Ecommerce/blog/news portal

দুর্ঘটনা

তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমাদের মেহেদিনগার গ্রাম থেকে আজমনগর যেতে হলে বেশ খানিকটা পথ সাইকেল চালিয়ে যেতে হতো। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বইখাতা গুছিয়ে সাইকেল নিয়ে বের হতাম। সকাল সাতটার দিকে রওনা দিলে রাস্তার ওপর তখনও দিনের ভিড় জমত না। চারপাশে একটা শান্ত শান্ত ভাব থাকত। গ্রামের রাস্তা, দুপাশে গাছপালা, কোথাও ধানখেত, কোথাও বাড়িঘর। সেই পথ আমার খুব চেনা ছিল।

আমি অঙ্ক পড়তে যেতাম শিরাজ স্যারের বাড়িতে। স্যার অঙ্ক জানতেন খুব ভালো। অঙ্কের কোনো কঠিন সমাধান দিলে তিনি নিজে ঠিকই করে দিতে পারতেন। কিন্তু অঙ্কটা কীভাবে একজন ছাত্রের মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হয়, সেই বিদ্যাটা বোধহয় তাঁর ছিল না। তিনি সমাধান করে দিতেন, কিন্তু কেন এমন হলো, কীভাবে হলো, সেটা বুঝিয়ে বলতে গেলে আমার মাথার ভেতর আরও অন্ধকার হয়ে যেত।

এই কারণে শিরাজ স্যারের কাছে ছাত্রও ছিল অল্প। গ্রামের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে অঙ্ক পড়ত হারাধন স্যারের কাছে। হারাধন স্যার শুধু অঙ্ক জানতেন না, অঙ্ক বোঝাতেও জানতেন। একটা কঠিন অঙ্ককে এমনভাবে ভেঙে বলতেন যে মনে হতো অঙ্কটা বুঝি খুব সহজ একটা ব্যাপার।

তবু আমি শিরাজ স্যারের কাছেই যেতাম। কেন যেতাম, সেটা তখন বুঝতাম না। হয়তো বাড়ির বড়রা ঠিক করেছিলেন বলেই যেতাম।

সেদিনও ভোরে ঘুম থেকে উঠে সাইকেল নিয়ে বের হলাম। শীতের সকাল ছিল কি না, সেটা এখন আর ঠিক মনে নেই। তবে সকালের বাতাসটা মনে আছে। সাইকেল চালাতে চালাতে মনে হচ্ছিল, আজ অঙ্কের ক্লাসটা কখন শেষ হবে।

শিরাজ স্যারের বাড়িতে পৌঁছে পড়তে বসেছিলাম। অঙ্কের খাতা সামনে। স্যার বোর্ডে কিংবা খাতায় অঙ্ক করে দিচ্ছেন। আমি তাকিয়ে আছি। অঙ্ক শেষ হচ্ছে, কিন্তু অঙ্ক আমার মাথায় ঢুকছে না।

সাড়ে আটটার দিকে ক্লাস শেষ হলো। বইখাতা গুছিয়ে সাইকেলে উঠলাম। তারপর আবার সেই চেনা পথ ধরে বারইয়ারহাটের দিকে রওনা দিলাম।

বারইয়ারহাটে পৌঁছে আমাদের গ্রামের রোডের দিকে যেতে হলে একটা মোড় নিতে হয়। মোড়টা আমার পরিচিত। কতবার যে ওই মোড় দিয়ে গেছি তার হিসাব নেই।

সেদিনও সাইকেল চালিয়ে মোড়ের দিকে আসছি। আমার সামনে রাস্তা ফাঁকা। আমি পেছনে তাকাইনি। পেছনে যে একটা রিকশা আসছিল, সেটা আমি জানতাম না।

মোড় ঘোরার সময় হঠাৎ একটা শব্দ হলো।

মোড ঘোরার সময় সাইকেলের পেছনের চাকার সাথে রিক্সার সামনের চাকা লেগে হটাৎ করে রিক্সা টা উল্টে যায়।

সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। রিকশার ভেতরে একজন যাত্রী ছিলেন। তিনি ধাক্কায় ছিটকে উঠে গেলেন। আমি সাইকেল থামিয়ে পেছনে তাকালাম।

দেখলাম রিকশা উল্টে পড়ে আছে।

একজন মানুষ উঠে বসার চেষ্টা করছেন।

সেই মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

আমি তখন ছোট। ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে। দুর্ঘটনা হলে কী করতে হয়, কাউকে কীভাবে সাহায্য করতে হয়, এসব কিছুই আমার জানা ছিল না। শুধু মনে হলো, আমি যদি এখানে দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে অনেক ঝামেলা হবে।

তাই আমি আর দাঁড়ালাম না।

পেছনে আরেকবার তাকালাম কি না, সেটাও আজ মনে নেই। শুধু মনে আছে, আমি সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিতে শুরু করেছিলাম।

বাড়ির দিকে যাচ্ছি।

সাইকেল যত দ্রুত চলে, আমার বুকের ভেতরটাও তত দ্রুত কাঁপতে থাকে।

মনে হচ্ছিল, রিকশার মানুষটা ঠিক আছেন তো।

আবার মনে হচ্ছিল, আমার জন্যই তো এমন হলো।

আবার মনে হচ্ছিল, আমি তো ইচ্ছা করে করিনি।

কিন্তু এসব কথা তখন কাউকে বলিনি।

বাড়িতে এসে চুপচাপ সাইকেল রেখে দিলাম। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল কি না, মনে নেই। আমিও কিছু বললাম না।

শুধু সেদিনের সেই উল্টে যাওয়া রিকশাটা আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল।

তারপর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, শিরাজ স্যারের বাড়িতে আমার আর অঙ্ক পড়া হলো না।

কোনো ঘোষণা ছিল না। কাউকে কিছু বলেও বন্ধ করিনি। একদিন গেলাম না, তারপর আরেকদিন গেলাম না। তারপর ধীরে ধীরে সেই যাওয়াটাই বন্ধ হয়ে গেল।

সাইকেল নিয়ে আর আজামনগরের দিকে যাইনি।

একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা আমার কাছে যেন একটা বড় রাস্তার শেষ হয়ে গেল।

আজ এত বছর পরে ভাবি, ঘটনাটা হয়তো খুব ছোট ছিল। রিকশাওয়ালা হয়তো সেদিন উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। যাত্রী হয়তো সামান্য ব্যথা পেয়েই বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। হয়তো কারও কিছুই হয়নি।

কিন্তু ছোটবেলার মন যুক্তির কথা বোঝে না।

ছোটবেলার মনে একটা উল্টে যাওয়া রিকশা অনেক বড় হয়ে থাকে।

আর একটা মোড় কখনো কখনো শুধু রাস্তার মোড় থাকে না। জীবনেরও একটা মোড় হয়ে যায়।

আজও বারইয়ারহাটের সেই মোড়ের কথা মনে পড়লে আমার মনে হয়, সেদিন শুধু একটা রিকশাই উল্টে পড়েনি।

সেদিন আমার শিরাজ স্যারের বাড়িতে যাওয়ার পথটাও উল্টে গিয়েছিল।

তারপর আর কোনোদিন সেই পথে অঙ্ক পড়তে যাইনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart