সেদিন রাতটা ছিল অস্বাভাবিক অন্ধকার।
মেহেদীনগর গ্রামটা শীতের কুয়াশায় এমনভাবে ঢাকা পড়েছিল, মনে হচ্ছিল, গ্রামের পরিচিত পথঘাটগুলোও যেন নিজেদের চেহারা ভুলে গেছে।
ভোরে ঘুম ভাঙল।
বাইরে তখনো আলো ফোটেনি।
চারদিকে কনকনে ঠান্ডা।
আমি উঠে কালো ফ্যান পরলাম, কালো ব্লেজার গায়ে চাপালাম, পায়ে জুতো দিলাম, মাথায় দিলাম কালো কানটুপি।
তারপর বেরিয়ে পড়লাম মর্নিং ওয়াকে।
মেহেদীনগর আমার নিজের গ্রাম।
দিনের বেলায় এই গ্রামের প্রতিটি রাস্তা আমার চেনা। কোন বাঁকে কোন গাছ, কোন বাড়ির সামনে কোন পুকুর, কোন রাস্তার পাশে কোন বাঁশঝাড়, সবই পরিচিত।
কিন্তু সেই ভোরে গ্রামটাকে চিনতে পারছিলাম না।
কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পরিচিত কোনো গ্রামের ভেতর দিয়ে নয়, অন্য কোনো অচেনা জায়গার ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আমাদের মসজিদের পাশের কবরস্থানে।
সেখানেই আমার বাবা শায়িত আছেন।
কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছি। দেশে ফেরার পর এটাই ছিল প্রথমবার বাবার কবর জিয়ারত করতে আসা।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নীরবে ছিলাম।
চারদিকে তখন শুধু কুয়াশা।
কোনো মানুষের শব্দ নেই।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।
আবার সব চুপ।
আমি বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো, পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
ঘুরে তাকালাম।
কেউ নেই।
শুধু কুয়াশা।
আর সেই কুয়াশার ভেতর কবরগুলোর অস্পষ্ট ছায়া।
আমি ধীরে ধীরে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসছিলাম।
ঠিক তখনই দূর থেকে একজন মানুষকে আসতে দেখলাম।
আমাদের গ্রামেরই পরিচিত মানুষ।
ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন।
কনকনে ঠান্ডায় তিনি কাঁপছিলেন।
হাঁটছিলেন দ্রুত।
কিন্তু আমাকে দেখার পর তার হাঁটা হঠাৎ থেমে গেল।
তিনি স্থির হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমি তখন কবরস্থান থেকে বের হচ্ছি।
মাথায় কালো কানটুপি।
গায়ে কালো ব্লেজার।
কালো প্যান্ট।
পায়ে কালো জুতো।
চারদিকে ঘন কুয়াশা।
আর আমি দাঁড়িয়ে আছি কবরস্থান থেকে বের হয়ে।
লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তিনি ভয় পেয়েছেন।
আমি বললাম,
চাচা, আসসালামু আলাইকুম।
তিনি সালামের জবাব দিলেন না।
বরং এক পা পিছিয়ে গেলেন।
তারপর দ্রুত মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
আমি আবার সালাম দিলাম।
তিনি এবারও ফিরে তাকালেন না।
শুধু দ্রুত পা চালিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর নিজের পোশাকের দিকে তাকালাম।
কালো পোশাক।
কালো টুপি।
কবরস্থান থেকে বের হচ্ছি।
ভোরের আগে।
চারদিকে কুয়াশা।
তার ওপর কয়েকদিন ধরে আমাকে গ্রামের মানুষ দেখেনি।
হঠাৎ অন্ধকারে আমাকে দেখে তিনি হয়তো চিনতেই পারেননি।
তার মনে হয়তো তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল,
এই মানুষটা কে।
মানুষ তো হতে পারে।
আবার নাও হতে পারে।
হয়তো কোনো ডাকাত।
হয়তো কোনো অচেনা লোক।
অথবা কুয়াশার ভেতর কবরস্থান থেকে উঠে আসা কোনো অশরীরী ছায়া।
কিন্তু সত্যিটা ছিল খুব সাধারণ।
আমি ছিলাম তার পরিচিত সেই মানুষটাই।
শুধু কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে ফিরে এসেছি।
আর সেদিন ভোরে কালো পোশাক পরে বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম।
কিন্তু অন্ধকার সব সময় সত্যিটাকে দেখায় না।
অন্ধকার মানুষের চোখের সামনে নিজের একটা গল্প তৈরি করে।
আর সেই গল্পে,
একজন পরিচিত মানুষও কখনো কখনো হয়ে যায় অচেনা।
মেহেদীনগরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে লোকটার কাছে আমি হয়তো মানুষ ছিলাম না।
আমি ছিলাম,
কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসা এক কালো অবয়ব।
আর সেই দৃশ্যের ভয়টা আজও আমার মনে আছে।
কারণ আমি জানতাম আমি কে।
কিন্তু সেই মানুষটা জানত না,
সে কাকে দেখে ভয় পেয়েছিল।
