
রংপুরের চার খুন, পুলিশের বয়ানের বাইরে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মিলল না
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের করুণ পরিণতি নয়, এই ঘটনা এখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, আমরা কি সত্যিটা জানতে পারব। চারটি প্রাণ চলে গেছে, একটি পরিবার পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, তারা হত্যার পর বাড়ির ভেতরে গোসল করেছে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খেয়েছে এবং পরে আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করে ঘটনাটিকে অন্য রকম দেখানোর চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার দুই তরুণ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
কিন্তু এখানেই মানুষের প্রশ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং শুরু হচ্ছে। কারণ কোনো মামলায় পুলিশের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটাই শেষ সত্য নয়। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, সময়ের হিসাব, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ময়নাতদন্ত এবং আদালতে যাচাইযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে। আর এই মামলায় ইতোমধ্যেই এমন কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের জানা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে নিহত আগামী চক্রবর্তীর কথিত একটি শেষ মেসেজকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে, ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে আগামী তাঁর পরিচিত একজনকে বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়ে মেসেজ করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। যদি স্ক্রিনশটটি সত্যি হয় এবং সময়ের তথ্যটি প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা যায়, তাহলে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটকে চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। ওই মেসেজ সত্যিই আগামী পাঠিয়েছিলেন কি না, কোন ডিভাইস থেকে পাঠানো হয়েছিল, সার্ভার বা প্ল্যাটফর্মের তথ্য কী বলছে এবং সেই সময় তাঁর ফোনের অবস্থান কোথায় ছিল, এসব ফরেনসিকভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ একটি সত্যিকারের ডিজিটাল প্রমাণ পুরো মামলার সময়ের হিসাবই বদলে দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়িটি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের বক্তব্যেও বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ কখন বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, কে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, মিটার বা বৈদ্যুতিক লাইনে কোনো কারসাজির চিহ্ন ছিল কি না, বিদ্যুৎ বিভাগের রেকর্ড কী বলছে, এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, সেটি হলো গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট। ঘটনাস্থলে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর পরনের শার্টের সঙ্গে সিদ্ধার্থের পরনের শার্টের মিল দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাস দাবি করেছেন, পুলিশ যখন সিদ্ধার্থকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে যায়, তখন তার গায়ে নকশার ওই শার্ট ছিল না, গায়ে ছিল একটি গেঞ্জি। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, শার্টটি আড়ংয়ের এবং একই ধরনের শার্ট অনেক মানুষের কাছেই থাকতে পারে। তাঁর দাবি, সিদ্ধার্থকে যখন হেফাজতে নেওয়া হয় তখনও তার গায়ে ওই শার্ট ছিল।
এখানে কাউকে দোষী বলার মতো কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশ্নটি তদন্ত করে পরিষ্কার করা খুবই সহজ। সিদ্ধার্থকে প্রথম আটক করার সময়ের ভিডিও ফুটেজ কোথায়, কে তাকে প্রথম দেখেছে, তখন তার পরনে কী ছিল, পুলিশের বডি ক্যামেরা বা ঘটনাস্থলের ভিডিওতে কী দেখা যায়, আদালতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তার পোশাক কার হেফাজতে ছিল, এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে শার্ট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। একটি মামলায় এমন ছোট একটি বিষয়ও কখনো কখনো বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন পুলিশের কথিত ইয়াবা সেবনের কাহিনী নিয়ে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে ওই বাড়ির ছাদে গিয়েছিল এবং গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে একে হত্যার শিকার হন। পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে দুই তরুণকে শনাক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু তদন্তের স্বার্থে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, পাশের নির্মাণাধীন ভবনটি যদি ফাঁকা ও নিরিবিলি হয়ে থাকে, তাহলে মাদক সেবনের জন্য দুই তরুণ কেন একটি বসতবাড়ির ছাদ বেছে নেবে। তারা সেখানে কীভাবে প্রবেশ করল, তাদের গতিবিধি কোনো সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে কি না, মোবাইল ফোনের অবস্থান কী বলছে, ঘটনাস্থলে পাওয়া মাদক বা মাদক সেবনের সরঞ্জামে তাদের আঙুলের ছাপ বা ডিএনএ পাওয়া গেছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরই আসল সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
এদিকে গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনদের পক্ষ থেকে বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির একটি ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এই তথ্যও তদন্তের বাইরে রাখা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার করে বলা দরকার, চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল বলেই এই হত্যাকাণ্ড তার কারণে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তদন্তকারীদের উচিত এই সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা, পাশাপাশি ডাকাতি, ব্যক্তিগত বিরোধ, মাদক, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সবগুলো সম্ভাবনা সমান গুরুত্বে যাচাই করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিহত পরিবারটির জন্য সত্যের কোনো বিকল্প নেই। গণপতি চক্রবর্তী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ছোট ছেলেটিও এই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে। একটি পরিবার শেষ হয়ে গেছে। এখন যদি তদন্তে কোনো ভুল হয়, যদি তাড়াহুড়ো করে কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলা হয়, অথবা প্রকৃত অপরাধী কিংবা অপরাধের পেছনের অন্য কোনো কারণ আড়ালে থেকে যায়, তাহলে শুধু একটি মামলার বিচারই ব্যর্থ হবে না, মানুষের রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই অভিযুক্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু জবানবন্দি দিয়েছে মানেই তদন্তের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে, এমনটা বলা যায় না। জবানবন্দির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত, মোবাইল ফোনের তথ্য, ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যের মিল থাকতে হবে। ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে আজকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখন এই তথ্য পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে কীভাবে মিলে যায়, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
এই কারণেই মামলার তদন্তভার ডিবিতে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখন নতুন করে পুরো ঘটনাটি যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কে কখন কোথায় ছিল, বাড়িতে কে ঢুকেছিল, কে বের হয়েছিল, বিদ্যুৎ কখন বন্ধ হয়েছিল, মোবাইল ফোনগুলো কখন সক্রিয় ছিল, কথিত শেষ মেসেজের সত্যতা কী, অভিযুক্তদের পোশাক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার বাস্তবতা কী, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত কার সঙ্গে মেলে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময় কতটা, এবং সবচেয়ে বড় কথা, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে বের করা দরকার।
আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অপরাধী বানাতে চাই না। আমরা পুলিশকে শত্রু মনে করেও কথা বলছি না। বরং আমরা চাই পুলিশ আরও শক্তিশালী তদন্ত করুক, যাতে আদালতে দাঁড় করানোর মতো শক্ত প্রমাণ তৈরি হয়। আমরা চাই নিরপরাধ কেউ যেন অপরাধীর বোঝা না বহন করে, আবার প্রকৃত অপরাধীও যেন কোনো ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে। কারণ ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, সে কারও ধর্ম দেখে না, পরিচয় দেখে না, রাজনৈতিক অবস্থান দেখে না, অর্থ দেখে না। সত্য যার পক্ষে, বিচার তার পক্ষেই দাঁড়ায়।
রংপুরের এই চারটি মৃত্যু আমাদের সামনে তাই শুধু একটি হত্যামামলা রেখে যায়নি, রেখে গেছে রাষ্ট্রের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই সত্য জানতে চাই, নাকি দ্রুত একটি গল্প শুনে সেটাকেই সত্য বলে মেনে নিতে চাই। মানুষ প্রশ্ন করলে তাকে ষড়যন্ত্রকারী বলা যাবে না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো দাবি ছড়িয়ে পড়লেই সেটাকেও সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। তদন্তের কাজ হলো প্রশ্নকে ভয় না পাওয়া, প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
গণপতি চক্রবর্তী, প্রীতিলতা চক্রবর্তী, আগামী চক্রবর্তী এবং ছোট্ট আয়ুশ আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সত্য আমরা জানতে পারি। সেই সত্য যদি পুলিশের বর্তমান বক্তব্যকেই প্রমাণ করে, তাহলে সেটিই প্রকাশ্যে আসুক। আর যদি তদন্তে অন্য কোনো সত্য বেরিয়ে আসে, সেটিও যেন কোনো চাপ ছাড়া সামনে আসে। কারণ চারটি মানুষের মৃত্যুর কাছে আমাদের একটাই দায়, সত্যকে সত্য বলা, মিথ্যাকে মিথ্যা বলা, আর কোনো নিরপরাধ মানুষের জীবন যেন ভুল তদন্তের অন্ধকারে নষ্ট না হয়।