Ecommerce/blog/news portal

প্রুশিয়ান পদ্ধতি বাংলাদেশ থেকে উঠে যাক

১. প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে কীপ্রুশিয়া ছিল মধ্য ইউরোপের একটি শক্তিশালী রাজ্য, যার কেন্দ্র ছিল জার্মান অঞ্চলে। ১৮ শতকের শেষভাগ এবং ১৯ শতকের শুরুতে সেখানে রাষ্ট্রের অধীনে একটি সংগঠিত গণশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে।এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল,শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে যাওয়া,নির্দিষ্ট শ্রেণি অনুযায়ী পড়াশোনা,একটি নির্ধারিত পাঠ্যক্রম,প্রশিক্ষিত শিক্ষক,শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় তদারকি,পরীক্ষা,শৃঙ্খলা,নিয়মিত সময়সূচি,এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।১৭১৭ সালের একটি আদেশে স্কুলে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছিল। তবে সেটি বাস্তবে অনেক জায়গায় দুর্বলভাবে কার্যকর হয়েছিল। ১৭৬৩ সালে ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের সময়ের Generallandschulreglement বা General School Regulation ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত করে। পরবর্তী সময়ে ১৭৯৪ সালের আইন এবং ১৯ শতকের সংস্কারগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করে।অর্থাৎ, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন আইন, সংস্কার এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে।২. কেন প্রুশিয়া এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিলএখানেই বিষয়টা সবচেয়ে আকর্ষণীয়।অনেক জায়গায় বলা হয়, প্রুশিয়া নাকি শুধু কারখানার শ্রমিক বানানোর জন্য স্কুল তৈরি করেছিল। এই কথাটা অতিরঞ্জিত এবং ইতিহাসের দিক থেকে পুরোপুরি নির্ভুল নয়।প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য একসঙ্গে কাজ করেছিল।প্রথমত, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা।দ্বিতীয়ত, জনগণের মধ্যে মৌলিক সাক্ষরতা তৈরি করা।তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ নাগরিক তৈরি করা।চতুর্থত, প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থার জন্য শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা।পঞ্চমত, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলা তৈরি করা।১৮০৬ সালে নেপোলিয়নের কাছে প্রুশিয়ার পরাজয়ের পর শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রয়োজন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর উইলহেল্ম ফন হামবোল্টসহ সংস্কারকরা শিক্ষা নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।অর্থাৎ ব্যাপারটা শুধু,স্কুল বানিয়ে শ্রমিক তৈরি করা।এত সরল ছিল না।বরং বলা যায়,রাষ্ট্রকে আধুনিক করার জন্য জনগণকে সংগঠিতভাবে শিক্ষিত করা।৩. এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কী ছিলএখানে আপনি আজকের স্কুলের সঙ্গে অনেক মিল দেখতে পাবেন।বয়স অনুযায়ী শ্রেণিএকই বয়সের শিশুদের একসঙ্গে রাখা।নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমসব শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট বিষয় শেখানো।প্রশিক্ষিত শিক্ষকশিক্ষকতা শুধু কেউ জানে আর অন্যকে পড়ায়, এমন বিষয় না রেখে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।নিয়মিত পরীক্ষাশিক্ষার্থীর জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরি হয়।রাষ্ট্রীয় তদারকিশিক্ষা শুধু পরিবার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয় না হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়।শৃঙ্খলাসময় মেনে স্কুলে যাওয়া, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানার ওপর গুরুত্ব ছিল।নাগরিক তৈরিশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পড়তে লিখতে শেখানো নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপযোগী নাগরিক তৈরি করাও ছিল।এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনেকগুলো পরবর্তীতে ইউরোপ, আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের গণশিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে প্রবেশ করে।৪. আমেরিকাতেও এর প্রভাব পড়েছিলএটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ইতিহাস।আমেরিকার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ হোরেস ম্যান ১৮৪০ এর দশকে ইউরোপ ভ্রমণ করেন এবং প্রুশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।তারপর তিনি Massachusetts এর শিক্ষা সংস্কারে প্রুশিয়ান অভিজ্ঞতার কিছু বিষয় ব্যবহার করার পক্ষে অবস্থান নেন।বিশেষ করে,প্রশিক্ষিত শিক্ষক,সবার জন্য সাধারণ শিক্ষা,রাষ্ট্রীয় সহায়তা,শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ,এবং একটি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা।এসব ধারণা আমেরিকার public school আন্দোলনে প্রভাব ফেলে।অর্থাৎ আজ আমরা যে mass public education বা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় স্কুলব্যবস্থা দেখি, তার ইতিহাসে প্রুশিয়ার ভূমিকা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।৫. তাহলে স্কুল কি আসলে মানুষকে বাধ্য, অনুগত এবং একই রকম বানানোর জন্য তৈরি হয়েছিলএখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি আছে।প্রুশিয়ান ব্যবস্থার মধ্যে শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সামাজিক দায়িত্বের ওপর জোর ছিল, এটা ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন করা যায়। আধুনিক গবেষণাতেও দেখা যায় যে প্রুশিয়ার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্র গঠন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।কিন্তু ইন্টারনেটে প্রচলিত একটি গল্প আছে,প্রুশিয়া কারখানার জন্য বাধ্য শ্রমিক বানাতে স্কুল তৈরি করেছিল।এই দাবিটা খুব সাবধানে নিতে হবে।কারণ প্রুশিয়ান গণশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকটাই এমন সময়ে তৈরি হয় যখন আধুনিক শিল্পকারখানা আজকের অর্থে এখনও বিকশিত হয়নি। গবেষণায় বরং রাষ্ট্র নির্মাণ, সামরিক প্রয়োজন, প্রশাসনিক দক্ষতা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা যায়।তাই আমি এটাকে এভাবে বলব,প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্র নির্মাণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু এটাকে শুধু শ্রমিক বানানোর কারখানা বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।৬. প্রুশিয়ান মডেলের একটা অন্ধকার দিকও ছিলএটা স্বীকার করা জরুরি।শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসার ফলে শিক্ষা যেমন সবার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে, তেমনি রাষ্ট্র চাইলে শিক্ষাকে নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করতে পেরেছে।এর একটি পরিষ্কার উদাহরণ হলো প্রুশিয়ার পোলিশ জনগোষ্ঠী।১৯ শতকের শেষ দিকে প্রুশিয়ার কিছু অঞ্চলে স্কুলকে জার্মান ভাষা ও জার্মান জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। পোলিশ শিশুদের জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, এর ফলে অনেক পোলিশ পরিবারের মধ্যে স্কুলের বিরুদ্ধে বিরূপতাও তৈরি হয়েছিল।অর্থাৎ,শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করতে পারে, আবার রাষ্ট্রের হাতে গেলে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট চিন্তার মধ্যে ঢোকানোর মাধ্যমও হতে পারে।এই জায়গাটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।৭. এখন আসি আপনার বলা আরেকটি সম্ভাব্য শব্দে, ফ্রেইরিয়ান শিক্ষাআপনি যদি আসলে Freirean Education শুনে থাকেন, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।এর নাম এসেছে ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে থেকে।তার বিখ্যাত বই Pedagogy of the Oppressed।ফ্রেইরে প্রচলিত এমন শিক্ষার সমালোচনা করেন যেখানে,শিক্ষক সব জানেন,ছাত্র কিছু জানে না,শিক্ষক জ্ঞান ছাত্রের মাথায় ঢুকিয়ে দেন,ছাত্র মুখস্থ করে,পরীক্ষা দেয়,তারপর আবার ভুলে যায়।ফ্রেইরে এই পদ্ধতিকে Banking Model of Education বলে সমালোচনা করেছিলেন।তার পরিবর্তে তিনি চেয়েছিলেন,শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী দুজনেই প্রশ্ন করবে, আলোচনা করবে, বাস্তব জীবনকে বিশ্লেষণ করবে এবং একসঙ্গে জ্ঞান তৈরি করবে।এখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়।বরং,মানুষ যেন নিজের সমাজকে বুঝতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে পারে।এটাকে বলা হয় critical consciousness, বাংলায় বলা যায় সমালোচনামূলক সচেতনতা।৮. প্রুশিয়ান আর ফ্রেইরিয়ান মডেলের পার্থক্যবিষয়প্রুশিয়ান মডেলফ্রেইরিয়ান মডেলমূল চিন্তাসংগঠিত গণশিক্ষামুক্তিকামী শিক্ষাশিক্ষককর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা বেশিসংলাপের অংশীদারছাত্রনির্ধারিত পাঠ অনুসরণ করেপ্রশ্ন ও আলোচনায় অংশ নেয়পাঠ্যক্রমনির্দিষ্ট ও কাঠামোবদ্ধবাস্তব জীবন ও সমস্যাভিত্তিকশৃঙ্খলাগুরুত্বপূর্ণস্বাধীন চিন্তা গুরুত্বপূর্ণপরীক্ষাগুরুত্বপূর্ণপরীক্ষার চেয়ে শেখার প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণউদ্দেশ্যশিক্ষিত ও সংগঠিত নাগরিকসচেতন ও সমালোচনামূলক মানুষরাষ্ট্রের ভূমিকাশক্তিশালীক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করার সুযোগফ্রেইরিয়ান শিক্ষায় সংলাপ, সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে আরও সমতাভিত্তিক করার ওপর জোর দেওয়া হয়।৯. তাহলে আপনি সম্ভবত কোনটার কথা শুনেছেনআমার গবেষণার ভিত্তিতে আমার প্রথম অনুমান হচ্ছে আপনি Prussian Education System বা প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থার কথা শুনেছেন।কারণ বাংলায় কেউ ইংরেজি Prussian model of education উচ্চারণ করলে সেটা অনেকের কানে,প্রুশিয়ান,ফ্রুশিয়ান,ফার্সিয়ান,ফ্রেশিয়ান,এরকম শোনাতে পারে।আর এই মডেল নিয়েই বর্তমানে প্রচুর আলোচনা হয়, বিশেষ করে কেন আধুনিক স্কুলে একই বয়সের শিশু একই শ্রেণিতে বসে, কেন ঘণ্টা বাজে, কেন নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস, নির্দিষ্ট সিলেবাস, পরীক্ষা, গ্রেড, শিক্ষক এবং নিয়ম, এসবের ইতিহাস কোথা থেকে এসেছে, এই প্রশ্নে।১০. কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো অন্য জায়গায়প্রুশিয়ান মডেল আমাদের একটা বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।শিক্ষার উদ্দেশ্য আসলে কী।শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু,চাকরি পাওয়া,পরীক্ষায় পাস করা,ডিগ্রি পাওয়া,ভালো বেতন পাওয়া।নাকি,মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো,প্রশ্ন করতে শেখানো,ভুল থেকে শিখতে শেখানো,অন্য ধর্মের মানুষকে সম্মান করতে শেখানো,অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখানো,নিজেকে চিনতে শেখানো,এবং নিজের সমাজকে একটু ভালো করার ক্ষমতা তৈরি করা।আমার গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নে, আধুনিক শিক্ষার সবচেয়ে ভালো পথ সম্ভবত একটি মাত্র পুরনো মডেলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়।প্রুশিয়ান মডেল থেকে নেওয়া যায় গণশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কাঠামো, শৃঙ্খলা এবং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ।আর ফ্রেইরে থেকে নেওয়া যায় প্রশ্ন করা, সংলাপ, স্বাধীন চিন্তা, বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষা যুক্ত করা এবং সমালোচনামূলক সচেতনতা।দুটোর ভালো দিক মিলিয়ে এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব যেখানে শিশু শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ে না, জীবনের জন্য শেখে।এটাই আমার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা দর্শন।একটা গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনআপনি যদি কোথাও শুনে থাকেন যে প্রুশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত কারখানার জন্য বাধ্য ও অনুগত শ্রমিক বানানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, তাহলে সেই কথাটা সরাসরি সত্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ইতিহাস অনেক বেশি জটিল। প্রুশিয়ান শিক্ষার মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং আনুগত্যের বিষয় সত্যিই ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে সাক্ষরতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নাগরিক শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়োজনও গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart