সেদিন ছাদের ওপর আমরা দুজন পাশাপাশি বসেছিলাম। চারপাশে রাত নেমে এসেছিল, অথচ আমাদের ভেতরে তখনও অনেক কথা জেগে ছিল। জীবনের এমন কিছু কথা, যেগুলো মুখে উচ্চারণ করতে গেলেই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।হঠাৎ সে বলল, সে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়।কথাটা শুনে আমার ভেতরে কী হয়েছিল, সেটা তাকে বুঝতে দিইনি। কিছু কষ্ট মানুষ কাউকে দেখাতে পারে না। কিছু ব্যথা নিজের বুকের ভেতরেই চুপচাপ রেখে দিতে হয়। আমি শুধু শান্ত গলায় বললাম, ঠিক আছে, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।সে আমার কথাটা বিশ্বাস করল। আমার আশ্বাসে হয়তো তার বুকের ভেতরের ভয়টা একটু কমে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার চোখের পানি কমল না। বরং কান্না যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার কথা শুনে যদি সে আশ্বস্তই হয়ে থাকে, তাহলে তার কান্না থামছে না কেন।হয়তো মানুষ সবসময় নিজের মনকে নিজের কথায় বোঝাতে পারে না। মুখ বলে চলে যেতে চাই, অথচ হৃদয় তখনও পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো সে সত্যিই চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু চলে যাওয়ার কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসাগুলো একসঙ্গে জেগে উঠেছিল।আমি বারবার তাকে বলছিলাম, ভয় পেয়ো না, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।কথাগুলো বলতে বলতে আমার নিজের বুকের ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল।কারণ আমি জানতাম, কাউকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো তাকে নিজের কাছে আটকে না রাখা। সে যদি আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে ভালো থাকতে চায়, তাহলে তাকে ধরে রাখার অধিকার আমার নেই।কিন্তু এই কথাটা বলা যত সহজ, মেনে নেওয়া তত সহজ নয়।সেদিন ছাদের অন্ধকারে আমি আমার নিজের কষ্টটাকে বুকের ভেতর শক্ত করে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি তোমাকে এক মুহূর্তও আটকে রাখব না।অথচ আমার ভেতরে তখন অন্য একটা মানুষ কাঁদছিল।সে মানুষটা জানত, যাকে এতদিন নিজের জীবনের অংশ ভেবে এসেছে, একদিন হয়তো তাকেই নিজের হাতে অন্য কোথাও রেখে আসতে হবে। তারপর ফিরে আসতে হবে একা। পাশে থাকবে না তার পরিচিত কণ্ঠ, থাকবে না তার অভিমান, থাকবে না হঠাৎ করে তাকিয়ে থাকা দুটি চোখ।থাকবে শুধু স্মৃতি।সেদিন তার কান্নার কারণ আমি বুঝতে পারিনি। আজ মনে হয়, হয়তো সে আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার বেদনায় কাঁদছিল না। হয়তো সে কাঁদছিল এই ভেবে, যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে, সেই মানুষটিই তাকে নিজের হাতে তার পছন্দের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজি হয়ে গেছে।ভালোবাসার মধ্যে এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে।কখনো কখনো ভালোবাসা মানে কাছে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে মুক্ত করে দেওয়া, যাকে নিজের বুকের ভেতর সারাজীবন লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে।সেদিন আমি তাকে শুধু আশ্বস্ত করেছিলাম।বলেছিলাম, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।কিন্তু কথাটার ভেতরে যে কতটা কান্না ছিল, কতটা ভয় ছিল, কতটা হারিয়ে ফেলার বেদনা ছিল, সেটা আমি তাকে বুঝতে দিইনি।কারণ কিছু কষ্ট প্রকাশ করলে মানুষ দুর্বল হয়ে যায়, আর কিছু কষ্ট বুকের ভেতর সযত্নে রেখে দিলে মানুষ সারাজীবন সেই কষ্ট নিয়েই বেঁচে থাকে।সেদিন ছাদের ওপর দুজন মানুষ বসেছিল।একজন চলে যেতে চেয়েছিল।আর একজন তাকে যেতে দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছিল।কিন্তু দুজনের চোখেই ছিল একই বেদনা।একজনের কান্না চোখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, আর অন্যজনের কান্না বুকের ভেতর চেপে রাখা ছিল।হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মম দৃশ্য এটাই, মানুষটি চলে যেতে চায়, আর তুমি তাকে আটকাতে পারো, তবুও আটকাও না।শুধু বলো, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি তোমাকে সেখানে রেখে আসব।তারপর একদিন সত্যিই তাকে রেখে এসে, নিজের কাছে ফিরে আসো।একেবারে একা।
