়টা এখানেই, যদি বিচারহীনতা চলতে থাকে, যদি উগ্রবাদীরা বারবার সাহস পায়, যদি মানুষ ধর্মের নামে মানুষকে শত্রু ভাবতে শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশে শুধু সংখ্যালঘুরাই বিপদে পড়বে না, পুরো সমাজের মানবিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।আজ হিন্দুকে বাঁচানো মানে শুধু একজন হিন্দুকে বাঁচানো নয়। আজ হিন্দুকে বাঁচানো মানে আগামী দিনের মুসলমানকে বাঁচানো। বৌদ্ধকে বাঁচানো। খ্রিস্টানকে বাঁচানো। নাস্তিককে বাঁচানো। সর্বশেষে মানুষকে বাঁচানো।বাংলাদেশ কোনো উগ্রবাদীর দেশ না। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় সন্ত্রাসীর দেশও না। এই দেশ কৃষকের, শ্রমিকের, জেলের, ছাত্রের, মায়ের, বাবার, হিন্দুর, মুসলমানের, বৌদ্ধের, খ্রিস্টানের, সবার।কেউ যদি ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কেউ যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের নামে মানুষ হত্যা করে, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। কেউ যদি বিদেশি কোনো শক্তির স্বার্থে বাংলাদেশের মাটিকে অশান্ত করতে চায়, তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।কারণ বাংলাদেশকে বাঁচানোর একটাই পথ, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।আজ যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তাহলে বাংলাদেশ বাঁচবে। আর যদি আজ একজনের মৃত্যুতে আমরা চুপ থাকি, কাল সেই নীরবতার আগুন আমাদের দরজায়ও এসে দাঁড়াতে পারে।হিন্দু মরলে বাংলাদেশ মরে। মুসলমান মরলে বাংলাদেশ মরে। মানুষ মরলে বাংলাদেশ মরে।তাই ধর্ম নয়, উগ্রবাদকে প্রতিরোধ করুন। মানুষকে নয়, অপরাধীকে ঘৃণা করুন। প্রতিশোধ নয়, বিচার চাইুন। আর বাংলাদেশের মাটিতে এমন একটা সমাজ তৈরি করুন, যেখানে মানুষের পরিচয় তার ধর্ম দিয়ে নয়, তার মানবিকতা দিয়ে হবে।