Ecommerce/blog/news portal

সরকার বদলেছে, মানুষের ভাগ্য কি বদলেছে?

সরকার বদলেছে, ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, নেতৃত্বের মুখ বদলেছে, এখন বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাজনীতির স্বরূপও কি বদলাবে, নাকি শুধু ক্ষমতার হাতটাই বদলাবে। এই প্রশ্নটা কোনো দলের বিরুদ্ধে না, কোনো দলের পক্ষে না, এই প্রশ্নটা দেশের সাধারণ মানুষের। কারণ মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে নাই, মানুষ অপেক্ষা করছে নিজের জীবনের পরিবর্তনের জন্য। মানুষ চায় বাজারে গেলে নিত্যপণ্যের দাম যেন তার সামর্থ্যের মধ্যে থাকে, একজন বাবা যেন সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থাকে, একজন শিক্ষিত তরুণ যেন চাকরির আশায় বছরের পর বছর ঘুরতে না হয়, একজন ব্যবসায়ী যেন ঘুষ আর হয়রানি ছাড়া নিজের ব্যবসা করতে পারে, একজন কৃষক যেন নিজের ফসলের ন্যায্য দাম পায়, একজন শ্রমিক যেন তার শ্রমের সম্মান পায়, একজন সাধারণ মানুষ যেন থানায় গেলে ভয় না পায়, অফিসে গেলে ঘুষ না দিতে হয়, হাসপাতালে গেলে অসহায় হয়ে ফিরতে না হয়। মানুষ চেয়েছিল এমন একটা রাষ্ট্র, যেখানে দল পরিচয় দিয়ে বিচার হবে না, ক্ষমতার কাছের মানুষ আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা আইন থাকবে না, যেখানে অন্যায় করলে সে যে দলেরই হোক, তাকে জবাব দিতে হবে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মানুষের মনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার জায়গাটা এখনো খুব গভীর। মানুষ জানতে চায়, এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত কান্না, এত স্বপ্নের পরে আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলে হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। শুধু নতুন মন্ত্রী দরকার না, নতুন চিন্তা দরকার। শুধু নতুন সরকার দরকার না, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা দরকার। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে, অনেক স্লোগান শুনেছে, অনেক নির্বাচনী ইশতেহার দেখেছে, কিন্তু এবার মানুষ কথার চেয়ে কাজ দেখতে চায়। মানুষ দেখতে চায়, দুর্নীতি কমেছে কি না, বাজারের আগুন কমেছে কি না, কর্মসংস্থান বেড়েছে কি না, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, ব্যাংকিং খাতের আস্থা ফিরেছে কি না, প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্য সহজ হয়েছে কি না, বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস বেড়েছে কি না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে পারে, রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের ঘরে যদি বাজারের ব্যাগ ছোট হয়ে যায়, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি ভয় বাড়ে, চাকরির দরজা যদি বন্ধ থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল মানুষ নিজের জীবনে অনুভব করতে পারবে না। অর্থনীতির আসল পরীক্ষা কাগজের হিসাব না, মানুষের সংসারের হিসাব। রাজনীতির আসল পরীক্ষা বক্তৃতার মঞ্চ না, মানুষের জীবনের বাস্তবতা। তাই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দেশ চালানো না, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ কাউকে চিরস্থায়ী ক্ষমতা দেয় না, জনগণ দায়িত্ব দেয়, আর সেই দায়িত্বের হিসাব একদিন জনগণের কাছেই দিতে হয়। আজ যারা ক্ষমতার ঘরে বসে আছেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এই চেয়ার কারও বাপ দাদার সম্পত্তি না, এই চেয়ার জনগণের আমানত। জনগণ যদি দেখে তাদের কষ্ট কমেছে, তাদের নিরাপত্তা বেড়েছে, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছে, তাদের কথা রাষ্ট্র শুনছে, তাহলে মানুষ সরকারকে ভালোবাসবে। কিন্তু যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসে, যদি দলীয় পরিচয় আবার যোগ্যতার ওপরে চলে যায়, যদি দুর্নীতি আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, যদি ক্ষমতাবানরা আবার আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তাহলে শুধু সরকারের নাম বদলাবে, মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে পাঁচ বছর পর পর শুধু ক্ষমতার মালিক বদলাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন একই জায়গায় পড়ে থাকবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে সরকার বদলালে মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম হবে, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের জন্য, রাষ্ট্র হবে নাগরিকের জন্য, আইন হবে সবার জন্য সমান, আর ক্ষমতা হবে সেবা করার দায়িত্ব। তাই আজ প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু উত্তরটা অনেক কঠিন, সরকার বদলেছে, এবার কি রাজনীতির স্বরূপ বদলাবে, দেশের মানুষের ভাগ্য কি সত্যিই বদলাবে, মানুষ সরকারের কাছে যে অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সুশাসন আর সম্মান চেয়েছিল, মানুষ কি সেগুলো পাবে। এই প্রশ্নের উত্তর এখন বক্তৃতায় দেওয়া যাবে না, উত্তর দিতে হবে কাজ দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, মানুষ ফলাফল দেখতে চায়। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন তখনই সত্যিকারের পরিবর্তন হবে, যখন সেই পরিবর্তনের আলো গিয়ে পৌঁছাবে গ্রামের কৃষকের ঘরে, শ্রমিকের ঘরে, মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে, বেকার তরুণের চোখে, ছোট ব্যবসায়ীর দোকানে, মায়ের চিন্তায় আর সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্নে। সরকার বদলেছে, এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার, শুধু ক্ষমতার মানুষ বদলায় নাই, বাংলাদেশ বদলানোর রাজনীতিটাও সত্যিই বদলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart