Ecommerce/blog/news portal

জিন্নাহ

জিন্নাহর দুটো মৃত্যুই করুণ। প্রথম মৃত্যু ১৯৪৮ সালে, অসুস্থ জিন্নাহকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের পেট্রল ফুরিয়ে যায়, তিনি রাস্তার ধারে পড়ে থাকেন, অথচ আশপাশের মানুষ জানত না, এই অসহায় মানুষটিই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। দ্বিতীয় মৃত্যু ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে, ঢাকসু সংগ্রহশালায় তাঁর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, এবার সবাই চিনেছে তাঁকে, চিনেই নামিয়েছে। এক মৃত্যু ছিল অবহেলার, আরেক মৃত্যু হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে ব্যবহারের।

১৯৪৭ সালে জিন্নাহ বলেছিলেন, ধর্ম রাষ্ট্রের বিষয় নয়, প্রত্যেক মানুষ তার নিজের ধর্ম পালন করবে, মন্দিরে যাবে, মসজিদে যাবে, নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। কিন্তু তার কয়েক মাস পর ঢাকায় এসে তিনি বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এখানেই তৈরি হলো এক গভীর দ্বন্দ্ব, একদিকে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষার অধিকার অস্বীকার করার চেষ্টা। সেই দ্বন্দ্বের রেশ আজও আমাদের সমাজ ও রাজনীতির ভেতরে ঘুরে বেড়ায়।

জিন্নাহ নিজে খুব একটা প্র্যাকটিসিং মুসলিম ছিলেন না, তিনি পারসি নারী রতনবাইকে বিয়ে করেছিলেন। অথচ পরবর্তী সময়ে কেউ তাঁকে ইসলামের প্রতীক বানিয়েছে, কেউ আবার তাঁর ছবি ছিঁড়ে তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে। দুটো আচরণই আসলে ইতিহাসকে বোঝার ব্যর্থতা। একজন ঐতিহাসিক মানুষকে ভালোবাসতে হলে তাঁকে দেবতা বানানোর দরকার নেই, আবার অপছন্দ করলেই তাঁর ছবি ছিঁড়ে ফেলারও দরকার নেই। ইতিহাসের মানুষকে ইতিহাসের জায়গাতেই রাখা উচিত।

জিন্নাহর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই, মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো থেকে যায়। ধর্ম, রাষ্ট্র, ভাষা, নাগরিক অধিকার আর জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাই জিন্নাহকে নিয়ে আবেগ নয়, দরকার ইতিহাসকে পড়া, বোঝা এবং নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করা।

জিন্নাহ দুবার মরলেন। প্রথমবার ১৯৪৮ সালে, অসহায় অবস্থায় একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর। দ্বিতীয়বার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে, একটি সংগ্রহশালার দেয়ালে থাকা ছবির ভেতর। প্রথমবার তাঁকে চিনতে পারেনি মানুষ, দ্বিতীয়বার মানুষ চিনেই তাঁর ছবি নামিয়েছে। ইতিহাসের এই নির্মম পরিহাসের চেয়েও করুণ বিষয় হলো, আমরা এখনো ইতিহাসকে বুঝতে শেখার চেয়ে ইতিহাসকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতেই বেশি আগ্রহী। দ্বিতীয়বার জিন্নাহকে হত্যা করেছে কোনো ব্যক্তি নয়, ইতিহাসকে নিজের মতো করে ব্যবহার করা কায়েমি স্বার্থবাদী মানসিকতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart