
সম্ভবত তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। বার্ষিক পরীক্ষা মাত্র শেষ হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একটা অদ্ভুত আনন্দ থাকে। মনে হয়, পৃথিবীর সব রাস্তা এখন বেড়ানোর জন্য খোলা। বন্ধুরা কেউ নানার বাড়ি যায়, কেউ মামার বাড়ি যায়, কেউ আবার দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায়।
আমি অবশ্য এসবের কোনোটাই করতে পারতাম না।
আমার নানা বাড়ি ছিল, মামা বাড়িও ছিল। কিন্তু সেই বাড়িগুলোতে আমাদের জন্য খুব একটা জায়গা ছিল না। আমার মা, বাবা, ভাই বোনদেরকে তাঁরা খুব একটা পছন্দ করতেন না।হয়তো গরীব ছিলাম বলে।তাই আমাদের বাড়িতে কখনো তেমন দাওয়াত আসত না। কেউ বলত না, পরীক্ষা শেষ হয়েছে, চলে আয়, কয়েকদিন থাকবি।
ছোটবেলায় এসব নিয়ে আমার মনে কোনো প্রশ্ন জাগত না। শিশুরা অনেক কিছুই বুঝতে পারে না। তারা শুধু দেখে, তারপর মেনে নেয়।
আমি তখনও জানতাম না, কেন আমাকে কেউ ডাকছে না।
কেন অন্য ছেলেরা মামার বাড়ি যায়, আর আমি যাই না।
কেন অন্যদের নানা বাড়ির গল্প আছে, অথচ আমার নেই।
এসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে আমার আরও অনেক বছর লেগেছিল।
সেবার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নানা বাড়ি বা মামা বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হলো না। আমাকে যেতে হলো আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। তাঁরা থাকতেন ঢাকার ফতুল্লা, ওয়াবদা কলোনিতে।
ঢাকা শহর তখন আমার কাছে বিশাল একটা পৃথিবী।
আমি ছোট মানুষ। ঢাকা শহরের কোনো রাস্তা চিনি না, কোনো মোড় চিনি না। কোনদিকে গেলে কোথায় পৌঁছানো যায়, তার কিছুই জানি না।
আমার ভাইয়ের শ্বশুর সরকারি চাকরি করতেন। সম্ভবত ইলেকট্রিক অফিসে। সরকারি চাকরি করার কারণে তাঁরা সরকারি ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন। সেই ফ্ল্যাটেই পরিবারের সবাই থাকতেন।
আমিও গিয়ে উঠলাম সেখানে।
শুরুতে ভালোই লাগছিল। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন শহর।
কিন্তু কয়েকদিন যাওয়ার পর একটা বিষয় ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম।
আমাকে কেউ কোথাও নিয়ে যাচ্ছে না।
ঢাকা শহরটা আমার কাছে অচেনা। অথচ আশেপাশে কত কিছু। রাস্তা আছে, দোকান আছে, গাড়ি আছে, মানুষ আছে, কত রকমের শব্দ আছে। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, এই শহরটা কেমন?
কেউ যদি একদিন বলত, চল, তোকে ঢাকা শহরটা ঘুরিয়ে আনি, তাহলে হয়তো আমার পৃথিবীটাই অন্যরকম হয়ে যেত।
কিন্তু কেউ বলল না।
আমি কাউকে কিছু বলতেও পারতাম না।
ছোট মানুষ ছিলাম। তার ওপর লজ্জা।
কাউকে গিয়ে বলা যায় নাকি, আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যান?
তখন আমার ভাইয়ের শ্বশুর মাঝে মাঝে আমাকে দশ টাকা, বিশ টাকা দিতেন। বাইরে কিছু খাওয়ার জন্য।
আমাদের সংসারে তখন অভাব ছিল। মা বাবা চাইলেও আমাকে হাতে টাকা দিতে পারতেন না। তাই সেই দশ টাকা, বিশ টাকা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার ছিল।
সেই টাকা পেলে আমি মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে ফুচকা খেতাম।
ফুচকা খাওয়ার আনন্দটা তখন অনেক বড় আনন্দ ছিল।
একদিন হঠাৎ আমার মাথায় কী যেন ঢুকল।
ভাবলাম, আমি নিজেই তো বের হতে পারি।
ঢাকা শহরটা একটু দেখে আসি।
কেউ নিয়ে যাবে না তো কী হয়েছে?
আমি একাই যাব।
সেদিন সাহস করে বের হয়ে পড়লাম।
হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্রিজের কাছে গেলাম। ব্রিজের গোড়ায় টেম্পু দাঁড়িয়ে ছিল। টেম্পুগুলো এদিক যায়, ওদিক যায়। চালকেরা চিৎকার করে যাত্রী ডাকছে।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
তারপর হঠাৎ কী মনে করে একটা টেম্পুতে উঠে পড়লাম।
আমার জীবনে সম্ভবত সেটাই ছিল প্রথম কোনো অচেনা গাড়িতে একা ওঠা।
টেম্পু চলতে শুরু করল।
প্রথম কয়েক মিনিট আমার কাছে বেশ রোমাঞ্চকর লাগছিল।
মনে হচ্ছিল, আমি ঢাকা শহর ঘুরছি।
আমি একজন অভিযাত্রী।
একজন ছোট্ট অভিযাত্রী।
কিন্তু সেই রোমাঞ্চ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
টেম্পু যত সামনে যেতে লাগল, আমার বুকের ভেতর তত ধকধক করতে লাগল।
রাস্তা অচেনা।
মানুষ অচেনা।
দোকান অচেনা।
চারপাশের সবকিছু অচেনা।
হঠাৎ আমার মনে হলো, আমি তো জানিই না কোথায় যাচ্ছি।
বাসায় ফিরব কীভাবে?
ঠিক তখনই আমি টেম্পুওয়ালাকে বললাম,
ভাই, আমি নামব।
লোকটা টেম্পু থামাল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে নেমে গেলাম।
তারপর হাঁটা শুরু করলাম।
কোথা দিয়ে এসেছি, ঠিক জানি না।
কোন রাস্তা ধরে ফিরতে হবে, তাও জানি না।
তবু হাঁটতে হাঁটতে কোনোভাবে আবার সেই বাসায় ফিরে এলাম।
সেদিনের সেই ঘটনা আজও আমার মনে আছে।
জীবনে প্রথমবার বুঝেছিলাম, অচেনা পৃথিবী দেখতে যাওয়ার চেয়ে কখনো কখনো নিজের চেনা ছোট্ট ঘরটায় ফিরে আসাটাই বড় আনন্দ।
সেদিনের পর আর কখনো একা বাইরে বের হইনি।
কেউ আমাকে ঘুরাতে নিয়ে যায়নি।
আমিও কাউকে বলিনি।
চুপচাপ ঘরের ভেতরেই থাকতাম।
আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে আমার সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা খুব মনে পড়ে।
ছেলেটা হয়তো খুব বেশি কিছু চাইত না।
সে শুধু চাইত কেউ একজন তার হাত ধরে বলুক, চল, তোকে একটু ঘুরিয়ে আনি।
চল, তোকে ঢাকা শহরটা দেখাই।
চল, তোকে একটা নতুন জায়গা দেখাই।
চল, আজ তোকে ফুচকা খাওয়াই।
কিন্তু জীবনে অনেক সময় সবচেয়ে ছোট চাওয়াগুলোই পূরণ হয় না।
সেদিন টেম্পু থেকে নেমে আমি শুধু বাসায় ফিরে আসিনি।
আমার মনে হয়, সেদিন আমি একটু বড়ও হয়ে গিয়েছিলাম।
আমি শিখে গিয়েছিলাম, সব জায়গায় নিজের জন্য কেউ হাত বাড়িয়ে দেবে না।
কখনো কখনো নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।
আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা শিশুর কাছে দশ টাকা বিশ টাকা যতটা মূল্যবান নয়, তার চেয়েও মূল্যবান হলো একজন বড় মানুষের হাত ধরে বলা, ভয় পেয়ো না, আমি আছি।
আমার ছোটবেলায় সেই কথাটা খুব কমই শুনেছি।
তাই হয়তো আজও ঢাকার সেই ব্রিজ, সেই টেম্পু, সেই অচেনা রাস্তা আর ভয়ে কাঁপতে থাকা ছোট্ট ছেলেটাকে আমি ভুলতে পারিনি।
কিছু স্মৃতি মানুষ ভুলতে পারে না।
কারণ সেগুলো শুধু স্মৃতি নয়।
সেগুলোর ভেতরেই ছোটবেলাটা চুপ করে বসে থাকে