Ecommerce/blog/news portal

আন্ডা গ্রামের সেই বুনো শুয়োর

শীতকাল ছিল।কোন বছর, সেটা এখন আর মনে নেই। তখন আমি ক্লাস ফাইভ না হয় সিক্সে পড়ি। বয়সটা এমন, রাতে একা বাথরুমে যেতেও বুকের মধ্যে কেমন জানি করত, আবার বন্ধুদের সামনে ভাব নিতাম, আমি কোনো কিছুতেই ভয় পাই না।আমাদের তখন অভাবের সংসার। লুঙ্গি ছিল, হাফ প্যান্ট ছিল, দুটো শার্ট ছিল কি না, সেটাও ঠিক মনে নেই। লুঙ্গিটা কতদিন পর পর ধোয়া হতো, তার হিসাব ছিল না। জামারও একই অবস্থা। কে ধুয়ে দিত, মা না আমি, সেটাও মনে নেই।তবে একটা জিনিস মনে আছে, শীতের ভোরে ঘুম থেকে ওঠা।সেই ভোরগুলো ছিল অন্যরকম।চারপাশ গুডগুডে অন্ধকার। এত কুয়াশা থাকত যে, হাত বাড়ালে নিজের হাতটাও যেন ঠিকমতো দেখা যেত না। দূরের কোনো বাড়ি থেকে মোরগ ডাকত। কোথাও কোনো মানুষ নেই। মাঝে মাঝে কুয়াশার ভেতর দিয়ে কোনো অচেনা শব্দ ভেসে আসত।সেদিনও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম।মসজিদে নামাজ পড়তে যাব।চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠলাম। গায়ে তখন শীতের কাপড় বলতে তেমন কিছুই নেই। ছোট ছোট পা ফেলে মসজিদের দিকে হাঁটছি।রাস্তার দুই পাশে কুয়াশা।মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে পড়ল হিন্দুদের চিতা খোলা (যেখানে লাশ পড়ানো হয় )চিতাখোলা জায়গাটা দিনের বেলায় খুব পরিচিত ছিল। কতবার যে ওই রাস্তা দিয়ে গেছি। কিন্তু সেদিন ভোরে জায়গাটাকে একেবারে অন্যরকম লাগছিল।আমি হাঁটতে হাঁটতে চিতাখোলার কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ কুয়াশার মধ্যে সাদা একটা জিনিস দেখতে পেলাম।রাস্তার পাশে।প্রথমে মনে হলো, কেউ হয়তো সাদা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে।আমি থেমে গেলাম।বুকের ভেতর ধক করে উঠল।সাদা জিনিসটা নড়ছে কি না বুঝতে পারছিলাম না।কুয়াশা একটু নড়ল।সাদা জিনিসটাও যেন নড়ল।আমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলাম।তারপর মনে হলো, না, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তো ভয় আরো বাড়বে।আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করলাম।এক পা।দুই পা।তিন পা।হঠাৎ চিতাখোলার ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।ক্যাঁক।আমি থেমে গেলাম।তারপর আবার।ক্যাঁক ক্যাঁক।এর সঙ্গে কেমন যেন ঘষাঘষির শব্দ।মনে হলো, কেউ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছে।আমার শরীর ঠান্ডার মধ্যে থেকেও ঘেমে গেল।আমি তখনো নিজেকে বোঝাচ্ছি, কিছু না। নিশ্চয়ই কোনো পশু হবে।কিন্তু ছোট মানুষ যখন ভয় পায়, তখন যুক্তি খুব বেশি কাজ করে না।আমি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।মসজিদ আর খুব বেশি দূরে নয়।তবু মনে হচ্ছিল, রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না।এরপর হিন্দুদের বাড়িগুলোর সামনে আসতেই আবার থেমে গেলাম।কারণ রাস্তার একপাশে কালো একটা জিনিস পড়ে আছে।বড়।একেবারে কালো।কুয়াশার মধ্যে জিনিসটা এমনভাবে পড়ে ছিল যে, প্রথম দেখায় মনে হলো, কোনো মানুষ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে।আমার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল।আমি আর দাঁড়ালাম না।দৌড় দিলাম।পেছনে কী আছে, একবারও তাকালাম না।মনে হচ্ছিল, পেছন থেকে কেউ আমাকে ডাকবে।কেউ হয়তো বলবে,এই যে…আমি আরো জোরে দৌড়ালাম।মসজিদে ঢুকে পড়লাম।ভেতরে তখন কয়েকজন মানুষ এসেছে। তাদের দেখে মনে হলো, আমি যেন আবার মানুষের পৃথিবীতে ফিরে এসেছি।নামাজ পড়লাম।কিন্তু নামাজের মধ্যে বারবার সেই কালো জিনিসটার কথা মনে হচ্ছিল।মানুষটা কে ছিল?মরে পড়ে ছিল?নাকি কেউ আমাকে দেখে লুকিয়ে ছিল?নামাজ শেষ হলো।বাইরে বের হওয়ার সময় বুকের ভেতর আবার ভয় ঢুকে গেল।কারণ আমাকে সেই রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে।কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বাইরে এসে দেখি রাস্তা একেবারে ফাঁকা।কুয়াশা আছে।চিতাখোলা আছে।হিন্দুদের বাড়িগুলো আছে।কিন্তু সেই কালো জিনিসটা নেই।একেবারেই নেই।আমি যেখানে দেখেছিলাম, ঠিক সেই জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম।মাটিতে কিছুই নেই।আমি বুঝতেই পারছিলাম না, জিনিসটা গেল কোথায়।সেদিন বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলিনি।কিছুদিন পর শুনলাম, আগের রাতে নাকি একটা বুনো শুয়োর ধরা পড়েছিল।মেরে ফেলার পর সেটাকে ওই রাস্তার পাশে রাখা হয়েছিল।শুনে আমার ভয় কিছুটা কমল।ভাবলাম, তাহলে সাদা জিনিসটা কী ছিল?আর সেই ক্যাঁক ক্যাঁক শব্দ?হয়তো অন্য কোনো শুয়োর ছিল।হয়তো কুয়াশার মধ্যে চোখের ভুল হয়েছিল।অনেক বছর কেটে গেছে।এখন ভাবলে মনে হয়, সেদিন যা দেখেছিলাম, তার সবকিছুরই হয়তো একটা স্বাভাবিক ব্যাখ্যা আছে।হয়তো কালো জিনিসটা সত্যিই বুনো শুয়োর ছিল।হয়তো সাদা জিনিসটাও কুয়াশায় ঢাকা কোনো কাপড় বা গাছের ডাল ছিল।হয়তো সেই শব্দও কোনো পশুর।কিন্তু একটা প্রশ্ন আজও আমার মাথায় আসে।আমি যখন মসজিদে যাওয়ার সময় কালো জিনিসটা দেখেছিলাম, তখন সেটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা জিনিসটা কী ছিল?কারণ বুনো শুয়োরটার কথা পরে শুনেছি।সাদা জিনিসটার কথা কাউকে কোনোদিন বলতে শুনিনি।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো,নামাজ শেষে যখন আমি ফিরে এলাম, কালো জিনিসটা যেখানে ছিল, সেখানে শুধু কুয়াশায় ভেজা ঘাস ছিল।কিছুই ছিল না।কখনো কখনো শীতের খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে এখনো সেই রাস্তার কথা মনে পড়ে।মনে হয়, কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা ছোট ছেলে হাঁটছে।তার গায়ে পুরোনো একটা জামা।পরনে লুঙ্গি।সামনে চিতাখোলা আর কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সাদা কিছু একটা।ছেলেটা থেমে গেছে।সাদা জিনিসটাও যেন থেমে গেছে।তারপর খুব আস্তে একটা শব্দ হচ্ছে।ক্যাঁক…ক্যাঁক…আর ছেলেটা দৌড়াচ্ছে মসজিদের দিকে।কিন্তু আজও সে জানে না,সেদিন সে আসলে কী দেখেছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart