
আমি একজন লেখক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং দীর্ঘদিনের জ্যোতিষ ও নিউমেরোলজি-চর্চাকারী হিসেবে মানুষের জীবন, আচরণ এবং সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রহ-নক্ষত্র ও সংখ্যার প্রতীকী সম্পর্ককে নিজের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করি। আমার পর্যবেক্ষণে রাহু এমন একটি শক্তি, যাকে শুধু জন্মছকের কোনো একটি ঘরে বসিয়ে বিচার করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। রাহুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ক্ষেত্র হলো মানুষের মুখ, কথা এবং জিহ্বা। কারণ মুখ দিয়েই মানুষ নিজের চিন্তা প্রকাশ করে, প্রতিশ্রুতি দেয়, মানুষকে বিশ্বাস করায়, আবার কখনো নিজের কথার কারণেই নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনে।জ্যোতিষের এই প্রতীকী ব্যাখ্যা থেকে আমি মনে করি, মুখের রাহু যখন অশুভভাবে সক্রিয় হয়, তখন মানুষের কথাবার্তাতেও তার ছাপ পড়তে পারে। কথায় অসংযম আসে, অতিরঞ্জন বাড়ে, এমন কথা বলা হয় যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকে না। কখনো এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যা পরে রাখা সম্ভব হয় না। কখনো নিজের ভুল স্বীকার না করে কথার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। আর একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সীমিত থাকলেও, একজন রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।যেমন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উনার মুখের ভাষাই পতনের অন্যতম কারণ ছিল।বর্তমানে নতুন সরকারে ও অনেকেই আছেন যাদের রাহুর দশা চলছে এবং তাঁদের ও পতন নিশ্চিত।কারণ রাজনীতিতে কথাই একটি বড় অস্ত্র। একজন রাজনৈতিক নেতা একটি বক্তব্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন, আবার একটি ভুল বক্তব্য দিয়েই নিজের জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে পারেন। মুখের রাহু খারাপ হলে আমার জ্যোতিষীয় দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—মানুষ নিজের কথার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। কখন কী বলা উচিত, কী বলা উচিত নয়, কোথায় নীরব থাকা প্রয়োজন এই বোধটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।রাজনীতিতে এর ফল ভয়ংকর হতে পারে। একজন নেতা একদিন যে কথা বলেন, পরদিন তার সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে ফেলতে পারেন। একসময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরে অস্বীকার করতে পারেন। নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরও এমন কথা বলে ফেলতে পারেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয় এই নেতার কোন কথাটি সত্য?রাহুর আরেকটি বড় সমস্যা হলো কথা দিয়ে বাস্তবতাকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা। রাজনৈতিক জীবনে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বক্তব্য দিয়ে প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও, বাস্তবতাকে দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, মানুষের জীবনযাত্রা এসব বাস্তব বিষয় কোনো বক্তব্য দিয়ে চিরদিন আড়াল করা যায় না।মুখের রাহু যখন রাজনৈতিক জীবনে নেতিবাচকভাবে প্রকাশ পায়, তখন কথার মধ্যে অতিরিক্ত অহংকার, আক্রমণাত্মক ভাষা, অপমানজনক বক্তব্য, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। (আম্মার, আয়াস, মুসাদ্দেক ইত্যাদি )!নেতা হয়তো ভাবতে পারেন তিনি শক্তিশালী ভাষায় কথা বলে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।কিন্তু বাস্তবে সেই ভাষাই ধীরে ধীরে মানুষের বিরক্তি ও অনাস্থার কারণ হয়ে উঠতে পারে।আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।মুখ শুধু কথা বলার জায়গা নয়, রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশেরও জায়গা। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলেন, বিরোধীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, নিজের ভুল নিয়ে কী বলেন,এসবের মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক মানসিকতা প্রকাশ পায়।আমার জ্যোতিষ ও নিউমেরোলজির পর্যবেক্ষণে, রাহুর নেতিবাচক প্রভাব শুধু মিথ্যা বলা বা ভুল কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় একটি দিক হলো বিভ্রম সৃষ্টি করা। অর্থাৎ এমনভাবে কথা বলা, যাতে মানুষ মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রবণতা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসা, নিজের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অন্যের ব্যর্থতার কথা বলা, কিংবা জনগণের মূল সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া।এসবকেও রাহুর প্রতীকী ছায়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়।আর রাহু যখন অহংকারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তখন একজন রাজনৈতিক নেতা মনে করতে পারেন।তিনি যা বলবেন সেটিই সত্য, তার কথার বিরোধিতা করার অধিকার কারও নেই। সমালোচনা শুনতে না চাওয়া, নিজের ভুল স্বীকার না করা এবং সবসময় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা ধীরে ধীরে তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।এখানেই রাহুর সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনৈতিক দিকটি দেখা যায়। মুখের রাহু প্রথমে কথাকে নষ্ট করে, তারপর কথার বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করে, আর শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থাকে নষ্ট করতে পারে। আর রাজনীতিতে জনগণের আস্থা হারানোর চেয়ে বড় বিপদ খুব কমই আছে।একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য তাই শুধু ভালো বক্তা হওয়া যথেষ্ট নয়; তাকে কথার দায়িত্বও বুঝতে হয়। কারণ একজন সাধারণ মানুষ নিজের মুখের একটি ভুল কথার জন্য হয়তো কয়েকজন মানুষের কাছে বিব্রত হন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক বা বড় রাজনৈতিক নেতা ভুল কথা বললে তার প্রভাব পড়ে হাজার, লাখ কিংবা কোটি মানুষের ওপর।আমি একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে মনে করি, রাজনীতিতে কথার স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কথার দায়িত্বও প্রয়োজন। আর একজন অ্যাস্ট্রোলজি ও নিউমেরোলজি-চর্চাকারী হিসেবে আমার প্রতীকী পাঠ হলো—রাহুর শক্তি যখন মুখ ও জিহ্বার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তার নিজের কথার ওপর নিয়ন্ত্রণ।রাহু মানুষকে অনেক কিছু দিতে পারে।খ্যাতি, পরিচিতি, ক্ষমতা, প্রভাব, মানুষের মনোযোগ। কিন্তু সেই একই রাহু যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে মানুষ নিজের মুখ দিয়েই নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ তৈরি করতে পারে। নিজের বক্তব্যই একসময় তার রাজনৈতিক জীবনের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।তাই আমার দৃষ্টিতে রাজনীতিতে রাহুর সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো—কথা বলার আগে ভাবুন, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে হিসাব করুন, কাউকে অপমান করার আগে পরিণতি ভাবুন এবং জনগণকে কিছু বলার আগে নিজের কথার সত্যতা যাচাই করুন।কারণ রাজনীতিতে ক্ষমতা হারানোর আগে অনেক সময় মানুষ বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। আর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেলে ক্ষমতা থাকলেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা ধরে রাখা কঠিন।