মাসকটে বাংলাদেশ এম্বাসির সামনে দাঁড়ালে আমার একটা জিনিস খুব ভালো লাগে। সমুদ্রের শব্দ শোনা যায়। আরব সাগর খুব কাছে। দিনের বেলা সমুদ্র দেখা যায়, আর রাতের বেলা সমুদ্র দেখা যায় না, শুধু তার শব্দ শোনা যায়।সমুদ্র দেখা আর সমুদ্রের শব্দ শোনার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। সমুদ্র দেখা যায় চোখ দিয়ে, আর সমুদ্রের শব্দ শোনা যায় মনে।তবে সেদিন রাতে আমরা সমুদ্রের সৌন্দর্য নিয়ে খুব একটা ভাবিনি।আমরা ছিলাম তিনজন।রাতের আহওয়ানা দিয়ে এম্বাসির কাছে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ হতে হতে রাত হয়ে গেল। তারপর এমন একটা সময় হলো, যখন মানুষের সামনে জীবনের সবচেয়ে জরুরি কিছু প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়।আমাদের একজন বন্ধু বলল, ভাই, আমার তো খুব সমস্যা হয়েছে।আমি বললাম, কী সমস্যা।সে বলল, প্রস্রাবের চাপ ।আমি বললাম, ও।সে এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি এই সমস্যার সমাধান না করলে বাংলাদেশ ও ওমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।চারপাশে তাকালাম।এম্বাসি বন্ধ। আশেপাশে কোনো হোটেল নেই। দোকানপাটও বন্ধ। বড় বড় সুন্দর বিল্ডিং আছে, কিন্তু সেগুলো এমন সুন্দর যে সেখানে প্রস্রাব করার কথা চিন্তা করাটাই অন্যায়।বন্ধু বলল, আমি একটু দেখি।সে চলে গেল।কিছুক্ষণ পর ফিরে এল।তার মুখ দেখে মনে হলো সে জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।বলল, ভাই, কোথাও জায়গা নাই।আমি বললাম, কোথাও নাই।সে বলল, কোথাও নাই। চারদিকে শুধু বিল্ডিং। এত সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং, কিন্তু একটা জায়গাও নাই।আমি চুপ করে রইলাম।কারণ আমি জানতাম জায়গা আছে।জায়গাটা একটু অস্বাভাবিক।আমি কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রের দিকে গিয়ে নিজের কাজ সেরে এসেছি।জায়গাটা ছিল সমুদ্রের একেবারে কিনারে। চারপাশ অন্ধকার। মানুষজন নেই। শুধু ঢেউয়ের শব্দ।বন্ধুকে বললাম, আমার সঙ্গে আসেন।সে বলল, কোথায়।বললাম, চলেন।সে আমার পেছনে হাঁটতে লাগল।সমুদ্রের কাছে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।বললাম, এই জায়গাটা দেখেন।সে চারপাশে তাকিয়ে বলল, এখানে তো কিছু নাই।আমি বললাম, সেটাই তো সুবিধা।সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।তারপর সমুদ্রের দিকে তাকাল।সমুদ্র তখন খুব শান্তভাবে ঢেউ ভাঙছে।বন্ধু বলল, ভাই, জায়গাটা আসলেই খারাপ না।আমি বললাম, আমি তো আগেই বলেছি।সে একটু দূরে চলে গেল।আমি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এল।মুখে প্রশান্তির হাসি।বলল, ভাই।আমি বললাম, কী।বলল, আপনার বুদ্ধি আছে।আমি বললাম, এটা নতুন কিছু না।সে বলল, না ভাই, আজকে বুঝলাম।আমি আর কিছু বললাম না।কারণ তখন সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আরও সুন্দর লাগছিল।আমার মনে হলো, মানুষ আসলে বড় অদ্ভুত প্রাণী। সারাদিন বড় বড় বিল্ডিং বানায়, রাস্তা বানায়, অফিস বানায়, হোটেল বানায়। কিন্তু মাঝরাতে নিজের সবচেয়ে সাধারণ প্রয়োজনটুকুর জন্য একটা ছোট জায়গা খুঁজে পায় না।শেষ পর্যন্ত তাকে সমুদ্রের কাছে যেতে হয়।সেদিন রাতে আমরা তিনজন আবার এম্বাসির সামনে এসে দাঁড়ালাম।কেউ কোনো কথা বললাম না।শুধু সমুদ্রের শব্দ শুনলাম।আমাদের মধ্যে একজন হঠাৎ বলল, ভাই, কাল সকালে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে রাতে কোথায় ছিলেন।আমি বললাম, বলবেন সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম।সে বলল, আর যদি জিজ্ঞেস করে সমুদ্র কেমন ছিল।আমি বললাম, বলবেন খুব শান্ত ছিল।সে মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে।আরব সাগর তখনও ঢেউ ভাঙছিল।সে আমাদের কথা শুনছিল কি না, জানি না।তবে আমার মনে হয়, সমুদ্র অনেক কিছুই শোনে।শুধু কাউকে বলে না।
