তখন কলেজে পড়ি। বয়সটা এমন, যখন পকেটে টাকা থাকে না, কিন্তু পৃথিবীটাকে খুব বড় মনে হয়। ছোট্ট একটা ইচ্ছাও তখন অনেক বড় বিলাসিতা।বারোইয়ারহাট বাজার থেকে চট্টোগ্রামের বাসে উঠলাম। গন্তব্য ফেনী। বাস থেকে ট্রাংক রোডে নামলাম। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে গেলাম সিনেমা হলে।ফেনীতে তখন সিনেমা হল ছিল কয়েকটা। সুরত, কানন, বিলাসী। সেদিন গিয়েছিলাম বিলাসীতে।ছবির নামটা আজ আর মনে নেই। ফেরদৌস অভিনয় করেছিল, এটুকু মনে আছে। একটা গান ছিল, আসসালামু আলাইকুম বেয়াইন সাহেব। গানটা তখন বেশ জনপ্রিয়। সিনেমাটাও মনে হয়েছিল সুপার ডুপার বাম্পার ছবি।আসলে সিনেমাটা কেমন ছিল, সেটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই দিনটা।তখন আমাদের কাছে ফেনী শহরটা ছিল বিলাসিতার জায়গা। ঢাকা ছিল অনেক দিল্লীর মতো দূরে । ফেনী যাওয়া মানেই মনে হতো আমরা বুঝি অনেক স্মার্ট হয়ে গেছি।সিনেমা দেখলাম। তারপর সন্ধ্যার দিকে আবার বাসে উঠলাম বাড়ি ফেরার জন্য।যাওয়ার সময় ছাত্র হিসেবে হাফ ভাড়া দিয়েছিলাম। ফেরার সময়ও বাসে উঠে মনে হলো, হাফ ভাড়াই দেব।বারইয়ের হাট নামার সময় পকেটে হাত দিলাম। টাকা খুব বেশি ছিল না। অভাবের সংসারে বড় হওয়া ছেলেরা পকেটে হাত দেওয়ার আগে অনেক হিসাব করে। কত টাকা আছে, কত টাকা লাগবে, বাড়ি পৌঁছাতে কত লাগবে, এসব হিসাব মাথার ভেতর খুব দ্রুত হয়ে যায়।আমি কন্ডাক্টরকে বললাম, আমি ছাত্র। হাফ ভাড়া দেব।লোকটা আমার দিকে তাকালেন।তখন সন্ধ্যা। ছয়টা কি সাতটা হবে। আমি বুঝতে পারছিলাম, এই সময় একজন ছাত্র সিনেমা দেখে বাসে ফিরছে, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত দেখাচ্ছে।কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।আমি বাস থেকে নেমে গেলাম।বাসটা তখন ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। ইঞ্জিনের শব্দ হচ্ছে। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পেছন থেকে লোকটা ডাক দিলেন।ভাই।আমি ফিরে তাকালাম।তিনি বললেন, এসব বাদ দেন।আমি কিছু বুঝলাম না।তিনি আবার বললেন, ভালা হইতে পয়সা লাগে না।বাসটা চলে গেল।আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।সেদিন কথাটা খুব একটা বুঝিনি। শুধু মনে হয়েছিল, লোকটা আমাকে অপমান করলেন না কেন। চাইলে তো বলতে পারতেন, সিনেমা দেখতে গেলে টাকা থাকে, বাসে উঠলে ছাত্র হয়ে যাও।তিনি সেটা বলেননি।তিনি শুধু বলেছিলেন, ভালা হইতে পয়সা লাগে না।অনেক বছর হয়ে গেছে।এখন বুঝি, মানুষের জীবনে কিছু কিছু কথা থাকে, যেগুলোর দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।সেদিন আমার পকেটে টাকা কম ছিল। তাই হয়তো ছাত্র পরিচয় দিয়ে হাফ ভাড়া দিতে চেয়েছিলাম। যুক্তির দিক থেকে দেখলে কাজটা ঠিক ছিল না। কলেজে যাওয়ার সময় আমি ছাত্র, তাই হাফ ভাড়া পাওয়ার অধিকার আমার ছিল। কিন্তু সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার সময়ও একই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।আজ মনে হয়, লোকটা চাইলে আমাকে খুব সহজেই ছোট করে দিতে পারতেন।তিনি করেননি।তিনি আমার অভাবটাকে সবার সামনে প্রকাশ করেননি।বরং এমনভাবে কথাটা বললেন, যেন টাকা নেওয়াটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ না।ভাই, এসব বাদ দেন।ভালা হইতে পয়সা লাগে না।কী অদ্ভুত কথা।আজও কথাটা আমার কানে বাজে।জীবনে অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেক বড় বড় মানুষ দেখেছি। অনেক সুন্দর কথা শুনেছি। কিন্তু সেই বাসের লোকটার ওই ছোট্ট কথাটা আমার মনে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে।কারণ তিনি সেদিন আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেননি।তিনি আমাকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছিলেন।অভাবের সময় মানুষকে টাকা দিলে সে হয়তো বাঁচে একদিন। কিন্তু তার অভাবটাকে সম্মান দিয়ে ঢেকে দিলে, সে মানুষটা আপনাকে মনে রাখে সারাজীবন।সেদিন আমি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।ছবির নাম মনে নেই।নায়ক নায়িকার কথাও মনে নেই।গানটাও আজ পুরোপুরি মনে নেই।শুধু মনে আছে, সন্ধ্যার সেই বাস।মনে আছে, ট্রাঙ্ক রোড ।মনে আছে, পকেটে কম টাকা।আর মনে আছে, একজন অচেনা মানুষ পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলেছিল,ভাই, এসব বাদ দেন, ভালা হইতে পয়সা লাগে না।মানুষ আসলে তার টাকা দিয়ে বড় হয় না।মানুষ বড় হয়, অন্য একজন মানুষের অভাবের সময় তাকে কতটা সম্মান দিতে পারে, সেইখানে।
