
দেশ চালানো কোনো আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি বিশাল দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুধু জনপ্রিয়তা, বক্তৃতার দক্ষতা কিংবা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা।একজন জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারেন এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জনগণ যাকে চাইবে, তাকে নির্বাচিত করবে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর একটি জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা এক বিষয় নয়।একটি দেশ চালাতে হলে জানতে হয় রাজনীতি, বুঝতে হয় অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং নিরাপত্তার জটিল সমীকরণ। জানতে হয় দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাজারব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো। একই সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তনও বুঝতে হয়।কারণ আজকের পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না।তাই একজন নির্বাচিত নেতা সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবেন এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের অন্যতম বড় গুণ হলো তিনি জানবেন, কোন বিষয়ে কার জ্ঞান ও দক্ষতা সবচেয়ে বেশি এবং প্রয়োজনের সময় সেই জ্ঞানকে কীভাবে রাষ্ট্রের কাজে লাগাতে হয়।সেখানেই আসে দক্ষ ও জ্ঞানী উপদেষ্টা, বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয়তা।রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন মানুষদের পাশে থাকা জরুরি, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে শিক্ষিত, অভিজ্ঞ, সৎ, দূরদর্শী এবং বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অর্থনীতির জন্য অর্থনীতিবিদ, পররাষ্ট্রনীতির জন্য কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝেন এমন মানুষ, আইন ও বিচারব্যবস্থার জন্য যোগ্য আইনজ্ঞ, প্রশাসনের জন্য অভিজ্ঞ প্রশাসক, নিরাপত্তার জন্য দক্ষ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ রাষ্ট্রের জটিল সমস্যাগুলোকে যোগ্য মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।কারণ একজন নেতার চারপাশে যদি শুধু তোষামোদকারী মানুষ থাকে, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। কিন্তু যদি তাঁর পাশে এমন মানুষ থাকেন যারা প্রয়োজনের সময় সত্য কথা বলতে পারেন, ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তুলে ধরতে পারেন এবং যুক্তি দিয়ে বিকল্প পথ দেখাতে পারেন তাহলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলোও হবে অধিকতর বাস্তবসম্মত ও টেকসই।গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটে জেতা নয়।গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো জনগণের রায়কে সম্মান করে দক্ষতা, জ্ঞান ও যোগ্যতার সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।তাই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব যার হাতেই আসুক, তাঁর উচিত নিজের চারপাশে যোগ্য মানুষদের জায়গা দেওয়া। রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং তোষামোদের চেয়ে সত্য ও যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।কারণ একটি রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। আর কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে জ্ঞান, জনপ্রিয়তার চেয়ে যোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কের পরিচয়।