Ecommerce/blog/news portal

যোগ্য ব্যক্তি অরাজনৈতিক হলেও শ্রেয়

এতদিনে বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে আমার মনে হয়। দেশের উন্নয়ন, মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কাজ যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই হবে না, প্রয়োজন হবে দেশকে সবার আগে রাখার মানসিকতা।

আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখছি, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মানুষের কাছে যায়, ভোট চায়, নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক সময় জনগণের স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং পরবর্তী নির্বাচনের হিসাবটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। তখন জনগণ হয়ে যায় ভোটের সময়ের মানুষ, আর ক্ষমতা হয়ে যায় রাজনৈতিক শক্তির প্রধান লক্ষ্য।

আমার প্রশ্ন হলো, রাজনীতি কি শুধু ভোট পাওয়ার জন্য। রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। রাজনীতি কি শুধু একজন আরেকজনকে হারানোর জন্য। রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে মানুষের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক শান্তি কেন রাজনৈতিক হিসাবের নিচে চলে যাবে।

আমরা যখন দেখি কোনো বিষয়ে সংসদে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, কোথাও কোনো সিনেমা বা শিল্পকর্ম নিয়ে আপত্তি উঠছে, আবার কোনো রাজনৈতিক নেতা সেই আপত্তিকে সমর্থন করছেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, রাষ্ট্র কি যুক্তি দিয়ে চলবে, নাকি জনমতকে খুশি করার রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে চলবে।

আবার যখন কোনো ব্যক্তি এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন এবং তার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তখন আমাদের আরও একটি বিষয় ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষকে খুশি করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন সবার জন্য সমান রাখা। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে শত্রু বানানো যাবে না। কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে রাষ্ট্রবিরোধী বলা যাবে না। আবার কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক অনুভূতির কথা বলার সুযোগকে ব্যবহার করে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমি এখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছি না। কারণ অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। কারও বক্তব্য, কোনো মিছিল, কোনো সিদ্ধান্ত বা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তথ্য, আইন এবং যুক্তির মাধ্যমে। গুজব, উত্তেজনা কিংবা রাজনৈতিক অপপ্রচার দিয়ে নয়।

আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্ষমতাসীনরা ভাববে, এতে আমার ভোট বাড়বে কি না। নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবা হবে, এতে দেশের মানুষের উপকার হবে কি না।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে আমার আপত্তি রাজনীতি করার জন্য নয়। রাজনীতি প্রয়োজন। গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। সংসদ প্রয়োজন। বিরোধী দল প্রয়োজন। জনগণের ভোট প্রয়োজন। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে যদি ক্ষমতার লোভ যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে রাজনীতি মানুষের সেবা থেকে ধীরে ধীরে ক্ষমতার ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।

তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগ্যতা, সততা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা। কেউ রাজনীতিবিদ হলেই খারাপ, আর কেউ অরাজনৈতিক হলেই ভালো, এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। অরাজনৈতিক মানুষও ভুল করতে পারেন, রাজনৈতিক মানুষও অসাধারণ কাজ করতে পারেন। আসল বিচার হওয়া উচিত মানুষটি কী করছেন, কেন করছেন এবং তার সিদ্ধান্তে জনগণের কতটা উপকার হচ্ছে।

আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে মন্ত্রী হওয়ার জন্য শুধু দলীয় আনুগত্য যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে যোগ্যতা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার জন্য শুধু রাজনৈতিক পরিচয় যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা।

আমি রাজতন্ত্রের পক্ষে অন্ধভাবে কথা বলছি না। কারণ রাজা ভালো হলে রাজতন্ত্র ভালো মনে হতে পারে, কিন্তু রাজা খারাপ হলে জনগণের হাতে তাকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কোথায় থাকবে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ। তাই আমাদের গণতন্ত্র বাতিল করার আগে বরং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার কথা ভাবতে হবে।

আমাদের দরকার এমন গণতন্ত্র, যেখানে ভোট শুধু পাঁচ বছর পর একটি ব্যালট দেওয়ার নাম নয়। জনগণ যেন প্রতিদিন সরকারের কাছে প্রশ্ন করতে পারে। সংসদ যেন সত্যিকারের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। সাংবাদিক যেন প্রশ্ন করতে পারে। শিল্পী যেন সৃজনশীল হতে পারে। নাগরিক যেন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারে। ধর্মীয় মানুষ যেন নিজের ধর্ম পালন করতে পারে। আবার অন্য ধর্মের মানুষও যেন নিরাপদে নিজের বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারে।

বাংলাদেশ কোনো একটি দলের নয়। বাংলাদেশ কোনো একটি ধর্মের নয়। বাংলাদেশ কোনো একজন নেতার নয়। বাংলাদেশ কোনো মন্ত্রীরও নয়। বাংলাদেশ এই দেশের কোটি কোটি মানুষের।

তাই যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, যে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক, যে ব্যক্তি মন্ত্রী হোক, তাকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা জনগণের আমানত। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যে ক্ষমতায় আছে, কাল সে ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে। আজ যে বিরোধী দলে আছে, কাল সে সরকারে যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়, জনগণ থেকে যায়, দেশের ভবিষ্যৎ থেকে যায়।

আমার ভয় রাজনৈতিক দল নিয়ে নয়, আমার ভয় হলো এমন রাজনীতি নিয়ে যেখানে দেশের ভবিষ্যতের চেয়ে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ বড় হয়ে যায়।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে ভোটের হিসাব থাকবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে মানুষ।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে কোনো উগ্র ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপের কারণে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে। আবার এমন বাংলাদেশও চাই না যেখানে সাধারণ মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুভূতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হবে। রাষ্ট্রকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ন্যায়, আইন এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দেশের উন্নয়ন করতে হলে শুধু রাস্তা, সেতু আর ভবন বানালেই উন্নয়ন হবে না। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বেকার যুবকদের কাজ দিতে হবে। শিল্পকারখানা বাড়াতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে। ব্যবসায়ীকে নিরাপত্তা দিতে হবে। শিক্ষাকে আধুনিক করতে হবে। চিকিৎসাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবের বাইরে নিয়ে আসতে হবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এমন নেতৃত্ব দরকার যারা জনগণকে ভোটার হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখবে।

আমি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নই। আমি অন্ধ দলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে। আমি রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নই। আমি সেই রাজনীতির বিরুদ্ধে, যেখানে জনগণের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার স্বার্থ বড় হয়ে যায়।

দেশ চালানোর জন্য রাজনীতি প্রয়োজন, কিন্তু দেশ বাঁচানোর জন্য বিবেক প্রয়োজন। সংসদ প্রয়োজন, কিন্তু সংসদের ভেতরে সত্য বলার সাহসও প্রয়োজন। সরকার প্রয়োজন, কিন্তু সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী নাগরিক সমাজও প্রয়োজন।

তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক মানুষ এবং অরাজনৈতিক মানুষকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং যার মধ্যে যোগ্যতা আছে, তাকে দায়িত্ব দিতে হবে। যে ভালো কাজ করবে, তাকে সমর্থন করতে হবে। যে ভুল করবে, সে যে দলেরই হোক, তার সমালোচনা করতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো দলের নয়। প্রশ্নটা বাংলাদেশ।

ক্ষমতা কার হাতে থাকবে সেটা সময় ঠিক করবে। কিন্তু বাংলাদেশ কেমন থাকবে, সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত ঠিক করবে।

আমরা কি এমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় পাবে, যেখানে মতের পার্থক্য মানেই শত্রুতা, যেখানে ধর্মের নামে বিভাজন, রাজনীতির নামে প্রতিশোধ আর ক্ষমতার নামে জনগণকে ব্যবহার করা হবে।

নাকি আমরা এমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই যেখানে একজন মুসলমান নিরাপদে মসজিদে যাবে, একজন হিন্দু নিরাপদে মন্দিরে যাবে, একজন বৌদ্ধ নিরাপদে তার উপাসনা করবে, একজন খ্রিস্টান নিরাপদে গির্জায় যাবে, একজন ইহুদি বা অন্য কোনো বিশ্বাসের মানুষও সমান মর্যাদায় বাঁচবে। যেখানে অবিশ্বাসী মানুষও নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে। যেখানে একজন শিল্পী নিজের শিল্প সৃষ্টি করতে পারবে, একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে পারবে, একজন নাগরিক সরকারের সমালোচনা করতে পারবে।

আমার কাছে এই বাংলাদেশই উন্নত বাংলাদেশ।

রাজা দরকার কি না, সেই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্রে জনগণ সত্যিকার অর্থে ক্ষমতার মালিক কি না। গণতন্ত্রের নাম থাকলেই গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র তখনই সত্যিকারের গণতন্ত্র হয়, যখন ক্ষমতাবান মানুষও আইনের কাছে জবাবদিহি করে এবং সাধারণ মানুষও ভয় ছাড়া প্রশ্ন করতে পারে।

তাই আসুন, আমরা রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষকে দেখি। দলের আগে দেশকে দেখি। ভোটের আগে ভবিষ্যৎকে দেখি। ক্ষমতার আগে দায়িত্বকে দেখি।

কারণ সরকার পরিবর্তন হলে দেশ বদলায় না, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে গেলে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতি এমন হোক, যেখানে ক্ষমতা হবে দায়িত্ব, ভোট হবে জনগণের অধিকার, সংসদ হবে মানুষের কণ্ঠস্বর, আর রাষ্ট্র হবে সবার।

এই বাংলাদেশই আমাদের দরকার। এই বাংলাদেশই আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যেতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart