Ecommerce/blog/news portal

সেই রাতের সিনেমা

তখন আমি খুব ছোট। প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের গ্রামে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। সন্ধ্যা নামলেই পুরো গ্রামটা কেমন জানি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যেত।

হারিকেন জ্বালানো হতো ঘরে। সেই হারিকেনের হলুদ আলোয় মা রান্না করতেন, আমরা পড়তে বসতাম। পড়ার চেয়ে অবশ্য হারিকেনের কাচের ভেতর আগুনটা দেখতে আমার বেশি ভালো লাগত।

রাতে শীত পড়লে খেতা, কম্বল আর কাঁথা মিলিয়ে শরীর ঢেকে শুয়ে থাকতে হতো। বাইরে তখন অন্ধকার। এত অন্ধকার যে নিজের উঠোনটাকেও অপরিচিত মনে হতো।

দূরে কোথাও শিয়াল ডাকত।

হুঁক্কা হুয়া।

তারপর আরেক জায়গা থেকে উত্তর আসত।

হুঁক্কা হুয়া।

আমরা ছোটরা তখন সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঢুকে যেতাম। বাইরে যাওয়ার সাহস ছিল না। আধুনিকতা বলতে আমাদের গ্রামে তখন বিশেষ কিছু ছিল না। টেলিভিশন ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। বিনোদন বলতে মানুষের সঙ্গে মানুষের গল্প, উঠোনে বসে আড্ডা, কখনো মেলা, কখনো যাত্রা, আর কোনো বাড়িতে অতিথি এলে সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।

তবে পাশের একটা হিন্দু গ্রামে একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল।

টেলিভিশন।

ব্যাটারি দিয়ে চলত সেই টেলিভিশন।

আমাদের কাছে ব্যাপারটা প্রায় জাদুর মতো ছিল।

কেউ একজন খবর নিয়ে আসত, অমুক বাড়িতে টেলিভিশন চলছে।

ব্যস, খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত না।

হিন্দু মুসলমান সবাই ছুটে যেত।

তাদের বাড়ির ঘরের ভেতরে টেলিভিশন চালানো হলে আমরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখতাম। কোনো কোনো দিন তারা উঠোনে টেলিভিশন বসিয়ে দিত। তখন আর জানালার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হতো না। সবাই উঠোনে বসে দেখতাম।

সেই সময় ধর্মের কথা মাথায় আসত না।

কার বাড়ি হিন্দুর, কার বাড়ি মুসলমানের, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা ছিল না।

আমাদের কাছে টেলিভিশন ছিল টেলিভিশন।

আর সিনেমা ছিল সিনেমা।

একদিন খবর এলো, আরেক হিন্দু বাড়িতে ভিসিআর এসেছে।

বাংলা সিনেমা দেখাবে।

ভিসিআর কী জিনিস, সেটা তখন পুরোপুরি বুঝতাম না। শুধু জানতাম, ভিসিআর মানে বড় কিছু। সেখানে সিনেমা দেখা যায়। রুবেলের সিনেমা হতে পারে। আবার আলিফ লায়লাও হতে পারে।

আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা।

আমাকে সিনেমা দেখতে যেতে হবে।

বাবার কাছে গিয়ে বললাম, বাবা, আমি ভিসিআর দেখব। আমাকে দিয়ে আসো।

বাবা প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না।

কারণ রাত হয়ে যাবে।

আমি বায়না ধরলাম।

শেষ পর্যন্ত বাবা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন।

সম্ভবত রাত তখন দশটা।

আমার কাছে দশটা বাজা মানে তখন অনেক রাত।

রাস্তার দুই পাশে অন্ধকার। কোথাও কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই। মাঝে মাঝে বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিলাম।

হিন্দু বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখি উঠোনে মানুষের ভিড়।বাবা আমাকে সে বাড়িতে পৌছিয়ে দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন।

টেলিভিশন বসানো হয়েছে।

চারপাশে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে।

কেউ মাটিতে বসেছে, কেউ গাছের শেকড়ের ওপর বসেছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

আমি একটা গাছের গোড়ার কাছে বসে পড়লাম।

তারপর সিনেমা শুরু হলো।

আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি।

এখন ভাবলে অবাক লাগে, তখন একটা টেলিভিশনের পর্দা আমাদের কাছে কত বড় আনন্দ ছিল।

আজ ঘরে ঘরে টেলিভিশন।

একজন মানুষের হাতে একটা মোবাইল।

সেখানে চাইলে হাজারটা সিনেমা দেখা যায়।

কিন্তু সেই সময় একটা সিনেমা দেখার জন্য আমাদের কত আয়োজন।

কত মানুষের বাড়িতে যাওয়া।

কত দূরের রাস্তা পার হওয়া।

কত রাত জাগা।

কত অপেক্ষা।

সিনেমায় কী দেখেছিলাম, আজ আর মনে নেই।

হয়তো আলিফ লায়লা ছিল।

হয়তো রুবেলের কোনো বাংলা সিনেমা।

নায়ক কে ছিল, খলনায়ক কে ছিল, গল্পটা কী ছিল, কিছুই মনে নেই।

শুধু মনে আছে, আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম।

অনেক রাত পর্যন্ত সিনেমা চলল।

একসময় টেলিভিশন বন্ধ হয়ে গেল।

মানুষজন যে যার বাড়ির দিকে চলে যেতে শুরু করল।

আমি উঠলাম।

তারপর বুঝলাম, আমার সামনে আসল সিনেমা এখন শুরু হবে।

বাড়ি যেতে হবে।

একা।

যে পথে বাবার হাত ধরে এসেছিলাম, সেই পথেই এবার আমাকে একা ফিরতে হবে।

আমার বয়স তখন এত কম যে অন্ধকার রাস্তা দেখলেই বুকের ভেতর কেমন একটা ভয় জমে যেত।

তার ওপর চারদিকে কোনো আলো নেই।

দূরে কোথাও হারিকেনের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।

তারপর সেটাও হারিয়ে গেল।

আমি হাঁটছি।

ছোট ছোট পা।

মনে হচ্ছে, আমার পেছনে কেউ হাঁটছে।

আমি থেমে যাই।

পেছনে তাকাই।

কেউ নেই।

আবার হাঁটি।

আবার মনে হয়, কেউ আছে।

আবার তাকাই।

কেউ নেই।

হঠাৎ দূরে শিয়াল ডাকল।

হুঁক্কা হুয়া।

আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।

তখন আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী কাজটি আমি করছি।

একটা ছোট ছেলে, অন্ধকার গ্রামের রাস্তা দিয়ে একা বাড়ি ফিরছে।

কোনো টর্চ নেই।

কোনো বিদ্যুতের আলো নেই।

কোনো মোবাইল নেই।

কাউকে ফোন করে বলার উপায় নেই, বাবা আমি ভয় পাচ্ছি।

শুধু নিজের দুই পা।

আর বুকের ভেতর একটা ছোট্ট সাহস।

শেষ পর্যন্ত বাড়ি দেখা গেল।

আমাদের ঘরের হারিকেনের আলো দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল।

সেই আলোটা দেখে মনে হলো, পৃথিবীর সব আলো যেন আমাদের বাড়ির ওই ছোট্ট হারিকেনের ভেতর এসে জড়ো হয়েছে।

আমি দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলাম।

বাবা হয়তো তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।

আমি কিছু বললাম না।

চুপচাপ কাঁথার নিচে ঢুকে গেলাম।

কিন্তু ঘুম আসছিল না।

চোখ বন্ধ করলেই সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছিল।

তারপর শিয়ালের ডাক।

হুঁক্কা হুয়া।

হঠাৎ মনে হলো, সিনেমার চেয়েও বড় একটা সিনেমা আমি দেখে ফেলেছি।

সেটা ছিল আমার নিজের গ্রামের রাত।

অনেক বছর পরে বুঝেছি, আমাদের ছোটবেলার দারিদ্র্যটা আসলে শুধু অভাবের গল্প ছিল না।

আমাদের আনন্দও ছিল খুব অল্প জিনিসের মধ্যে।

একটা ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন।

একটা ভিসিআর।

একটা সিনেমা।

একটা হিন্দু বাড়ির উঠোন।

আর সেই উঠোনে হিন্দু মুসলমানের পাশাপাশি বসে থাকা কিছু ছোট ছোট শিশু।

কারও হাতে টাকা ছিল না।

কারও ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না।

কারও কাছে বিনোদনের আলাদা ব্যবস্থা ছিল না।

তবু আনন্দ ছিল।

মানুষের বাড়িতে মানুষ যেত।

একজনের আনন্দ আরেকজন ভাগ করে নিত।

আজ আমাদের ঘরে আলো আছে, টেলিভিশন আছে, মোবাইল আছে, ইন্টারনেট আছে।

বিনোদনের অভাব নেই।

কিন্তু সেই অন্ধকার গ্রামের রাতের মতো আনন্দটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

আর আমার সেই ছোট্ট বয়সের সবচেয়ে বড় সিনেমাটার নাম ছিল, বাড়ি ফেরার পথ।

সিনেমাটা আজ আর মনে নেই।

কিন্তু সেই অন্ধকার রাস্তা, বাবার হাত ধরে হিন্দু বাড়িতে যাওয়া, উঠোনে বসে টেলিভিশন দেখা, শিয়ালের ডাক, আর দূর থেকে দেখা আমাদের ঘরের ছোট্ট হারিকেনের আলো, এগুলো এখনো মনে আছে।

জীবনের কিছু সিনেমা পর্দায় দেখা যায় না।

সেগুলো মানুষ নিজের জীবন দিয়ে দেখে।

তারপর সারাজীবন মনে রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart