কক্সবাজারে গিয়েছিলাম পুরো পরিবার নিয়ে। সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী জেসি, শালি লুবনা, আর আমাদের দুই ছেলে ফারহান ও রোহান। উদ্দেশ্য খুব সোজা, কয়েকটা দিন সমুদ্রের কাছে থাকব, বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরব, আনন্দ করব, আর ব্যস্ত জীবন থেকে একটু ছুটি নেব।কক্সবাজারে পৌঁছে তিন দিনের জন্য একটা ফ্যামিলি রুম নিলাম। ভিআইপি রুম। ভাড়া প্রতিদিন তিন হাজার টাকা। রুমে ঢোকার পর মনে হলো, বেশ ভালোই তো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, রুমটা পাওয়ার পর আমাদের কারও আর রুমে থাকার ইচ্ছা হলো না।বাচ্চাদের চোখ তখন সমুদ্রের দিকে।ওদের মধ্যে এমন একটা উত্তেজনা, মনে হচ্ছিল সমুদ্রটা বুঝি হোটেলের জানালার ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাদের ডাকছে।তাই রুমে ঢুকেই কাপড়চোপড় রেখে সবাই ক্যাজুয়াল জামাকাপড় পরে নিলাম। তারপর খালি পায়ে হাঁটা শুরু করলাম সমুদ্রের দিকে।বড়দের হাঁটায় যতটা আনন্দ ছিল, বাচ্চাদের দৌড়ে ছিল তার চেয়ে বেশি।সমুদ্রের কাছে পৌঁছানোর পর মনে হলো, এতক্ষণ আমরা শুধু হাঁটছিলাম, আসলে আনন্দটা তো এখানেই লুকিয়ে ছিল।ঢেউ এসে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে। ফারহান আর রোহান পানিতে নেমে গেছে। আমরা সবাই মিলে সমুদ্রে গোসল করছি। কখনো ঢেউ আসছে, কখনো ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। একেকটা ঢেউ এসে সবাইকে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা হাসতে হাসতে আবার তার অপেক্ষা করছি।সেদিন মনে হচ্ছিল, বয়স বলে আসলে কিছু নেই।বাচ্চাদের সঙ্গে পানিতে নামলে মানুষ নিজের বয়স ভুলে যায়। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম।কিছুক্ষণ পর কাদা মাখামাখি শুরু হলো। কে কাকে কাদা লাগাবে, সেই প্রতিযোগিতা। জামাকাপড়ের কী অবস্থা হচ্ছে, কে জানে। তখন সেসব নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো খুব দামি হয় অথচ কিনতে টাকা লাগে না।সেদিনের সেই বিকেলটা ছিল তেমনই একটা মুহূর্ত।সমুদ্রের নোনা বাতাস, বাচ্চাদের হাসি, ঢেউয়ের শব্দ, কাদামাখা শরীর আর পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া। মনে হচ্ছিল, ছোটবেলায় ফিরে গেছি।অনেকক্ষণ আনন্দ করার পর সন্ধ্যার দিকে আবার হোটেলে ফিরে এলাম। সবাই যার যার মতো রিল্যাক্স করতে লাগলাম। ক্লান্ত শরীর। কিন্তু মনের মধ্যে তখনও সমুদ্রের ঢেউ।রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম।ভোররাত প্রায় তিনটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি চারপাশ শান্ত। তখন ছেলেদের নিয়ে একটু হাঁটতে বের হলাম।কক্সবাজারের ভোররাতের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। চারপাশ তখন অনেকটা নিস্তব্ধ। হোটেলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি একটা দোকান খোলা। মালাই কোপ্তা পাওয়া যাচ্ছে।তিনটার সময় মালাই কোপ্তা।আমি ভাবলাম, পৃথিবীতে এমন কিছু খাবার আছে যেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময় লাগে না। যখন ইচ্ছা হয় তখনই খাওয়া যায়।ছেলেদের নিয়ে বসে গেলাম। সবাই মিলে মালাই কোপ্তা খেলাম।পরদিন সকালে আরেকটা অভিজ্ঞতা হলো।হোটেলের পাশে একটা ছোট্ট খাবারের দোকান ছিল। দেখতে অনেকটা জুবটি ঘরের মতো। আমরা সবাই মিলে সেখানে নাস্তা করতে গেলাম।পরোটা এলো। সবাই খেতে শুরু করলাম।আমি পরোটা মুখে তুলেছি, এমন সময় খেয়াল করলাম, যিনি পরোটা বানাচ্ছেন তিনি হাঁচি দিচ্ছেন ।একটা পরোটা বানাচ্ছেন, হাঁচি দিচ্ছেন ।আমি খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকালাম।আমার সমস্যা হলো, মানুষ হাঁচি দিয়ে পরোটা বানালে আমার আর পরোটা খেতে ইচ্ছা করে না।একটা পরোটা খাওয়ার পরই আমার রুচি চলে গেল।দোকানের নিচের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল খুবই অপরিচ্ছন্ন। অনেকদিনের জমে থাকা ময়লা আর দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়ানোই কষ্টকর। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে কিছু হোটেল বাইরে থেকে যতই সুন্দর দেখাক, হোটেলের বাইরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়।একজন পর্যটক পরিবার নিয়ে আনন্দ করতে যায়। সমুদ্র দেখে, বাচ্চাদের নিয়ে ঘোরে, টাকা খরচ করে। কিন্তু হোটেল থেকে বের হওয়ার পর যদি নাকে হাত দিয়ে হাঁটতে হয়, তাহলে আনন্দটা অনেকটাই কমে যায়।তবুও কক্সবাজার আমাকে সেদিন আরেকটা সুন্দর অভিজ্ঞতা দিয়েছিল।হোটেলের সামনে দেখি দুইটা গরু ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন হোটেলের সামনে রাখা ময়লার জায়গা থেকে কলার খোসা আর নানা রকম ফেলে দেওয়া খাবার খুঁজে খাচ্ছে।দৃশ্যটা দেখে আমার খুব মায়া হলো।আমি ছেলেদের নিয়ে দুইটা কলা কিনলাম। একটা ছেলের হাতে দিলাম, একটা নিজের হাতে রাখলাম।তারপর আমরা গরু দুটির কাছে গেলাম।আমি একটা কলা গরুটাকে দিলাম।গরুটা কোনো ভদ্রতা না করে কলাটা একেবারে গিলে ফেলল।আমার হাতে থাকা কলাটা দেখে ছেলেটাও গরুটাকে খাওয়াল।সেটাও গিলে ফেলল।ছেলেটা খুশি।আমি খুশি।গরুটাও সম্ভবত খুশি।সেদিন বুঝলাম, আনন্দ সবসময় সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে থাকে না। কখনো আনন্দ থাকে একটা শিশুর হাসিতে, কখনো কাদামাখা বিকেলে, কখনো রাত তিনটার মালাই কোপ্তায়, আবার কখনো একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে নিজের হাতে খাবার খাওয়ানোর মধ্যে।কক্সবাজারের সেই ভ্রমণে আমরা অনেক কিছু দেখেছিলাম।সমুদ্র দেখেছিলাম, ঢেউ দেখেছিলাম, আনন্দ দেখেছিলাম। আবার দেখেছিলাম অপরিচ্ছন্নতা, দুর্গন্ধ আর মানুষের অবহেলাও।কিন্তু সবকিছুর শেষে আমার মনে সবচেয়ে বেশি যে দৃশ্যটা থেকে গেল, সেটা সমুদ্রের নয়।সেটা হলো আমার ছেলে নিজের হাতে একটা কলা একটা গরুকে খাওয়াচ্ছে।সমুদ্রের ঢেউ একদিন থেমে যায়।ভ্রমণও একদিন শেষ হয়ে যায়।হোটেলের রুম ছেড়ে মানুষ বাড়ি ফিরে আসে।কিন্তু কিছু ছোট ছোট মুহূর্ত মানুষের ভেতরে থেকে যায় অনেকদিন।সেদিন কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার সময় আমার মনে হয়েছিল, পরিবার নিয়ে ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য জায়গাটার মধ্যে যতটা না, তার চেয়ে বেশি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মুহূর্তগুলোর মধ্যে।আর সেই মুহূর্তগুলোই একদিন স্মৃতি হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে।তখন সমুদ্র থাকে না, ঢেউ থাকে না, হোটেল থাকে না।থাকে শুধু একটা গল্প।আমাদের কক্সবাজারের গল্প।


