Ecommerce/blog/news portal

আত্মমূল্যায়ন

মানুষ বারবার নিজের ভুলের কথা সবার সামনে বলে, এর একটা বড় কারণ হতে পারে মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো বের করে দেওয়ার প্রয়োজন। সব মানুষ নিজের কষ্ট, অপরাধবোধ কিংবা আফসোস নিজের মধ্যে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারে না। কাউকে নিজের ভুলের গল্প বলা অনেক সময় নিজের কাছেই নিজের বিচার করার একটা উপায় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ তখন আসলে অন্যদের কাছে শুধু গল্প করে না, নিজের অতীতকে নতুন করে বুঝতে চায়। সে যেন বলতে চায়, আমি ভুল করেছি, আমি সেটা এখন বুঝি। আমার তখনকার আমি আর আজকের আমি এক মানুষ হলেও চিন্তায় এক মানুষ নই।একাকিত্ব এই অনুভূতিকে অবশ্যই বাড়িয়ে দিতে পারে। মানুষ যখন ব্যস্ত থাকে, তখন বর্তমানের কাজ তাকে ধরে রাখে। কিন্তু যখন চারপাশ নীরব হয়ে যায়, কথা বলার মানুষ কমে যায়, কিংবা জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ নিজের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্ক পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। বিশেষ করে রাতে, একা বসে থাকলে, বিদেশে বা পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকলে, কোনো পুরোনো জায়গা দেখলে, কোনো গান শুনলে, কিংবা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বয়স পার হলে অতীত হঠাৎ খুব জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। তখন মনে হয়, এত বছর আমি কোথায় ছিলাম, কী করেছি, আর কত কিছু অন্যভাবে করা যেত।তবে এটাকে শুধু একাকিত্বের ফল বললে পুরো বিষয়টা ধরা হবে না। এর সঙ্গে বয়সজনিত আত্মমূল্যায়নও জড়িত। মানুষ জীবনের একটা পর্যায়ে এসে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতের দিকে বেশি তাকাতে শুরু করে। তখন সে নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে না দেখে একটা সম্পূর্ণ গল্প হিসেবে দেখতে চায়। কোন সিদ্ধান্ত আমাকে কোথায় নিয়ে গেল, কোন ভুলের কারণে কী হারালাম, কোন মানুষকে অবহেলা করেছি, কোথায় নিজের অহংকার আমাকে আটকে দিয়েছে, এসব প্রশ্ন তখন বারবার ফিরে আসে। মন যেন নিজের জীবনের একটা হিসাব মেলাতে বসে।আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের মস্তিষ্ক ভুলকে অনেক সময় সাফল্যের চেয়ে বেশি শক্তভাবে মনে রাখে। কারণ ভুলের সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে থাকে, লজ্জা, ভয়, অনুশোচনা, অপমান, হারানোর কষ্ট। তাই বহু বছর আগের একটা ঘটনা হঠাৎ করেই মনে পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যে ভুলের কোনো সুন্দর সমাপ্তি হয়নি, যে সম্পর্কের শেষটা ভালো হয়নি, কিংবা যে সিদ্ধান্তের ফলাফল আজও মনে দাগ কেটে আছে, সেগুলো মনের ভেতরে অসমাপ্ত গল্পের মতো পড়ে থাকে। সুযোগ পেলেই সেই গল্প আবার সামনে আসে।আর সবার সামনে বারবার বলার বিষয়টির মধ্যেও একটা গভীর মানসিক প্রয়োজন থাকতে পারে। মানুষ অনেক সময় নিজের ভুলকে স্বীকার করার মাধ্যমে সেই ভুলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে চায়। যতক্ষণ কোনো ভুল শুধু নিজের ভেতরে লুকানো থাকে, ততক্ষণ সেটা একটা গোপন বোঝার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ বলে, হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি, তখন সেই ভুলটা ধীরে ধীরে তার পরিচয় না হয়ে তার জীবনের একটা অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। তবে এখানে একটা সাবধানতার জায়গাও আছে। নিজের ভুল স্বীকার করা ভালো, কিন্তু একই ভুলকে বারবার স্মরণ করে নিজেকে শাস্তি দেওয়া ভালো নয়। অনুশোচনা মানুষকে বদলায়, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মদোষ মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়।সবচেয়ে গভীর সত্যটা সম্ভবত এখানে। মানুষ অতীতের ভুল নিয়ে তখনই বেশি ভাবে, যখন বর্তমানের মানুষটি অতীতের মানুষটির চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে গেছে। আজ আপনি যে ভুলটা বুঝতে পারছেন, সেই ভুল করার সময় আপনি আজকের মতো জ্ঞানী ছিলেন না। তাই অতীতের নিজেকে বর্তমানের জ্ঞান দিয়ে বিচার করলে অনুশোচনা তৈরি হবেই। বরং নিজের অতীতকে এভাবে দেখা দরকার, আমি ভুল করেছি, কারণ তখন আমি যতটুকু বুঝতাম, ততটুকু দিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আজ আমি সেটা বুঝতে পারছি, এটাই প্রমাণ যে আমি বদলেছি।শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে ভুলের শেষ নাই, ভুলের কলাও অন্ত নাই। কিন্তু মানুষের সৌন্দর্য ভুল না করায় নয়, ভুল করার পর নিজেকে বুঝতে শেখায়। একটা বয়সের পর মানুষ যখন নিজের পুরোনো ভুলগুলো মনে করে, তখন আসলে সে শুধু অতীতকে মনে করে না, সে নিজের পরিবর্তনটাকেও দেখতে পায়। তাই অতীত বারবার সামনে আসা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনো কখনো এটা মনের একটা নীরব ডাক, নিজেকে ক্ষমা করো, যা হয়ে গেছে তা থেকে শিক্ষা নাও, আর বাকি জীবনটা একটু বেশি সচেতন হয়ে বাঁচো। কারণ অতীতকে বদলানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু অতীতের অর্থ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart