দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানা ইস্যুতে জনআলোচনা যখন ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য পুনর্গঠন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, জঙ্গিরা বড় সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবহার্য সামগ্রীর আড়ালে বিস্ফোরক বহন বা সংরক্ষণের কৌশল ব্যবহারের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।সম্প্রতি সাভার এলাকায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিটের একটি অভিযানে কথিত জঙ্গি আস্তানা থেকে IED বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা সম্ভাব্য জঙ্গি নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামের উৎস, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্য কোনো নেটওয়ার্কের যোগাযোগ রয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।এর আগে বরিশালের একটি আদালতে বোমা হামলা এবং মেট্রোরেল এলাকায় ছাতা-সদৃশ বিস্ফোরক পাওয়ার ঘটনাও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জঙ্গিরা তাদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীকে বিস্ফোরক বহন বা লুকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারে।ছাতা, রাইস কুকার, টিফিন ক্যারিয়ার ও ফ্লাস্কের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।এ ধরনের কৌশল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও বাড়তি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বড় আকারের সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট ছোট গ্রুপ বা ‘স্কেলেটন গ্রুপ’ হিসেবে জঙ্গিদের ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।এছাড়া অপরিচিত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করা এবং স্থানীয়দের নজর এড়িয়ে চলার কৌশলও তারা অনুসরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।তবে কোনো ব্যক্তি বা ভাড়াটিয়ার অপরিচিত হওয়াকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।সাম্প্রতিক ছোট আকারের হামলা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলো জঙ্গিদের সম্ভাব্য ‘টেস্ট কেস’ কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক ছোট আকারের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি, প্রতিক্রিয়ার গতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা যাচাই করার চেষ্টা করতে পারে।তবে এসব ঘটনাকে একটি সমন্বিত জঙ্গি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের ফলাফল ও প্রমাণ সামনে আসা প্রয়োজন।অন্যদিকে, কোনো কোনো জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অভিযান সত্যিকার অর্থে সঠিক ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা উচিত তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে। একইভাবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করাও উচিত নয়।নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জঙ্গিবাদ মোকাবিলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে যাচাইহীন তথ্য, গুজব কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।জঙ্গি তৎপরতার সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।একই সঙ্গে জঙ্গি অর্থায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, সংগঠনের কাঠামো এবং সম্ভাব্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শনাক্ত করার ওপর নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া উগ্রবাদে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় কোনো নিষিদ্ধ নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সন্দেহজনক বা মালিকবিহীন কোনো বস্তু না ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।রাস্তা, গণপরিবহন, স্টেশন, আদালত বা জনসমাগমস্থলে কোনো অস্বাভাবিক ব্যাগ, বাক্স, ছাতা বা অন্য কোনো বস্তু পড়ে থাকতে দেখা গেলে সেটি স্পর্শ বা সরানোর পরিবর্তে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে।সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সত্যিই কোনো নতুন জঙ্গি তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকিকে অবহেলা না করে আগেভাগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা।তাদের মতে, জঙ্গি নেটওয়ার্ক বড় আকার ধারণ করার আগেই এর অর্থায়ন, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কাঠামো শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।Moktaar L Nn
