
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এখনই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে বলে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।২০২৬ ২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আয় মাত্র ৩ লাখ কোটি টাকা হবে, এমন দাবি সঠিক নয়। তবে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এর আগে ২০২৫ ২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে নতুন অর্থবছরে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, সেটিই এখন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।নতুন বেতন কাঠামো নিয়েও সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ২০২৬ ২৭ অর্থবছরে এর পুরো অর্থ একসঙ্গে ব্যয় করা হবে না। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা আগে জানা গেলেও বাজেটের বিভিন্ন খাত বিশ্লেষণ করে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্যও সামনে এসেছে।অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের কারণে একবারেই ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে, এমন সরল হিসাব পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং বিষয়টি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত।মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, এলএনজি ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৫ ২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে তেল খাতে প্রায় ১০ হাজার ২৫৮ কোটি, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি এবং সারে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।তবে এই ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা এর আগের বিভিন্ন হিসাবকে ৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি সরকারি ভর্তুকি হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকি দুটি আলাদা বিষয়।বাজেটের ব্যয় কাঠামো নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বেতন ভাতা এবং ঋণের সুদ মিলিয়ে বাজেটের ৮০ শতাংশ ব্যয় হবে, এমন দাবি সঠিক নয়। ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতাও সরকারের পরিচালন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ। কিন্তু এই দুটি খাতকে একত্র করলেও মোট বাজেটের ৮০ শতাংশ হয় না।তবে এর অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। বরং সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। বেতন ভাতা, পেনশন, ঋণের সুদ, ভর্তুকি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে উন্নয়নমূলক খাতে সরকারের অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।বিশ্বব্যাংকও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। সরকার কি নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে অর্জন করতে পারবে। নতুন বেতন কাঠামো ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয়ের চাপ কীভাবে সামলানো হবে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে ভর্তুকি ও আমদানি ব্যয়ের চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।তাই বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া তথ্যভিত্তিক হবে না। তবে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ঋণের সুদ, বেতন ভাতা, ভর্তুকি এবং জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজস্ব আদায় কত হচ্ছে, সরকারের ব্যয় কত বাড়ছে, ঋণের পরিমাণ কতটা বাড়ছে এবং সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই হিসাবগুলো সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর।