
পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নাই। মানুষ জীবনে যত বড় স্বপ্নই দেখুক, সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে তাকে ঘাম ঝরাইতে হয়, সময় দিতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়, অনেক না পাওয়া মেনে নিতে হয়। তবে আমার কাছে পরিশ্রমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, আপনি যখন নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য, নিজের ভবিষ্যতের জন্য এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির আশায় পরিশ্রম করেন, তখন সেই পরিশ্রম আর শুধু পরিশ্রম থাকে না, সেটা আপনার জীবনের একটা সাধনা হয়ে যায়।
মানুষের প্রশংসার জন্য পরিশ্রম করবেন না। মানুষ আপনাকে আজ বাহবা দেবে, কাল ভুলে যাবে। মানুষের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আপনার পরিশ্রমের ফল আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে।
ভগবদগীতার একটি গভীর শিক্ষা হলো, মানুষের অধিকার তার কর্মে, ফলের ওপর নয়। অর্থাৎ আপনার কাজ হলো নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করা, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। ফল কখন আসবে, কতটা আসবে, সেটা নিয়ে সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকার দরকার নাই।
কুরআনের শিক্ষাতেও মানুষের নিজের চেষ্টা ও কর্মের গুরুত্বের কথা এসেছে। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ তার নিজের প্রচেষ্টারই ফল পায়। তাই শুধু দোয়া করলেই হবে না, শুধু প্রার্থনা করলেই হবে না, নিজের জায়গা থেকে চেষ্টাটাও করতে হবে।
বৌদ্ধধর্মের শিক্ষাতেও অধ্যবসায়, আত্মসংযম এবং সঠিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব রয়েছে। খ্রিস্টীয় শিক্ষাতেও কাজকে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করার কথা বলা হয়েছে। ধর্মের পথ আলাদা হতে পারে, উপাসনার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু সৎভাবে কাজ করা, মানুষের উপকার করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করার শিক্ষা সব মানুষের জন্যই মূল্যবান।
তাই আপনি যখন পরিশ্রম করবেন, কাউকে দেখানোর জন্য করবেন না। মানুষ আপনাকে দেখুক, প্রশংসা করুক, বাহবা দিক, এসবের জন্য পরিশ্রম করবেন না। কারণ মানুষের প্রশংসা আজ আছে, কাল নাই। মানুষের স্মৃতি আজ আপনাকে মনে রাখবে, কাল অন্য কাউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে।
আপনি নিজের পরিবারের জন্য পরিশ্রম করুন। আপনার সন্তান যেন আপনার কষ্ট দেখে শিখতে পারে, জীবনে কিছু পেতে হলে চেষ্টা করতে হয়। আপনি নিজের জন্য পরিশ্রম করুন, যাতে একদিন আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বলতে পারেন, আমি চেষ্টা কম করি নাই। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী লড়াই করেছি। আমি পড়ে গিয়েছি, আবার দাঁড়িয়েছি। আমি হেরেছি, কিন্তু হাল ছাড়ি নাই।
আর যদি আপনি বিশ্বাসী মানুষ হন, তাহলে আপনার পরিশ্রমের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসাটাও রাখুন। তবে ভরসা মানে বসে থাকা নয়। দোয়া করবেন, প্রার্থনা করবেন, তারপর নিজের কাজটাও করবেন। শুধু ভাগ্যের ওপর বসে থেকে সাফল্যের অপেক্ষা করলে জীবন বদলায় না।
মনে রাখবেন, সঠিক পরিশ্রম কখনোই বৃথা যায় না। হয়তো তার ফল সঙ্গে সঙ্গে পাবেন না। আপনি এক বছর পরিশ্রম করবেন, দুই বছর করবেন, তারপরও ফলাফল আপনার প্রত্যাশামতো নাও আসতে পারে। তখন মনে হবে, এত কষ্ট করলাম, এত সময় দিলাম, এত চেষ্টা করলাম, তবুও কেন কিছু হলো না।
সেই সময়টাতেই আসল পরীক্ষা।
যে মানুষ ফল না পেয়েও সঠিক কাজ করে যেতে পারে, যে মানুষ প্রশংসা না পেলেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে, যে মানুষ মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার জন্য পরিশ্রম করতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটাই ভিতর থেকে সবচেয়ে শক্ত মানুষ হয়ে ওঠে।
আর একটা কথা মনে রাখবেন, শুধু অনেক পরিশ্রম করলেই হবে না, সঠিক জায়গায় সঠিক পরিশ্রম করতে হবে। ভুল পথে দৌড়ালে দ্রুত এগিয়ে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। তাই পরিশ্রমের সঙ্গে জ্ঞান দরকার, ধৈর্য দরকার, সততা দরকার, পরিকল্পনা দরকার এবং নিজের ভুল থেকে শেখার মানসিকতা দরকার।
আপনার আজকের ছোট ছোট চেষ্টা হয়তো আজ কারও চোখে পড়ছে না। আপনার রাত জাগা, আপনার চিন্তা, আপনার ব্যর্থতা, আপনার নীরব কান্না, আপনার পরিবারের জন্য করা ত্যাগ, এগুলোর কোনো সাক্ষী হয়তো নাই। কিন্তু আপনি থামবেন না।
কারণ মানুষের চোখে আপনার পরিশ্রমের মূল্য কম হতে পারে, কিন্তু আপনার জীবনে সেই পরিশ্রমের মূল্য একদিন ঠিকই দেখা যাবে।
আপনি যতটা পারেন সৎভাবে কাজ করুন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করুন। কারও ক্ষতি করে নয়, কাউকে ঠকিয়ে নয়, অন্যের অধিকার মেরে নয়। নিজের ঘাম দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার চেষ্টা করুন। কারণ অন্যের চোখে বড় হওয়ার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে বড় হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্য শুধু টাকা, বাড়ি, গাড়ি কিংবা পরিচিতির নাম নয়। সাফল্য হলো, আপনি এমন একজন মানুষ হতে পারলেন কিনা, যার কারণে আপনার পরিবার নিরাপদ বোধ করে, আপনার সন্তান আপনার কাছ থেকে ভালো কিছু শেখে, আপনার প্রতিবেশী আপনার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আপনার নিজের বিবেক আপনাকে কোনো প্রশ্ন না করে।
কয়েকদিন আগে মেকানিক দোকানদার আবদুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই, আপনার মধ্যে একটা জিনিস আমি দেখছি, আপনি অনেক চিন্তা করেন, আপনি অনেক পরিশ্রমী, আর এই পরিশ্রমের কারণেই আজকে আপনি এত দূরে আসছেন।
আবদুল্লাহ ভাইয়ের কথাটা আমার মনে দাগ কেটে গেছে। কারণ জীবনে অনেক সময় আমরা নিজের পরিশ্রমের মূল্য নিজেরাই বুঝতে পারি না, কিন্তু দূর থেকে তাকিয়ে থাকা একজন মানুষ আমাদের সেই পরিশ্রমটা দেখতে পায়।
তাই বলি, পরিশ্রম করতে কখনো ফাঁকি দেবেন না। অলসতাকে নিজের বন্ধু বানাবেন না। মানুষের বাহবার জন্য নয়, নিজের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করুন। সৎ থাকুন, ধৈর্য ধরুন, সঠিক পথে থাকুন, আর নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যান।
কারণ আজ আপনার পরিশ্রম হয়তো নীরব, কিন্তু একদিন সেই পরিশ্রমই আপনার হয়ে কথা বলবে।
–