বিমানটা তখন মেঘের অনেক ওপরে।নিচে অন্ধকার।শত শত মাইল জুড়ে শুধু রাত।ভেতরে কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ সিনেমা দেখছেন, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন।কেউ জানেন না, কয়েক হাত দূরে একজন মানুষ এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে সবাইকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে।ককপিটের দরজা বন্ধ।দুই পাইলট সামনে।সবকিছু স্বাভাবিক।হঠাৎ…ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা।তারপর ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা।আর সেই মুহূর্তে বিমানের ভেতর কেউ জানে না, আসলে কী ঘটছে।এটা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়।ঘটনাটি ঘটেছিল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে।দুবাই থেকে তেল আবিবের পথে।অভিযোগের তীর উঠেছে ২৯ বছর বয়সী কো-পাইলট হামাম আল-হামামির দিকে।তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিমানটিকে ইসরায়েলের দিকে নিয়ে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতি ঘটাতে চেয়েছিলেন।কিন্তু কেন?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই খুলে যাচ্ছে এক অন্ধকার অতীত।কারণ হামামি নাকি একেবারে অচেনা কোনো নাম ছিলেন না।এর আগেও তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।ওমান এয়ারের সঙ্গে কাজের সময় তার উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।তারপর তার বিমান চালানোর অনুমতিও বাতিল করা হয় বলে রিপোর্টে এসেছে।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়…সেই মানুষটিই পরে কীভাবে আবার একটি যাত্রীবাহী বিমানের ককপিটে পৌঁছে গেলেন?এই প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় রহস্য।সেদিন বিমানে ফিরে আসি।সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।বিমান গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।আর অভিযোগ অনুযায়ী, হামামি অপেক্ষা করছিলেন।সঠিক সময়ের জন্য।সঠিক অবস্থানের জন্য।তারপর হঠাৎ আঘাত।ককপিটে ধস্তাধস্তি।ক্যাপ্টেন আহত।বিমান অস্বাভাবিকভাবে নিচে নামতে শুরু করে।কিন্তু এখানেই গল্পের মোড়।বিমানে থাকা দুজন অফ-ডিউটি পাইলট পরিস্থিতি বুঝতে পারেন।তারা এগিয়ে আসেন।আর যাত্রীরাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন।কয়েকটি ভয়ংকর মুহূর্তের পর হামামিকে আটক করা হয়।বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে।একটি বিমান, শত শত জীবন…সবকিছু মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শেষ হয়ে যেতে পারত।শেষ পর্যন্ত বিমানটি জরুরি অবতরণ করে তাবুকে।মানুষ বেঁচে যায়।ক্যাপ্টেন আহত হন।অভিযুক্ত কো-পাইলট আটক হন।কিন্তু তখনও একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।কেন?কেন একজন পাইলট নিজের বিমানকেই ধ্বংস করতে চাইবেন?কেন এমন একটি বিমান, যার ভেতরে নিরপরাধ মানুষ?কেন তেল আবিব?আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন…যদি তার বিরুদ্ধে আগেই উগ্রপন্থী মতাদর্শের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তাকে আবার ককপিটে পৌঁছাতে দেওয়া হলো কীভাবে?তদন্ত এখন তার অতীত খুঁজছে।পুরোনো চাকরি।পুরোনো যোগাযোগ।অনলাইন কর্মকাণ্ড।রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অবস্থান।সবকিছু।কারণ সন্ত্রাস অনেক সময় বিস্ফোরণের মুহূর্তে শুরু হয় না।তার শুরু হয় অনেক আগে।একটা চিন্তা থেকে।একটা বিশ্বাস থেকে।তারপর ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাস মানুষের ভেতরে এমন একটা দরজা খুলে দেয়, যেটা বাইরে থেকে কেউ দেখতে পায় না।আর সেদিন রাতের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল…বিমানটির যাত্রীরা সেই দরজার অস্তিত্বই জানতেন না।তারা জানতেন না, ককপিটের ভেতরে কী হচ্ছে।জানতেন না, তাদের জীবন কার হাতে।জানতেন না, বিমানটি সত্যিই গন্তব্যে যাচ্ছে, নাকি অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।শুধু আকাশ জানত।আর ককপিটের কয়েকজন মানুষ।শেষ পর্যন্ত বিমানটি মাটিতে নেমেছে।কিন্তু রহস্যটা মাটিতে নামেনি।বরং আরও গভীরে গেছে।কারণ প্রশ্নটা এখন শুধু হামামি কী করতে চেয়েছিলেন, সেটা নয়।প্রশ্নটা হলো…একজন সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী কীভাবে আবার যাত্রীবাহী বিমানের ককপিটে পৌঁছালেন?আর যদি তদন্তে সত্যিই প্রমাণ হয়, সেদিনের ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা ছিল…তাহলে হয়তো আমরা যে বিমানটিকে নিরাপদে মাটিতে ফিরে আসতে দেখেছি,সেটা আসলে শুধু একটি বিমান ছিল না।সেটা ছিল আকাশে ঝুলে থাকা একটি বিপর্যয়, যা শেষ মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল।আর সেই রাতের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে…ককপিটের দরজা সেদিন বন্ধ হয়েছিল।কিন্তু তার আগেই কি অন্য কোনো দরজা খুলে গিয়েছিল?

