৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে এক ধরনের নামফলক রাজনীতি চলেছে। কখনো সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম হল, কখনো ওসমান হাদি হল লেখা হয়েছে। এখন সরকার পুরোনো নাম মুছে আবার শেখ মুজিবুর রহমান হল নামটি বহাল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।
মজার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির পক্ষ থেকেও শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বিএনপি অন্তত এই জায়গায় শেখ মুজিবের নামটিকে ছুঁতে চাইছে না।
কিন্তু বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামির অঙ্গন থেকে এ নিয়ে প্রবল আপত্তি উঠেছে।
ফ্রান্সে বসে শায়খুল প্যারিস মওলানা পিনাকী ভট্টাচার্য রাগ করেছেন। ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক রাগ করেছেন। ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদও বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করতেই হবে।
ফরহাদের যুক্তি আরও interesting। তার বক্তব্য, হলটির নাম মুক্তিযুদ্ধের কোনো সংগঠক বা বীরের নামে হতে পারে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কোনো চরিত্রের নামেও হতে পারে, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে হতে পারবে না। কারণ তার ভাষায়, শেখ মুজিবুর রহমান ফ্যাসিবাদের আইকন।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রাখা না যায়, তাহলে কার নাম রাখা হবে?
আমার একটি খুব সরল প্রস্তাব আছে।
হলটির নাম জামায়াতে ইসলামির কোনো নেতার নামে রাখা হোক।
তবে তার আগে বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামির উচিত মগবাজার কিংবা বাংলামোটরে একটি জরুরি সভা ডেকে ইতিহাসের পুরোনো খাতা খুলে বসা।
বাহান্নর ভাষা আন্দোলন।
চুয়ান্নর নির্বাচন।
ছাপ্পান্নর সংবিধান আন্দোলন।
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন।
ছেষট্টির ছয় দফা।
আটষট্টির আগরতলা মামলা।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান।
সত্তরের নির্বাচন।
একাত্তরের মার্চের মুক্তিযুদ্ধ।
এপ্রিলের অস্থায়ী সংবিধান ও মুজিবনগর সরকার গঠন।
ডিসেম্বরে বিজয় অর্জন।
বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় খুলে দেখা হোক।
জামায়াতের এমন কোনো নেতা বা কর্মী কি ছিলেন, যিনি এসব ঐতিহাসিক ঘটনায় এমন কোনো ইতিবাচক ও রাষ্ট্রস্বীকৃত ভূমিকা পালন করেছেন, যার কারণে তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম রাখা যেতে পারে?
যদি থাকেন, তাহলে খুবই ভালো।
নাম প্রস্তাব করা হোক।
ইতিহাসের দলিল সামনে আনা হোক।
তার অবদানের কথা বলা হোক।
দেশের মানুষ বিচার করুক, সেই অবদান একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণের যোগ্য কি না।
কিন্তু যদি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সমস্যাটা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নয়, সমস্যাটা নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে।
কারণ ইতিহাসের একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে।
আপনি কাউকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চাইলে আগে আপনাকে নিজের ইতিহাসটাও খুলে দেখতে হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানকে ফ্যাসিবাদের আইকন বলা খুব সহজ। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক করতে হলে তার আগে তথ্য, দলিল ও ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হয়।
আর একটি নামফলক বদলে দেওয়া মানেই ইতিহাস বদলে দেওয়া নয়।
ইতিহাস নামফলকে থাকে না।
ইতিহাস থাকে মানুষের স্মৃতিতে, দলিলে, রক্তে, সংগ্রামে এবং রাষ্ট্রের জন্মকথায়।
তাই আমার প্রস্তাবটি খুবই সহজ।
জামায়াতে ইসলামি আগে নিজেদের ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করুক। বাহান্ন থেকে নব্বই পর্যন্ত কোন আন্দোলনে তাদের কার কী ভূমিকা ছিল, সেটি তারা নিজেরাই জাতির সামনে তুলে ধরুক।
তারপর তারা একটি নাম প্রস্তাব করুক।
যদি সেই নামের পেছনে ইতিহাস থাকে, অবদান থাকে, জাতীয় স্বীকৃতির ভিত্তি থাকে, তাহলে সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হোক।
আর যদি না থাকে, তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম নিয়ে এত হইচই না করে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের আয়নাটার দিকে একবার তাকানোই বোধহয় বেশি জরুরি।
কারণ অন্যের নামফলক বদলানোর আগে নিজের ইতিহাসের নামফলকটা পরিষ্কার থাকা দরকার।
