প্রবাস জীবন মানেই যে শুধু কাজ আর টাকা কামানো, তা কিন্তু না। মাঝে মাঝে প্রবাসী মানুষও একটু আনন্দ করতে চায়, একটু ঘুরতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে বসে হাসতে চায়। কারণ প্রবাসে হাসিটাও অনেক সময় হিসাব করে কিনতে হয়।
অনেক বছর আগের কথা। সোহারের ফেলাজ দৌয়ার এর পাশে একটা হোটেল আছে। হোটেলটার নাম আর মনে নাই। নাম মনে না থাকলেও ঘটনাটা বেশ মনে আছে। হোটেলের বাইরে একটা জায়গা ছিল, যেখানে শুধু তাম্বুলা খেলার আয়োজন হতো। প্রবাসীদের জন্য জায়গাটা ছিল একরকম বিনোদনের মাঠ।
একদিন আমি, রাউজনের মানিক আর আবু তোরাবের রাহাত ভাই মিলে ঠিক করলাম, রাতে তাম্বুলা খেলতে যাব। রাত তখন প্রায় নয়টা। আমরা রওনা দিলাম। দশটার দিকে গিয়ে পৌঁছলাম।
মানিক আর রাহাত ভাইয়ের আবার ফেলাজ দৌয়ারের আশেপাশে আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত ছিল। তারা আমাকে তাম্বুলার মাঠের কাছে নামিয়ে দিয়ে বলল, আপনি খেলেন, আমরা দাওয়াত খেয়ে আবার আইতেছি।
আমি একা বসে গেলাম তাম্বুলা খেলতে। ওদিকে তারা দাওয়াত খেতে গেল। তখন আমার মাথায় একটা মহৎ চিন্তা আসল। যেহেতু বন্ধুরা নাই, তাম্বুলা শুরু হতে একটু সময় আছে, হোটেলটা একটু ঘুরে দেখা যাক।
হোটেলে ঢুকে দেখি, সেখানে তিনটা বার আছে। একটা ইন্ডিয়ান বার, যেখানে নাচ গান হয়। আরবি একটা বার আছে। আরেকটা সম্ভবত তুর্কি বার। তখন মনে হলো, প্রবাস জীবনে তাম্বুলার পাশাপাশি একটু আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিও দেখে আসি।
প্রথমে গেলাম আরবি বারে। সেখানে দেখি একজন ভারতীয় মহিলা বিয়ার সার্ভ করতেছেন। আমি একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে খুব ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, কী দেব?
আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, কিংফিশার আছে?
আমার মুখ থেকে কিংফিশার শব্দটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, মহিলার চোখ দুটো একটু বড় হয়ে গেল।
তিনি বললেন, না স্যার, কিংফিশার আমাদের এখানে নাই। অন্য কোনো ব্র্যান্ড নেবেন?
আমি ভাবলাম, কিংফিশার নাই তো নাই। মন যখন চায় নাই, তখন অন্য কিছু দিয়ে মনকে বুঝিয়ে লাভ কী। তাই কোনো অর্ডার না দিয়েই উঠে পড়লাম।
বের হয়ে দেখি, যে ইন্ডিয়ান বারটা আগে বন্ধ ছিল, সেটা এখন খুলে গেছে। মনে হলো, আল্লাহ যখন একটা দরজা বন্ধ করেন, আরেকটা দরজা খুলে দেন। আমি ইন্ডিয়ান বারের দিকে হাঁটা দিলাম।
ভেতরে ঢুকে বসার আগেই একজন এসে বললেন, স্যার, আপনার জুতা অ্যালাউড না।
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, সত্যিই সেদিন স্নিকার পরে গেছি।
আমি মনে মনে বললাম, প্রবাসে মানুষ হিসেবে আমার যত স্বাধীনতা থাকুক, স্নিকার পরে বারে ঢোকার স্বাধীনতা নাই।
কাজেই সেদিন নাচ গানও দেখা হলো না। কিংফিশারও খাওয়া হলো না। বারেও বসা হলো না।
আমি আবার তাম্বুলার মাঠে ফিরে এলাম।
তখন বুঝলাম, জীবনে সব আনন্দ নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী আসে না। কোনো কোনো আনন্দের জন্য আলাদা পরিকল্পনাও লাগে না।
কিছুক্ষণ পর রাহাত ভাই আর মানিক দাওয়াত খেয়ে ফিরে এল। আবার তিনজন মিলে তাম্বুলায় বসে গেলাম। রাত বাড়তে লাগল। প্রবাসীদের হাসাহাসি, চিৎকার, জেতার আনন্দ আর হারার আফসোসে জায়গাটা জমে উঠল।
শেষ পর্যন্ত আমি আর রাহাত ভাই হারলাম। কিন্তু মানিক একটা খেলায় জিতে গেল।
মানিকের মুখের হাসি দেখে মনে হলো, আজকের রাতের সব খরচ যেন ও একাই উঠিয়ে ফেলেছে।
খেলা শেষ করে আমরা আবার রাতের বেলা বুরেমির দিকে রওনা দিলাম। গাড়ি চলতে চলতে রাত গভীর হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত রাত দুইটার দিকে বুরেমি পৌঁছলাম।
সেদিন বারেও ঢোকা হলো, আবার ঢোকাও হলো না। কিংফিশারও পাওয়া হলো না। নাচও দেখা হলো না। স্নিকারও কোনো কাজে লাগল না।
কিন্তু তাম্বুলা খেলা হলো। বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি হলো। রাত জেগে গল্প হলো। আর একটা ছোট্ট রাত প্রবাস জীবনের অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে গেল।
প্রবাসে আসলে আনন্দের জায়গা খুব বেশি না। দিনের পর দিন কাজ, দায়িত্ব, হিসাব নিকাশ আর পরিবারের চিন্তা। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে বন্ধুরা যখন পাশে থাকে, তখন একটা তাম্বুলার মাঠও পাঁচ তারকা বিনোদনের জায়গা হয়ে যায়।
সেদিন একটা জিনিস বুঝেছিলাম, আনন্দ সব সময় বারের ভেতরে থাকে না। কখনো কখনো আনন্দ একটা তাম্বুলার টেবিলে বসে থাকে। কখনো বন্ধুর হাসির মধ্যে থাকে। কখনো রাত দুইটার গাড়ির যাত্রায় থাকে।
আর কখনো কিংফিশার না পেয়েও মানুষ খুব আনন্দে বাড়ি ফিরতে পারে।
প্রবাস জীবন এমনই। টাকা কামাই করতে এসে মানুষ শেষ পর্যন্ত কিছু টাকা দিয়ে নয়, কিছু গল্প দিয়ে দেশে ফেরে। সেই গল্পগুলোর দামই হয়তো সবচেয়ে বেশি।
