
আমার বাবা খুব দরিদ্র মানুষ ছিলেন। দারিদ্র্য কী জিনিস, সেটা বুঝে ওঠার বয়স তখন আমার হয়নি। কিন্তু এখন পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, বাবার জীবনটা ছিল নদীর মতো, কখনো নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারেনি।
আমাদের পুরোনো বাড়ি ছিল গাঙের পাশে। শান্তির হাটের পশ্চিম দিকে যে গাঙটা ছিল, তার পাড়েই ছিল বাবাদের বাড়ি। বন্দে আলী ভূঁইয়া বাড়ি , দাদার বাড়ি। সেই বাড়ি, সেই উঠান, সেই মাটি, সবকিছু একদিন গাঙের পেটে চলে গেল।
গাঙ ঘর নেয়, উঠান নেয়, গাছ নেয়, মানুষের স্মৃতিও নিয়ে যায়। বাবা মা আমাদের সবাইকে নিয়ে তখন উঠে এলেন জামালপুরে। নানার বাড়িতে।
নানা আমাদের থাকার জন্য একটু জায়গা দিলেন। বাবা সেখানে একটা ঘর তুললেন। সেই ঘরেই আমরা থাকতে শুরু করলাম। যতদিন না অন্য জায়গায় একটু জমি কিনে নিজেদের একটা বাড়ি করা যায়, ততদিন সেই ঘরটাই ছিল আমাদের পৃথিবী।
আমি তখন খুব ছোট। কত ছোট ছিলাম, সেটা আজ আর মনে নেই। বয়সের হিসাব হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য মানুষের স্মৃতিতে বয়সের চেয়েও বেশি শক্ত হয়ে বেঁচে থাকে।
আমারও একটা দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভাসে।
আমি তখন বাবার কোলে ছিলাম। বাবা আমাকে কোলে নিয়ে উঠানে হাঁটছিলেন। উঠানের একপাশে একটা আমগাছ ছিল। বাবা হঠাৎ আমাকে কোলে রেখেই আমগাছের দিকে গেলেন। গাছ থেকে একটা আম পাড়বেন, তারপর আমাকে দেবেন।
কেন জানি না, সেই দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে আছে।
বাবা আম পাড়তে গেলেন। ঠিক তখনই নানী শুরু করে দিলেন গালিগালাজ, চিৎকার চেঁচামেচি । বাবা সেদিকে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেল।
আর সেই আমটা বাবা আমার জন্য আর পাড়লেন না।
আমটা পাড়া হলো না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পরও সেই আমটা আমার স্মৃতিতে পেকে আছে।
জীবনে আমি কত আম খেয়েছি, কত মিষ্টি ফল খেয়েছি, কত ভালো ভালো খাবার খেয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু ছোটবেলায় বাবার হাতে পাড়া সেই আমটা, যেটা আসলে কোনোদিন আমার হাতে আসেনি, সেটাই আজও আমার মনে সবচেয়ে বেশি রয়ে গেছে।
ছোটবেলায় ঘটনাটা হয়তো আমার কাছে ছিল একটা অপূর্ণতা। একটা ছোট্ট দুঃখ। একটা অদ্ভুত স্বপ্নের মতো স্মৃতি।
কিন্তু এখন বড় হয়ে বুঝি, ওই আমটা শুধু একটা আম ছিল না।
ওই আমের মধ্যে ছিল আমার বাবার দরিদ্র জীবন। ছিল আমাদের নদীভাঙা বাড়ি। ছিল গাঙের কাছে হারিয়ে যাওয়া শৈশব। ছিল নানার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া একটা পরিবার। ছিল বাবার সামান্য সামর্থ্যের মধ্যে সন্তানকে কিছু দেওয়ার চেষ্টা।
বাবা হয়তো সেদিন জানতেনই না, তাঁর পাড়া হয়নি যে আমটা, সেটা একদিন তাঁর সন্তানের স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল আম হয়ে থাকবে।
জীবন বড় অদ্ভুত।
কিছু জিনিস আমরা পেয়েও ভুলে যাই।
আর কিছু জিনিস কোনোদিন পাই না, অথচ সারাজীবন বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরি।
আমার বাবার সেই আমটা আজও আমার কাছে তেমনই একটা আম।
যে আম বাবা পাড়তে পারেননি, কিন্তু যেটা আমার শৈশবের উঠানে আজও ঝুলে আছে।