
বন্ধুরা, আজ তোমাদের সঙ্গে আমার জীবনের এমন একটি গল্প শেয়ার করব, যে গল্পের শেষটা এখনো শেষ হয়নি। কারণ গল্পের মানুষটি আজও জানে না, কেন আমি তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি।
তার নাম জসিম।
জসিম আর আমি শুধু বন্ধু ছিলাম না, আমরা ছিলাম ছোটবেলার দুই ছায়ার মতো। আমাদের বন্ধুত্বের শুরুটা কোনো বড় ঘটনা দিয়ে হয়নি। শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে, গ্রামের মক্তবের মাটির ঘর থেকে।
সকালবেলা দুজন একসঙ্গে মক্তবে যেতাম। হাতে বই, মাথায় হাজারো দুষ্টুমি। পড়াশোনার চেয়ে পথের গল্পই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারপর প্রাইমারি স্কুলে উঠলাম। স্কুলেও আমরা একসঙ্গে যেতাম, একসঙ্গে ফিরতাম। কখনো গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটতাম, কখনো মাঠের পাশে বসে গল্প করতাম, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরতাম।
ছোটবেলায় বন্ধুত্বের কোনো হিসাব থাকে না। কে কত টাকা খরচ করল, কে কার জন্য কী করল, কে কার কাছে কতটুকু ঋণী, এসব কিছুই তখন মাথায় থাকে না। থাকে শুধু একজন মানুষকে নিজের মানুষ মনে করার সরল বিশ্বাস।
জসিম ছিল আমার সেই মানুষগুলোর একজন।
সময় চলে গেল। আমরা বড় হলাম। প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে হাই স্কুলে উঠলাম। তবুও আমাদের বন্ধুত্বের দূরত্ব বাড়ল না। বরং মনে হতো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বটা আরো গভীর হচ্ছে।
স্কুলে যাওয়ার সময় একসঙ্গে যেতাম, ফেরার সময়ও একসঙ্গে ফিরতাম। জীবনের ছোট বড় কত কথা যে আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি, তার হিসাব হয়তো আজ বসে করলেও শেষ হবে না।
তারপর জীবন আমাদের দুজনকে নিয়ে গেল দেশের বাইরে।
দুজনেই বিদেশে এলাম। ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, একই জায়গায় কাজ করার সুযোগও হয়ে গেল। ওমানের আল বুরাইমি মার্কেটের সেই দিনগুলো আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।
সেই সময় জসিম একটি দোকানে চাকরি করত। একদিন সে আমাকে বলল, সে আর ওই দোকানে চাকরি করবে না। দোকানটির মালিক ছিলেন আবু আহাম্মদ। মানুষটি আমাদের গ্রামেরই।
আমি তাকে বললাম, যদি সত্যিই চাকরি করতে না চাস, তাহলে ক্যানসেলে চলে যা। আমি চেষ্টা করে তোকে আবার ভিসায় নিয়ে আসব।
সে চলে গেল।
তারপর শুরু হলো আমার দৌড়ঝাঁপ।
একজন মানুষের জন্য আরেকজন মানুষ কতদূর যেতে পারে, তখন হয়তো আমি নিজেও জানতাম না। কত মানুষের কাছে গিয়েছি, কত দরজায় কড়া নেড়েছি, কত ওমানির বাড়িতে গিয়েছি, কত অনুরোধ করেছি, তার কোনো হিসাব নেই।
শেষ পর্যন্ত নিজের টাকা খরচ করে তার জন্য ভিসার ব্যবস্থা করলাম।
আমি তখন ভাবিনি, এই টাকা ফেরত পাব কি না। কারণ সে আমার বন্ধু। ছোটবেলার বন্ধু। যার সঙ্গে মক্তবের পথ ভাগ করেছি, স্কুলের পথ ভাগ করেছি, বিদেশের পথও ভাগ করেছি।
কিন্তু সব সম্পর্কের মধ্যে এক সময় হিসাব ঢুকে যায়।
ভিসার পুরো টাকা সে আমাকে ফেরত দেয়নি। কিছু টাকা বাকি রেখেছিল। তার ওপর একজনের কাছে প্রায় এক হাজার দিরহামের মতো টাকা আটকে গিয়েছিল, সেই টাকাটাও আমি ফেরত পাইনি।
আমি তাকে বলেছিলাম, তুই তো আমার জন্য নয়, নিজের জন্য ভিসা নিয়েছিস। টাকা তোকে দিতেই হবে।
সে বলেছিল, তুমি ভিসা কিনছো, তোমারে ওই লোক টাকা ফেরত না দিলে সেটা কি আমি দায়ী ?
সেদিন কথাটা আমার মনে লেগেছিল।
তবুও বন্ধুত্বের কাছে আমি হিসাবটা ছোট করে দেখলাম। মনে হলো, টাকা পয়সা তো জীবনে আসবে যাবে। বন্ধুত্বটা থাকুক।
তারপর আমি তাকে আমার নিজের দোকানে কাজ দিলাম।
শুধু চাকরি নয়, আমার নিজের পরিচিতি, আমার নিজের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, আমার নিজের বিশ্বাস, সবকিছুর দরজা তার জন্য খুলে দিলাম।
বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আমার নামে মাল নিত সে। আমার নাম ব্যবহার করে ব্যবসা করত। নিজের ব্যবসা থেকে লাভ করত, আবার আমার দোকানে চাকরি করে বেতনও পেত।
আমি তখন এসবকে সুযোগ দেওয়া মনে করিনি।
আমি মনে করতাম, আমি আমার বন্ধুকে দাঁড় করাচ্ছি।
কারণ মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের জন্য আমরা হিসাব করি না। মনে করি, আজ আমি পাশে দাঁড়ালাম, কাল সে আমার পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে মানুষকে এমন শিক্ষা দেয়, যার জন্য কোনো বই পড়তে হয় না।
একদিন আমার নিজের ভাই রবির সঙ্গে আমার ঝগড়া হলো।
ঝগড়া কখনো শুধু দুইজন মানুষের মধ্যে থাকে না। কখনো সেটা আশেপাশের মানুষগুলোকেও পরীক্ষা নেয়।
আমার ভাই বিভিন্ন মানুষের কাছে গেল। আমার নামে বিচার দিল। বলল, দোকানটি আমার নয়, দোকানটি তার।
বিচার বসল।
আর সেই বিচারে আমি এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়লাম, যা একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।
বারো বছরের প্রতিষ্ঠান।
বারো বছর ধরে গড়ে তোলা সম্পর্ক।
আমার পরিচিত কাস্টমার।
আমার পরিচিত কোম্পানি।
আমার পরিশ্রম।
আমার ঘাম।
আমার জীবনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে আমার হাত থেকে সরে যেতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, দোকানটি আমার ভাই রবিকে দিয়ে দেওয়া হবে।
সেদিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু ভেতর থেকে যেন ভেঙে পড়েছিলাম।
একজন মানুষ যখন নিজের ঘর হারায়, তখন শুধু একটা ঘর হারায় না। সে তার পরিচিত পৃথিবীর একটা অংশ হারায়।
আর আমি সেদিন শুধু দোকান হারাইনি।
আমি কিছু মানুষকে চিনেছিলাম।
সেদিন চারপাশে অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু যাকে আমি নিজের মানুষ মনে করতাম, যাকে এত বছর বন্ধু বলে বুকে রেখেছিলাম, সেই জসিমকে আমি পাশে পেলাম না।
আমি তার কাছে কোনো বড় বক্তৃতা চাইনি।
আমি চাইনি সে আমার হয়ে কারও সঙ্গে যুদ্ধ করুক।
আমি শুধু চেয়েছিলাম, সে পাশে দাঁড়াক।
কখনো কখনো একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে তার সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়। শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে বলা, ভাই, আমি আছি।
এই দুটি শব্দই যথেষ্ট।
কিন্তু সেদিন সেই মানুষটি ছিল না।
সেদিন আমি প্রথম বুঝলাম, বন্ধুত্বের স্মৃতি আর বন্ধুত্বের পরীক্ষা এক জিনিস নয়।
শৈশবে যে মানুষটি তোমার সঙ্গে গ্রামের রাস্তায় হাঁটত, সে বড় হয়ে তোমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাস্তায় তোমার সঙ্গে হাঁটবেই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সেদিন আমার ভেতরে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি জসিমের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম।
সে হয়তো বুঝতেই পারেনি কেন।
সে অনেকবার আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে। আমাদের বাড়িতে গেছে। আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলেছে। আমার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছে। এমনকি পরিবারকে দাওয়াতও দিয়েছে।
কিন্তু আমি আর ফিরে যাইনি।
কারণ আমার কাছে বিষয়টি দোকানের ছিল না।
টাকারও ছিল না।
ভিসার টাকারও ছিল না।
বিষয়টি ছিল বিশ্বাসের।
যে মানুষকে আমি নিজের মানুষ ভেবেছিলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তার অনুপস্থিতিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
জসিম আজও হয়তো ভাবছে, আমি কেন তার সঙ্গে কথা বলি না।
হয়তো সে মনে করে, আমি অহংকারী হয়ে গেছি।
হয়তো মনে করে, কোনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমি রাগ করে আছি।
হয়তো সে জানেই না, মানুষের হৃদয়ে কিছু দরজা আছে, যেগুলো ভাঙলে শব্দ হয় না।
শুধু দরজাটা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
আমার জীবনে জসিমের সঙ্গে কাটানো শৈশবের স্মৃতিগুলো কিন্তু আমি মুছে ফেলিনি।
মক্তবের সেই সকালগুলো আজও মনে আছে।
স্কুলে যাওয়ার সেই পথগুলো আজও মনে আছে।
গ্রামের রাস্তায় হাঁটার সেই দিনগুলো আজও মনে আছে।
বিদেশে আসার সেই সময়টাও মনে আছে।
তার জন্য ভিসা জোগাড় করতে মানুষের দরজায় দরজায় ঘোরার দিনগুলোও মনে আছে।
আমার দোকানে তাকে কাজ দেওয়ার দিনগুলোও মনে আছে।
সবই মনে আছে।
শুধু একটা জিনিস বদলে গেছে।
আগে মনে করতাম, এসব স্মৃতি আমাদের বন্ধুত্বের প্রমাণ।
এখন মনে হয়, এসব স্মৃতি ছিল আমার বিশ্বাসের প্রমাণ।
জসিম হয়তো বেইমান ছিল, হয়তো ছিল না। মানুষকে বিচার করার অধিকার আমি কারও কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাই না। কারণ একটি ঘটনার সব দিক সবসময় একজন মানুষ জানে না।
কিন্তু আমার হৃদয় যেটা অনুভব করেছে, সেটা অস্বীকার করার ক্ষমতাও আমার নেই।
আমার কাছে বন্ধুত্ব মানে শুধু ভালো সময়ে একসঙ্গে হাসা নয়।
বন্ধুত্ব মানে মানুষের খারাপ সময়ে তার পাশে দাঁড়ানো।
বন্ধুত্ব মানে লাভের সময় কাছে আসা নয়, ক্ষতির সময়ও হাত না ছাড়া।
বন্ধুত্ব মানে বন্ধুর ভুল হলে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া, বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানো, আর অন্যায় হলে অন্তত সত্য কথাটা বলা।
জীবনে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি।
টাকা হারিয়েছি।
ব্যবসা হারিয়েছি।
মানুষ হারিয়েছি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা হারিয়েছি, সেটা হলো কিছু মানুষের ওপর আমার সরল বিশ্বাস।
আজ এত বছর পরও যদি জসিম আমাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না কেন?
তাহলে হয়তো আমি তাকে কোনো উত্তর দেব না।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখে বলতে হয় না।
কিছু উত্তর মানুষকে তার নিজের স্মৃতির ভেতর খুঁজে নিতে হয়।
তবুও একটা কথা আমি জসিমের জন্য রেখে দিতে চাই।
ভাই, ছোটবেলার সেই বন্ধুত্বকে আমি কখনো ঘৃণা করিনি।
আমি শুধু সেই দিনের পর থেকে তোমাকে আর আগের মতো বিশ্বাস করতে পারিনি।
মানুষের জীবনে হাজারো পরিচিত মানুষ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু ছোটবেলার বন্ধুদের জায়গাটা আলাদা।
তাই তোমার প্রতি আমার রাগের চেয়ে কষ্টটাই বেশি।
কারণ শত্রুর কাছ থেকে আঘাত পেলে মানুষ প্রস্তুত থাকে।
কিন্তু বন্ধুর নীরবতা যখন আঘাত হয়ে আসে, তখন সেই আঘাতের জন্য মানুষ প্রস্তুত থাকে না।
জীবন আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে।
সবাইকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না।
সবাইকে ক্ষমা করা যায়, কিন্তু সবাইকে আবার আগের জায়গায় বসানো যায় না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে কখনো ভাববে না, সে তোমার জন্য কী করেছে।
কারণ সত্যিকারের ভালো কাজের মূল্য মানুষ না দিলেও, সময় একদিন তার হিসাব ঠিকই রেখে দেয়।
আর যেদিন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসবে, সেদিন তুমি বুঝতে পারবে, তোমার চারপাশে অনেক মানুষ থাকা আর সত্যিকারের একজন মানুষ পাশে থাকা, এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
জসিম আমার জীবনের সেই গল্প, যাকে আমি ভুলতে পারিনি।
কিন্তু ভুলে যেতে চাইও না।
কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে সুখের স্মৃতি হয়ে, আর কিছু মানুষ আসে শিক্ষা হয়ে।
জসিম আমার কাছে এখন আর শুধু ছোটবেলার বন্ধু নয়।
সে আমার জীবনের একটি শিক্ষা।
বিশ্বাস করার শিক্ষা।
মানুষ চেনার শিক্ষা।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা, জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনে কে পাশে থাকে, সেটাই আসলে বলে দেয়, কে সত্যিকারের আপন।
Moktaar L Nnoor