একবার ওমান থেকে দেশে গেছি কয়েকমাসের জন্য । বিদেশে থাকি বলে আমার মানিব্যাগটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। বিদেশের টাকা, দেশীয় টাকা, প্রয়োজনীয় কার্ড, কাগজপত্র, সব সময় গুছিয়ে রাখি। তবে পাসপোর্ট আর বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ আইডি কার্ড কখনো মানিব্যাগে রাখি না। সেগুলো নিরাপদে বাড়িতেই রাখি।একদিন বাজারে গেলাম। সেদিন একটু বেশি বাজার করেছিলাম। কাঁচা বাজার, সবজি, মাছ, চাল ডাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সব মিলিয়ে রিকশাটা প্রায় বাজারের দোকান বানিয়ে ফেললাম। কোনো রকমে সব বাজার রিকশায় তুলে বাড়িতে চলে এলাম।বাড়িতে এসে একে একে সব বাজার নামালাম। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিলাম। সে চলে গেল। আমিও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মনে হলো, আরে, আমার মানিব্যাগ কই।পকেট হাতড়াই, এখানে নাই, ওখানে নাই। ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজি। শেষ পর্যন্ত মাথায় একটা কথাই এলো, মানিব্যাগটা হয়তো রিকশার সিটেই পড়ে আছে।রিকশাওয়ালাকে আমি চিনতাম। মুখ চেনা মানুষ। জানতাম সে নোয়াখালীর মানুষ এবং আমাদের এলাকায় রিকশা চালায়। কিন্তু তার বাড়িঘর কোথায়, সেটা জানতাম না।পনেরো দিন চলে গেল। রিকশাওয়ালার কোনো খবর নাই। মানিব্যাগেরও কোনো খবর নাই।একদিন এক বন্ধু বলল, ফেসবুকে একটা পোস্ট দাও। মানিব্যাগে থাকা আইডি কার্ডের ছবি দাও। কেউ পেয়ে থাকলে হয়তো যোগাযোগ করবে।বন্ধুর কথা শুনে ফেসবুকে পোস্ট দিলাম।পোস্ট দেওয়ার পর একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম। আমার কিছু শত্রু ছিল দেশে বিদেশে। তারা পোস্ট দেখে এমন খুশি হলো, মনে হলো আমার মানিব্যাগ না, আমার ভাগ্যই হারিয়ে গেছে।কেউ কেউ মনে মনে হয়তো ভাবছিল, লোকটার তো সব শেষ। পাসপোর্ট গেছে, বিদেশের আইডি গেছে, সব গেছে। এখন আর বিদেশে ফিরতে পারবে না।আমি চুপচাপ বসে তাদের আনন্দ উপভোগ করলাম।কারণ তারা জানত না, আমার পাসপোর্ট কিংবা ওমানের গুরুত্বপূর্ণ কোনো আইডি কার্ডই মানিব্যাগে ছিল না। মানিব্যাগে ছিল শুধু দেশের মোটরবাইকের একটা কার্ড, কিছু দেশীয় টাকা আর প্রায় তিনশো ওমানি রিয়েল।কয়েকদিন পর একদিন রাস্তা দিয়ে আসার সময় হঠাৎ দেখি, ওই রিকশাওয়ালা।আমি সঙ্গে সঙ্গে রিকশা থামালাম।রিকশায় তখন কয়েকজন যাত্রী ছিল। আমি তাদের বললাম, আপনারা একটু নেমে যান। এই লোকটার সঙ্গে আমার একটা হিসাব আছে।যাত্রীরা নেমে গেলেন।আমি রিকশাওয়ালাকে বললাম, তুমি থানায় চলো। তোমার বিরুদ্ধে মামলা করা আছে ।থানার কথা শুনেই লোকটার চেহারা পাল্টে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, স্যার, মানিব্যাগ আমার কাছে আছে।আমি বললাম, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে।সে বলল, স্যার, মানিব্যাগটা আমার কাছে ছিল। তবে বাড়িতে নাই। নোয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে রেখেছি।আমি তার সঙ্গে গেলাম। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখি, সত্যিই আমার মানিব্যাগ সেখানে।শ্বশুর শাশুড়ির সামনে সে মানিব্যাগটা বের করে দিল।মানিব্যাগ খুলে দেখি, আমার প্রায় ১০হাজার টাকা নাই। কিন্তু ওমানি টাকা আছে।সে স্বীকার করল, ওই টাকা সে রেখে দিয়েছে।আমি ভাবলাম, মানুষ ভুল করেছে। মানিব্যাগ ফেরত দিয়েছে। মামলা করে তাকে জেলে পাঠিয়ে কী লাভ।বরং তাকে দুই হাজার টাকা বকশিস দিয়ে বললাম, যাও, আর এমন কাজ করো না।সেদিন আমি আমার মানিব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।কাহিনি এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।কিন্তু আসল কাহিনি তখনও শুরু হয়নি।কয়েকদিন পর দেখি, সেই রিকশাওয়ালা আমাকে দেখলেই দূর থেকে সালাম দেয়। এমনভাবে সালাম দেয়, মনে হয় আমি তার বহুদিনের কোনো আত্মীয়।একদিন হঠাৎ আমার বাড়িতেও হাজির।এসে বলল, স্যার, আপনার মানিব্যাগ তো আমি ফেরত দিছি।আমি বললাম, হ্যাঁ, দিছো তো। এজন্যই তো তোমাকে দুই হাজার টাকা বকশিসও দিয়েছি।সে বলল, স্যার, আপনার মানিব্যাগে তো কুটি কুটি টাকা ছিল।আমি অবাক।বললাম, কুটি কুটি টাকা!সে বলল, জি স্যার। অনেক টাকা ছিল। আমারে আপনি মাত্র দুই হাজার টাকা দিছেন। আরো কিছু টাকা দেন।আমি তখন বুঝলাম, আসল রহস্যটা কোথায়।লোকটা জীবনে সম্ভবত ওমানি রিয়েল দেখেনি। মানিব্যাগ খুলে তিনশো ওমানি রিয়েল দেখে তার মাথায় হিসাব ঢুকেছে অন্যভাবে।সে ভাবছে, এগুলো নিশ্চয়ই অনেক অনেক টাকা।তিনশো রিয়েল তার চোখে গিয়ে কুটি কুটি টাকা হয়ে গেছে।আমি বললাম, ভাই, ওইগুলো কুটি কুটি টাকা না। ওইগুলো ওমানের টাকা।সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক রহস্য বুঝাচ্ছি।আমি বললাম, তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। মানিব্যাগ ফেরত দিয়েছো, তোমাকে বকশিসও দিয়েছি। এখন আর আমার বাড়িতে আসবে না।সে চলে গেল।কিন্তু কয়েকদিন পর আবার এল।তারপর আবার এল।প্রতিবারই তার একই কথা, স্যার, আপনার মানিব্যাগে কুটি কুটি টাকা ছিল।আমি যতই বোঝাই, সে ততই বিশ্বাস করে যে আমি তাকে ঠকাচ্ছি।শেষ পর্যন্ত একদিন তাকে বললাম, ভাই, তোমার চোখে যে টাকা কুটি কুটি মনে হয়েছে, আমার চোখেও সেটা টাকা। কিন্তু সব টাকার দাম এক না। টাকা দেখলেই কুটি কুটি টাকা হয় না।লোকটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।আমি মনে মনে হাসলাম।একটা ছোট্ট মানিব্যাগ, তিনশো ওমানি রিয়েল, দশ হাজার বাংলাদেশি টাকা আর একজন সরল রিকশাওয়ালার কল্পনা, এই চারটা জিনিস মিলে আমার জীবনের এমন এক অর্থনৈতিক গল্প তৈরি করেছিল, যেটা কোনো ব্যাংকের হিসাবেও পাওয়া যাবে না।আর সেই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ বলে, ভাই, আপনার মানিব্যাগে কত টাকা ছিল, আমি মুচকি হেসে বলি, আমার মানিব্যাগে যত টাকা ছিল, তার চেয়ে বেশি টাকা ছিল একজন রিকশাওয়ালার কল্পনায়।
