কিছু কিছু জায়গা ছেড়ে আসার পরও মানুষ সেখান থেকে পুরোপুরি বের হতে পারে না। শরীরটা চলে আসে, জীবনটা বদলে যায়, কিন্তু মনের ভেতর একটা দরজা খোলা থেকে যায়। মাঝরাতে কখনো কখনো সেই দরজার ওপাশ থেকে পুরোনো দিনের শব্দ আসে।
নিজামপুর কলেজ হোস্টেলের কথা মনে পড়লে আমারও মাঝে মাঝে এমন হয়।
বিশেষ করে সেই রাতটার কথা।
কোন রাত, সেটা আজ আর ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে, রাত অনেক হয়েছিল। আমরা কয়েকজন জুয়েল ভাইয়ের রুমে বসে গল্প করছিলাম। বাইরে হোস্টেল প্রায় নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। আর আমাদের ঘরের ভেতর চলছিল গল্প, হাসাহাসি আর জীবনের নানা বিষয়ে বড় বড় আলোচনা।
জুয়েল ভাই ছিলেন আমাদের চেয়ে বড়। আবুর হাটের মানুষ। দেখতে সুন্দর, স্মার্ট। রাজনীতি করতেন। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি কিছু। বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন। রাতে আমরা প্রায়ই তার ঘরে গিয়ে বসতাম। তিনি গল্প করতেন, পরামর্শ দিতেন, রাজনীতি থেকে শুরু করে জীবন, প্রেম, মানুষ, ভবিষ্যৎ, কত কিছু নিয়েই কথা হতো।
তখন বুঝিনি, ওই আড্ডাগুলোই একদিন আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে দামি স্মৃতি হয়ে যাবে।
আমাদের হোস্টেলটা ছিল দোতলা। আমরা থাকতাম দোতলার একেবারে কোনার রুমে। নিচতলায় থাকতেন বাদল স্যার ও তার পরিবার। স্যারের স্ত্রীকে আমরা ভাবি বলে ডাকতাম। তাদের ছোট্ট একটা ছেলে ছিল।
স্যার যখন হোস্টেলে থাকতেন না, তখন আমাদের সাহস একটু বেড়ে যেত।
দোতলায় কয়েকজন বন্ধু মিলে গান ধরতাম। ভাবি শুনছেন, এটা আমরা জানতাম। কিন্তু সামনে গিয়ে গান শোনানোর সাহস ছিল না।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে যদি হঠাৎ ভাবির সঙ্গে দেখা হয়ে যেত, আমরা এমন লজ্জা পেতাম যেন গান গাওয়াটা কোনো অপরাধ ছিল।
অথচ দোতলায় ফিরে দরজা বন্ধ করলেই আবার গান শুরু।
হোস্টেলের পাশে ছিল একটা বিশাল পুকুর। পুকুরটার ওপাশে ছিল একটা মেয়ের বাড়ি। মেয়েটা মাঝে মাঝে গেটে আসত।
আমরা এ গেট থেকে ওই গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
কথা হতো না।
কাছেও যেতাম না।
শুধু দূর থেকে দেখা।
আজকের ছেলেমেয়েরা হয়তো এটাকে প্রেম বলবে না। কিন্তু আমাদের সময়ে একটা মেয়েকে দূর থেকে দেখাও অনেক বড় ঘটনা ছিল।
আর ছিল আমাদের বুড়ি আন্টি।
মেসে তিনি রান্না করতেন। আমরা নিজামপুরের কাঁচাবাজার থেকে মাছ, শাকসবজি কিনে এনে দিতাম। তিনি সেগুলো দিয়ে রান্না করতেন।
সকালে থাকত ফান্তা ভাত। আগের রাতের ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। সঙ্গে আলু ভাজি, কখনো শাক, কখনো ডাল দিয়ে রান্না করা শাক।
এখন পৃথিবীর কত দামি খাবার খেয়েছি, কিন্তু সেই ফান্তা ভাত আর আলু ভাজির স্বাদ আর কোথাও পাইনি।
একদিন আন্টি যে শাক রান্না করেছিলেন, তার স্বাদ এখনো মনে আছে। মনে হয়, সেই স্বাদটা আসলে শাকের ছিল না।
ছিল ক্ষুধার।
ছিল বন্ধুত্বের।
ছিল তারুণ্যের।
আর ছিল এমন একটা সময়ের, যে সময়টা আমরা তখন একেবারেই সাধারণ বলে মনে করতাম।
তবে আমাদের হোস্টেলের সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা ছিল আমগাছটার নিচে।
ভয়ংকর অবশ্য ভূতের জন্য নয়।
বন্ধুদের জন্য।
একদিন চার পাঁচজন বন্ধু মিলে আমগাছের নিচে বসে গল্প করছি। সবার পরনে লুঙ্গি।
হঠাৎ একজন বলল, তুই গাছের ডাল ধরে ঝুলে থাক তো, দেখি কতক্ষণ পারিস।
আমি সাহস করে ডাল ধরে ঝুলে পড়লাম।
তারপর যা হওয়ার তাই হলো।
বন্ধুরা আমার লুঙ্গিতে টান দিল।
এক মুহূর্তে আমি গাছের ডালে ঝুলছি, আর নিচে বন্ধুরা হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
আমি তখন বুঝলাম, জীবনে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস শত্রু নয়।
কখনো কখনো বন্ধু।
সেই ঘটনার পর বহুদিন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে।
আজও মনে পড়লে হাসি পায়।
তারপর একদিন কলেজ মাঠে কনসার্ট হলো।
পুরো মাঠ মানুষে ভরে গেল। চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন রবি চৌধুরী, ছিলেন আতিক হাসান, সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীরাও।
তখন আসিফ আকবরের ও প্রিয়া তুমি কোথায় গানটা তুমুল জনপ্রিয়।
মাইকে গানটা বাজতেই মনে হলো, পুরো মাঠের ওপর যেন অন্য একটা পৃথিবী নেমে এসেছে।
হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে আলো, গান, চিৎকার, হাসি। আমাদের বয়স কম। সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে।
আমরা জানতাম না, জীবন আসলে কত দ্রুত বদলে যায়।
সেই রাতটা শেষ হলো।
কনসার্ট শেষ হলো।
আমরাও হোস্টেলে ফিরে গেলাম।
তারপর একদিন কলেজ শেষ হয়ে গেল।
হোস্টেল ছাড়লাম।
একজন একদিকে চলে গেল, আরেকজন অন্যদিকে।
জুয়েল ভাই কোথায় গেলেন, বাদল স্যার কোথায় আছেন, ভাবি কেমন আছেন, সেই ছোট ছেলেটা কত বড় হয়েছে, বুড়ি আন্টি বেঁচে আছেন কি না, কিছুই আর জানি না।
অনেক বছর পর একদিন নিজামপুরে গেলাম।
হঠাৎ মনে হলো, হোস্টেলটা একবার দেখে আসি।
গিয়ে দাঁড়ালাম।
আর তখনই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো।
হোস্টেল আছে।
কিন্তু আমাদের হোস্টেল নেই।
দোতলার সেই কোনার রুম নেই।
জুয়েল ভাইয়ের ঘর নেই।
বাদল স্যারের থাকার জায়গা নেই।
বুড়ি আন্টির রান্নাঘর নেই।
এমনকি সেই আমগাছটাও নেই।
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন খুব আস্তে একটা গান ভেসে এলো।
ও প্রিয়া তুমি কোথায়।
আমি চমকে উঠলাম।
চারদিকে তাকালাম।
কেউ নেই।
কোনো মাইক নেই।
কোনো কনসার্ট নেই।
তখন বুঝলাম, গানটা বাইরে বাজছে না।
গানটা বাজছে আমার ভেতরে।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এতদিন আমি ভুল জায়গায় আমার অতীতকে খুঁজছিলাম।
আমি ভেবেছিলাম, হোস্টেলটা হয়তো আমাকে আমার পুরোনো দিনগুলো ফিরিয়ে দেবে।
আসলে হোস্টেল কখনোই সেই দিনগুলো ধরে রাখেনি।
দিনগুলো ধরে রেখেছিলাম আমরা।
আমাদের হাসির মধ্যে।
বন্ধুত্বের মধ্যে।
বুড়ি আন্টির ফান্তা ভাতের মধ্যে।
জুয়েল ভাইয়ের গল্পের মধ্যে।
গাছের ডালে ঝুলে থাকা সেই লজ্জার মধ্যে।
দূরের গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের চাহনির মধ্যে।
আর কলেজ মাঠে হাজার মানুষের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাওয়া সেই গানটির মধ্যে।
সেদিন ফিরে আসার সময় মনে হলো, মানুষ আসলে কোনো জায়গা থেকে চলে আসে না।
মানুষ শুধু জায়গাটা ছেড়ে আসে।
তারপর সেই জায়গাটা সারাজীবন মানুষের ভেতরে থেকে যায়।
নিজামপুর কলেজ হোস্টেলও তাই রয়ে গেছে।
কোনো দালানের মধ্যে নয়।
আমার স্মৃতির ভেতরে।
আর মাঝেমধ্যে গভীর রাতে মনে হয়, দোতলার সেই কোনার ঘরে আবার কয়েকজন ছেলে বসে আছে।
জুয়েল ভাই গল্প করছেন।
কেউ হাসছে।
কেউ গান ধরেছে।
নিচে বুড়ি আন্টি হয়তো ফান্তা ভাতের জন্য আলু ভাজছেন।
বাইরে সেই বিশাল কুকুরটা ডাকছে।
আর আমি চুপ করে বসে আছি।
ভাবছি, জীবনটা তখন কত ছোট ছিল।
আর স্বপ্নগুলো ছিল কত বড়।
আমরা শুধু জানতাম না, সেই দিনগুলোই একদিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে যাবে।
