বছরের প্রথম বৃষ্টি নামলেই আমার বুকের ভেতর কেমন একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়। সেই দরজার ওপাশে কোনো ঘর নেই, কোনো মানুষ নেই, অথচ সেখানে তার মুখটা আজও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
বৃষ্টি নামলে সবাই জানালা বন্ধ করে। আমি জানালা খুলে বসে থাকি। বৃষ্টির পানি এসে ঘরের মেঝে ভিজিয়ে দেয়, পর্দা ভিজে যায়, বেলকনি ভিজে যায়,বইয়ের পাতা ভিজে যায়। তবু জানালা বন্ধ করতে ইচ্ছে করে না।
কারণ বৃষ্টির শব্দের মধ্যে আমি আজও তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই।
সে বলত, তুমি বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে যাবে।
আমি হেসে বলতাম, তুমি পাশে থাকলে অসুখও ভয় পাবে।
সে তখন মুখ বাঁকিয়ে বলত, তোমার কথার কোনো ঠিক নেই।
সেই মেয়েটা আজ কোথায়, আমি জানি না।
শুধু জানি, পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে হয়তো সে এখনো বেঁচে আছে। হয়তো তার চুলে এখনো বৃষ্টির পানি পড়ে। হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখে। হয়তো কোনো এক মুহূর্তে তারও আমার কথা মনে পড়ে।
আবার হয়তো পড়ে না।
মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট বোধ হয় এখানেই। যে মানুষটাকে আমরা প্রতিদিন মনে করি, সে আমাদের একদিনও মনে করে কি না, তার কোনো উত্তর আমাদের হাতে থাকে না।
আমাদের সম্পর্ক হয়েছিল বিয়ের মাধ্যমে । এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেটা নিয়ে গল্প লেখা যায়। কোনো সিনেমার মতো প্রথম দেখা নয়। কোনো নাটকীয়তা নয়।
প্রথম দিকে তাকে আলাদা করে মনে রাখিনি।
কথা বলতাম, হাসতাম, ঝগড়া করতাম। তার রাগ আমার ভালো লাগত। তার অভিমান আমার কাছে শিশুর মতো মনে হতো। সে যখন চুপ করে থাকত, তখন মনে হতো পৃথিবীর সব শব্দ যেন তার ঠোঁটের কাছে এসে থেমে গেছে।
একদিন সে আমাকে বলেছিল, তুমি কি কখনো আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে।
আমি খুব সহজভাবে বলেছিলাম, পারব।
সে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলেছিল, মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এত নিশ্চিত হয়ে কথা বলে কেন।
আমি তখন তার কথার অর্থ বুঝিনি।
আজ বুঝি।
কিছু মানুষকে হারানোর আগে আমরা জানিই না, তারা আমাদের জীবনে কতটা জায়গা নিয়ে আছে।
সময় গড়িয়ে গেল।
একদিন কোনো এক ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি বড় হয়ে গেল। তারপর কথার সঙ্গে কথা যোগ হলো, অভিমানের সঙ্গে অভিমান। যে মানুষ দুজন একসময় সারাদিন কথা বলেও ক্লান্ত হতো না, তারা একদিন একই ঘরে বসে থেকেও নীরব হয়ে গেল।
আমি ভেবেছিলাম, সময় সব ঠিক করে দেবে।
সে হয়তো ভেবেছিল, আমি একদিন গিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনব।
দুজনেই ভুল ভেবেছিলাম।
কারণ সময় কখনো কখনো মানুষকে কাছে আনে না, বরং দূরত্বকে পাকাপোক্ত করে দেয়।
শেষবার যখন সে আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল, তার চোখে পানি ছিল।
আমি দেখেছিলাম।
তবু কিছু বলিনি।
সে হয়তো চেয়েছিল আমি তাকে থামাই।
আমি থামাইনি।
সে দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকিয়েছিল।
আজও সেই ফিরে তাকানোটা আমার চোখের সামনে ভাসে।
কী আশ্চর্য, মানুষ চলে যাওয়ার সময় দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়, অথচ তার চলে যাওয়ার শব্দ বছরের পর বছর ঘরের ভেতর বাজতে থাকে।
সেদিন যদি আমি তাকে ডাকতাম।
সেদিন যদি বলতাম, থেকো।
সেদিন যদি নিজের অহংকারটুকু পাশে রেখে বলতাম, আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
তাহলে কি সে থেকে যেত।
জানি না।
এই না জানাটাই আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি।
কারণ মানুষ কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও সারাজীবন বেঁচে থাকে।
আমি এখন একা থাকি।
একসময় একা থাকা আমার ভালো লাগত। এখন একা ঘরকে ভয় লাগে।
রাতে ঘুম আসে না। বই খুলে বসি। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ি। তারপর হঠাৎ মনে হয়, এই গল্পটা সে পড়লে কী বলত।
সিনেমা দেখতে বসি। নায়ক যখন নায়িকার হাত ধরে, তখন আমার মনে হয়, তার হাতটা যদি আমার হাতে থাকত।
কোনো সুন্দর গান শুনলে মনে হয়, এই গানটা তাকে শোনানো দরকার ছিল।
কবিতা লিখতে বসলে প্রথমে পৃথিবীর কথা লিখতে চাই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কথাই লিখে ফেলি।
গল্প লিখতে বসলে কোনো চরিত্রকে তার মতো দেখতে হয়ে যায়।
তারপর বিরক্ত হয়ে কাগজ ছিঁড়ে ফেলি।
কারণ তাকে নিয়ে লেখা যায় না।
কিছু মানুষকে নিয়ে লেখা শুরু করলে শব্দগুলো কাঁদতে শুরু করে।
আমি যখন খুব একা থাকি, তখন তার নিষ্পাপ মুখটা পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যে খুঁজে বেড়াই।
রাস্তার পাশে কোনো মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, এই তো সে।
বৃষ্টির মধ্যে কোনো মেয়ে ছাতা ছাড়া হাঁটলে মনে হয়, এই বুঝি সে।
কোনো দোকানে তার মতো হাসি শুনলে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
তারপর বুঝতে পারি, সে নয়।
সে কেউই নয়।
সে শুধু আমার স্মৃতি।
আর স্মৃতির চেয়ে নিষ্ঠুর জিনিস পৃথিবীতে খুব কম আছে।
কারণ মানুষকে হারালে একদিন তাকে কবর দিতে হয়।
কিন্তু স্মৃতিকে কবর দেওয়া যায় না।
স্মৃতি প্রতিদিন দরজা খুলে ঘরে ঢোকে।
কখনো বৃষ্টির শব্দ হয়ে।
কখনো কোনো পুরোনো গানের সুর হয়ে।
কখনো কোনো বইয়ের পাতায়।
কখনো অকারণে আসা এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে।
একদিন গভীর রাতে তার পুরোনো একটা ছবি হাতে নিয়ে বসেছিলাম।
ছবিতে সে হাসছিল।
কী নিষ্পাপ সেই হাসি।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, তুমি জানো, তোমাকে ছাড়া আমি কতটা একা হয়ে গেছি।
ছবিটা কোনো উত্তর দিল না।
আমি আবার বললাম, তুমি কি জানো, তোমাকে হারানোর পর আমি কতবার তোমাকে ফিরে পেয়েছি।
সে নিশ্চুপ।
আমি বললাম, বৃষ্টিতে তোমাকে পেয়েছি। কবিতায় তোমাকে পেয়েছি। সিনেমার দৃশ্যে তোমাকে পেয়েছি। ভিড়ের মধ্যে পেয়েছি। নির্জনতায় পেয়েছি। স্বপ্নে পেয়েছি।
শুধু জেগে থাকা জীবনে তোমাকে পাইনি।
সেদিন প্রথম বুঝলাম, ভালোবাসার মানুষকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়।
তার সঙ্গে হারিয়ে যায় ভবিষ্যতের অনেকগুলো সম্ভাবনা।
একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার সম্ভাবনা।
একসঙ্গে কোনো সিনেমা দেখার সম্ভাবনা।
রাতে ঝগড়া করে সকালে আবার হাসার সম্ভাবনা।
একদিন বৃদ্ধ হয়ে পাশাপাশি বসে থাকার সম্ভাবনা।
মানুষ আসলে শুধু অতীতের জন্য কাঁদে না।
সে কাঁদে সেই ভবিষ্যতের জন্যও, যেটা আর কখনো ঘটবে না।
বছর কেটে গেছে।
আমার চুলে এখন কিছু সাদা রং এসেছে।
মানুষ ভাবে আমি তাকে ভুলে গেছি।
আমি কাউকে কিছু বলি না।
কারণ কিছু সত্যি পৃথিবীর কাছে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না।
আজও বর্ষার প্রথম দিনে আমি জানালা খুলে বসি।
বৃষ্টি নামে।
রাস্তায় পানি জমে।
দূরের গাছগুলো ঝাপসা হয়ে যায়।
আর আমার চোখের সামনে আবার সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে যায়।
তার মুখে সেই পুরোনো হাসি।
সে যেন বলছে, তুমি বৃষ্টিতে ভিজো না, অসুস্থ হয়ে যাবে।
আমি মনে মনে বলি, তুমি পাশে থাকলে অসুখও ভয় পেত।
তারপর নিজের কথাতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।
কারণ এখন পাশে কেউ নেই।
শুধু বৃষ্টি আছে।
শুধু স্মৃতি আছে।
আর আছে একটা মানুষ, যে আজও মনে মনে অপেক্ষা করে।
আমি জানি না সে কোনোদিন ফিরে আসবে কি না।
হয়তো আসবে না।
হয়তো কোনো এক শহরের ব্যস্ত রাস্তায় সে তার নিজের জীবন নিয়ে হাঁটছে। হয়তো তার সংসার হয়েছে। হয়তো তার সন্তান হয়েছে। হয়তো কোনো এক বৃষ্টির রাতে সে জানালার পাশে বসে অন্য কারো কথা ভাবছে।
আমি তার জীবনে কী, তা জানি না।
কিন্তু সে আমার জীবনে কী ছিল, সেটা আমি আজও ভুলতে পারিনি।
কখনো কখনো মনে হয়, মানুষকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাকে কাছে পাওয়া নয়।
কখনো কখনো তাকে হারিয়েও তার জন্য মনের ভেতর একটা জায়গা খালি রেখে দেওয়া।
সেই জায়গায় কেউ আর বসে না।
কেউ বসতে পারে না।
কারণ জায়গাটা তার নামে নয়, তার স্মৃতির নামে।
আজও যখন বৃষ্টি নামে, আমি জানালা খুলে দিই।
যখন একা থাকি, তাকে মনে পড়ে।
যখন সিনেমা দেখি, তাকে মনে পড়ে।
যখন কবিতা লিখি, তার মুখটা ভেসে ওঠে।
যখন গল্প লিখি, কোনো না কোনো চরিত্রের চোখে তাকে খুঁজে পাই।
আর যখন খুব বেশি মনে পড়ে, তখন বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়।
তখন মনে হয়, মানুষ কি সত্যিই কাউকে হারিয়ে বেঁচে থাকে।
নাকি শুধু বেঁচে থাকার অভিনয় করে।
আমি জানি না।
শুধু এটুকু জানি, কোনো কোনো মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের জন্য আমাদের ভেতরে যে দরজাটা খুলে যায়, সেটা আর কোনোদিন বন্ধ হয় না।
সেই দরজা দিয়ে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি ঢোকে।
পুরোনো গান ঢোকে।
কবিতার শব্দ ঢোকে।
আর সবচেয়ে বেশি ঢোকে তার নিষ্পাপ মুখটা।
আমি চোখ বন্ধ করি।
মনে মনে বলি, তুমি ভালো থেকো।
আমাকে মনে রেখো না।
শুধু কোনো এক বর্ষার সন্ধ্যায় যদি হঠাৎ তোমার মনটা অকারণে খারাপ হয়ে যায়, যদি কোনো কারণ ছাড়াই বুকের ভেতরটা একটু ব্যথা করে ওঠে, তাহলে ভেবো, পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন মানুষ আজও তোমাকে মনে করে কাঁদছে।
সে তোমাকে দোষ দেয় না।
তোমার কাছে কিছু চায় না।
শুধু আফসোস করে।
সেদিন তোমাকে কেন থামায়নি।
কেন একবার বলেনি, থেকো।
কেন নিজের অহংকারকে তোমার চেয়ে বড় করে দেখেছিল।
এই আফসোস নিয়েই হয়তো একদিন আমার জীবন শেষ হবে।
আর মৃত্যুর মুহূর্তে যদি মানুষের চোখের সামনে সত্যিই তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মুখটা ভেসে ওঠে, তাহলে আমি জানি, আমার চোখের সামনে অন্য কারো মুখ আসবে না।
আসবে সেই নিষ্পাপ মুখটা।
সেই পুরোনো হাসিটা।
আর মনে হবে, আহা, মানুষ কখনো কখনো কত অল্পের জন্য তার সবচেয়ে আপন মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে।
তারপর খুব আস্তে করে চোখ বন্ধ হয়ে যাবে।
বাইরে তখন হয়তো বৃষ্টি নামবে।
আর আমি শেষবারের মতো মনে মনে বলব,
তুমি ভালো থেকো।
আমি তোমাকে কোনোদিন ভুলিনি।