মেহেদিনগর গ্রামে তখন আমরা একেবারেই নতুন।
এক দুই বছর হবে, জায়গা কিনে সেখানে নতুন করে বাড়ি করেছি।
চারপাশে তখন এত মানুষ ছিল না।
এখনকার মতো ঘরবাড়ি ছিল না।
বিদ্যুৎও ছিল না।
সন্ধ্যা নামলেই গ্রামটা যেন হঠাৎ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
হারিকেনের হলুদ আলো ছাড়া চারদিকে শুধু অন্ধকার।
আমাদের বাড়ির পাশে ছিল শিয়াল টিলা যা বর্তমানে চেয়ারম্যান পাড়া নামে পরিচিত।
রাতে সেই পাড়া থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসত।
হুক্কা
হুঁয়া।
কখনো একদিক থেকে।
কখনো মনে হতো একেবারে বাড়ির কাছ থেকে ডাকছে।
ছোট ছিলাম বলে এসব শব্দের মানে বুঝতাম না।
শুধু বাবার কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম।
সেই সময় আমাদের বাড়ি থেকে দশ পনেরো বাড়ি পরে একটি বাড়িতে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল।
তাদের ঘর থেকে কিছু একটা চুরি হয়েছে।
কী চুরি হয়েছিল, সেটা আজ আর মনে নেই।
কিন্তু কে চুরি করেছে, সেটা কেউ জানত না।
অনেক খোঁজাখুঁজি হলো।
কাউকে সন্দেহ করা হলো।
কেউ স্বীকার করল না।
শেষ পর্যন্ত পাশের অন্য গ্রাম থেকে দুইজন বৈদ্যকে ডেকে আনা হলো।
তখন গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, বৈদ্যরা শুধু মন্ত্র জানে না, অদৃশ্য জগতের খবরও জানতে পারে।
তারা বাটি চালান দিতে পারে।
আয়না চালান দিতে পারে।
আর সেই চালনের মাধ্যমে নাকি চোরের পরিচয় বের করা যায়।
খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
সন্ধ্যার পর আমরা বাবার হাত ধরে সেই বাড়িতে গেলাম।
বাড়িটা ছিল মাটির।
সামনের ঘরে তখন দশ পনেরো জন মানুষ বসে আছে।
পুরুষ মানুষ।
বয়স্ক মানুষ।
কয়েকজন কিশোর।
আর আমরা কয়েকজন ছোট ছেলে।
সবাই অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ বাইরে থেকে একজনের গলা শোনা গেল।
বৈদ্য এসেছে।
আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
দুজন বৈদ্য ছিল।
একজন ঘরের ভেতরে ঢুকলেন।
আরেকজন বাইরে রইলেন।
ঘরে ঢুকেই প্রথম বৈদ্য চারপাশে তাকালেন।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, হ্যারিকেন নিভিয়ে দিন।
হ্যারিকেন নিভে গেল।
এক মুহূর্তে পুরো ঘরটা অন্ধকার।
এমন অন্ধকার, নিজের হাতের আঙুলও দেখা যায় না।
আমরা সবাই পাশাপাশি বসে আছি।
কেউ কথা বলছে না।
বৈদ্য তখন মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন।
খুব নিচু গলায়।
শব্দগুলো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না।
মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের সঙ্গে তিনি কারও কথা বলছেন।
ঠিক তখন বাইরে থাকা দ্বিতীয় বৈদ্য বাটি চালান শুরু করলেন।
আমরা শুধু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
টক।
টক।
টক।
বাটি যেন মাটির ওপর দিয়ে নিজে নিজে নড়ছে।
আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল, চোখ খোলা যাবে না।
কেউ যদি চোখ খোলে, চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।
তাই সবাই চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম।
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই তো ভয় কমে না।
বরং ভয় আরও বাড়ে।
কারণ তখন শব্দগুলো আরও পরিষ্কার শোনা যায়।
বাইরে শেয়াল ডাকল।
হুক্কা ।
হুঁয়া।
তারপর হঠাৎ সেই ডাকও থেমে গেল।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ।
তারপর দরজার কাছে পায়ের শব্দ।
কেউ যেন ধীরে ধীরে হাঁটছে।
এক পা।
তারপর আরেক পা।
আমি বাবার হাত শক্ত করে ধরে ফেললাম।
বৈদ্য তখনও মন্ত্র পড়ছেন।
হঠাৎ ঘরের ভেতর আরেকটা শব্দ হলো।
একজন মানুষ যেন কাঁদছে।
কিন্তু সেটা পুরুষের কান্না নয়।
একজন মহিলার কান্না।
মৃদু কান্না।
তারপর কান্নাটা ধীরে ধীরে জোরে হতে লাগল।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
বৈদ্য এবার কঠিন গলায় বললেন, কে চুরি করেছে বল।
কান্না থেমে গেল।
কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
আমি করেছি।
ঘরের মধ্যে কেউ নড়ল না।
বৈদ্য আবার বললেন, কে চুরি করেছে বল।
সেই একই কণ্ঠস্বর বলল, আমি করেছি।
তৃতীয়বার প্রশ্ন করা হলো।
আবার উত্তর এল।
আমি করেছি।
আমার তখন মনে হচ্ছিল, আমরা যে ঘরে বসে আছি, সেই ঘরে আমাদের সঙ্গে আর কেউ আছে।
কিন্তু চোখ খুলে দেখার সাহস নেই।
মন্ত্র আরও জোরে পড়া শুরু হলো।
বাইরে বাটি নড়ার শব্দ।
টক।
টক।
টক।
তারপর সবকিছু হঠাৎ থেমে গেল।
নিস্তব্ধতা।
এমন নিস্তব্ধতা, মনে হলো পুরো গ্রামটাই যেন ঘুমিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর বৈদ্য বললেন, হয়ে গেছে।
হ্যারিকেন জ্বালান।
হ্যারিকেন জ্বলে উঠল।
আমরা একসঙ্গে চোখ খুললাম।
সবাই প্রথমে একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম।
কারও মুখে কথা নেই।
বৈদ্য তখন বাড়ির মালিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, যে চুরি করেছে, সে একজন মহিলা।
ঘরের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল।
কিন্তু আসল আশ্চর্য তখনও বাকি।
বৈদ্য হঠাৎ হাসলেন।
বললেন, তোমাদের জন্য একটা জিনিস এনেছি।
তিনি হাত বাড়িয়ে একটা থলে বের করলেন।
তারপর থলের ভেতর থেকে যা বের করলেন, সেটা দেখে আমরা সবাই স্তব্ধ।
আঙুর।
একেবারে টাটকা সবুজ আঙুর।
আঙুরের গায়ে পানি লেগে আছে।
এক ফোঁটা পানি আঙুরের গা বেয়ে নিচে পড়ল।
টপ।
আরেক ফোঁটা।
টপ।
বৈদ্য বললেন, এইমাত্র বাগান থেকে তুলে আনলাম বাটি চালান দিয়ে।
আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম।
তখন আমাদের কাছে কথাটা অসম্ভব মনে হলেও, আমরা তো ছোট।
বৈদ্য যখন বলছেন, নিশ্চয়ই সত্যি।
তিনি সবাইকে আঙুর দিলেন।
আমিও হাতে নিলাম।
আঙুরটা ঠান্ডা।
খুব ঠান্ডা।
মনে হলো যেন এইমাত্র কোনো অন্ধকার জায়গা থেকে তুলে আনা হয়েছে।
আমি একটা আঙুর মুখে দিলাম।
মিষ্টি।
অদ্ভুত মিষ্টি।
সেদিন আমরা ভয় ভুলে গেলাম।
চোর ধরা পড়েছে।
বৈদ্য মন্ত্র পড়ে আঙুরও এনে দিয়েছেন।
আমাদের ছোট্ট মাথায় তখন এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আশ্চর্য।
কিছুক্ষণ পর বৈদ্যদের টাকা দেওয়া হলো।
তারা চলে গেলেন।
আমরাও বাবার সঙ্গে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
চারপাশে আবার সেই অন্ধকার।
দূরে ফাঁকা মাঠ।
কোথাও কোনো আলো নেই।
হঠাৎ সেই ফাঁকা জায়গা থেকে আবার শেয়ালের ডাক ভেসে এল।
হুঁয়া।
আমি বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরলাম।
কিন্তু আমার মাথায় তখন অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরছিল।
বৈদ্য যদি সত্যিই বাগান থেকে আঙুর তুলে এনে থাকে, তাহলে আঙুরের গায়ে এত পানি কেন ছিল।
আর আঙুরটা এত ঠান্ডা কেন ছিল।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সেই অন্ধকার ঘরে যে মহিলার কণ্ঠস্বর বলেছিল, আমি করেছি।
সে আসলে কে ছিল।
আজ এত বছর পরও আমি জানি না।
বাটি চালান সত্যি ছিল, নাকি চোখের সামনে কোনো অভিনয় হয়েছিল।
আয়না চালান সত্যিই কারও মুখ দেখাতে পারত কি না, সেটাও জানি না।
কিন্তু সেই রাতের একটা দৃশ্য এখনও আমার চোখে পরিষ্কার।
হ্যারিকেনের হলুদ আলো।
বৈদ্যের হাতে সবুজ আঙুর।
আঙুরের গা থেকে পানি পড়ছে।
টপ।
টপ।
টপ।
আর সেই অন্ধকার ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা একটা কণ্ঠস্বর।
আমি করেছি।
কখনো কখনো গভীর রাতে সেই ঘটনা মনে পড়লে আমার মনে হয়, সেদিন আমরা আসলে চোরকে দেখিনি।
আমরা শুধু একজনকে বিশ্বাস করেছিলাম।
আর সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রমাণ ছিল কয়েক গোছা ভেজা আঙুর।
যার রহস্য আজও আমার কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।




