
শিক্ষিত জাতি হলেই হয় না, দীক্ষিত জাতিও হতে হয়একজন মানুষ শিক্ষিত হতে পারেন, অনেক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, দেশের উন্নয়ন করতে পারেন, কিন্তু শুধু শিক্ষিত হলেই একজন মানুষ সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন না। শিক্ষার সঙ্গে যদি নৈতিকতা না থাকে, জ্ঞানের সঙ্গে যদি বিবেক না থাকে, ক্ষমতার সঙ্গে যদি আত্মসংযম না থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা অনেক সময় মানুষের চরিত্রকে আলোকিত করার বদলে ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।শিক্ষিত আর দীক্ষিত, এই দুই শব্দের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে। শিক্ষিত মানুষ জানেন কীভাবে একটি কাজ করতে হয়, আর দীক্ষিত মানুষ বোঝেন কোন কাজটি করা উচিত এবং কোন কাজটি করা উচিত নয়। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, দীক্ষা মানুষকে বিবেক দেয়। শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, দীক্ষা মানুষকে মানবিক করে। শিক্ষা মানুষকে ক্ষমতার কাছে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু দীক্ষা শেখায় সেই ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামো তৈরি করা নয়। রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ অন্য মানুষের অধিকারকে সম্মান করবে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করবে না, ভিন্ন মতের মানুষকে শত্রু মনে করবে না এবং আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার না করে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।একটি দেশের পতন শুধু অর্থনীতির পতন দিয়ে শুরু হয় না। একটি দেশের পতন শুরু হয় মানুষের বিবেকের পতন দিয়ে। যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, যখন ন্যায়ের চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে যায়, যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ভিতরে একটি নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।তাই কোনো রাষ্ট্রনায়ক যদি সত্যিই সুদূরদৃষ্টিসম্পন্ন হন, তাহলে তার দায়িত্ব শুধু জনগণকে শিক্ষিত করা নয়, জনগণকে নৈতিকভাবে সচেতন করাও। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা দিয়ে শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা যায়, কিন্তু পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শের মাধ্যমে দীক্ষিত মানুষ তৈরি করতে হয়।আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে বিবেকবান মানুষ তৈরি করার কাজটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করতে পারিনি। ফলে ডিগ্রি বেড়েছে, জ্ঞান বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা সবসময় সেই অনুপাতে বাড়েনি।ক্ষমতায় থাকা মানুষের দায়িত্ব এখানে আরও বেশি। কারণ একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলে তার প্রভাব সীমিত থাকে, কিন্তু একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি ভুল করলে তার প্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, সমাজও ধীরে ধীরে সেই পথ অনুসরণ করে। আবার নেতৃত্ব যদি বিভাজন, প্রতিহিংসা, অহংকার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, সেটিও সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।তাই আমি মনে করি, রাষ্ট্রনায়ককে প্রথমে নিজের ভেতরেই দীক্ষিত হতে হবে। ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, ক্ষমতার ব্যবহারই মানুষকে বড় করে। একজন নেতা কত বছর ক্ষমতায় ছিলেন, কতটি প্রকল্প করেছেন, কত বড় স্থাপনা তৈরি করেছেন, তার পাশাপাশি ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে, তিনি মানুষের চরিত্র কতটা উন্নত করেছিলেন, মানুষের মধ্যে কতটা সহনশীলতা তৈরি করেছিলেন, ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করেছিলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন একটি সমাজ রেখে গেছেন।বাংলাদেশের মানুষকে শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের বিবেকবান, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ, প্রত্যেকেই এই দেশের মানুষ। রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত। যে শিক্ষা মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, যে রাজনীতি মানুষকে ভিন্নমতের মানুষকে অমানুষ ভাবতে শেখায়, যে ক্ষমতা মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেয় না, সেই শিক্ষা এবং সেই ক্ষমতা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।কোনো একজন ব্যক্তির ওপর বাংলাদেশের সব ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ রাষ্ট্রের পতন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আর রাষ্ট্রের উন্নতিও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ, প্রত্যেকেরই এখানে দায়িত্ব আছে।তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা থাকেন, তাদের দায় অবশ্যই বেশি। কারণ তাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তাই তাদের কাছ থেকেই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি।আমাদের এখন এমন বাংলাদেশ দরকার, যেখানে শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, দীক্ষিত মানুষও তৈরি হবে। এমন মানুষ, যে জানে তার অধিকার আছে, আবার অন্য মানুষেরও অধিকার আছে। এমন মানুষ, যে নিজের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু অন্যের ধর্মকে অপমান করে না। এমন মানুষ, যে দেশকে ভালোবাসে, কিন্তু দেশের ভুলকে ভুল বলতেও ভয় পায় না। এমন মানুষ, যে ক্ষমতাকে সম্মান করে, কিন্তু ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না।একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সেতু, পদ্মা, ভবন কিংবা রাস্তাঘাট নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। মানুষ যদি নৈতিক হয়, সৎ হয়, মানবিক হয় এবং বিবেকবান হয়, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।তাই আজ আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন শিক্ষিত মানুষ তৈরি করেছি, শুধু সেটা নয়। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন ভালো মানুষ তৈরি করেছি। কারণ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করতে পারে, কিন্তু দীক্ষাই মানুষকে মানুষ করে।