Ecommerce/blog/news portal

“পরিশ্রম”আপনার চেহারাটা মনে রাখে

পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নাই। মানুষ জীবনে যত বড় স্বপ্নই দেখুক, সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে তাকে ঘাম ঝরাইতে হয়, সময় দিতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়, অনেক না পাওয়া মেনে নিতে হয়। তবে আমার কাছে পরিশ্রমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, আপনি যখন নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য, নিজের ভবিষ্যতের জন্য এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির আশায় পরিশ্রম করেন, তখন সেই পরিশ্রম আর শুধু পরিশ্রম থাকে না, সেটা আপনার জীবনের একটা সাধনা হয়ে যায়। মানুষের প্রশংসার জন্য পরিশ্রম করবেন না। মানুষ আপনাকে আজ বাহবা দেবে, কাল ভুলে যাবে। মানুষের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আপনার পরিশ্রমের ফল আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে। ভগবদগীতার একটি গভীর শিক্ষা হলো, মানুষের অধিকার তার কর্মে, ফলের ওপর নয়। অর্থাৎ আপনার কাজ হলো নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করা, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। ফল কখন আসবে, কতটা আসবে, সেটা নিয়ে সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকার দরকার নাই। কুরআনের শিক্ষাতেও মানুষের নিজের চেষ্টা ও কর্মের গুরুত্বের কথা এসেছে। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ তার নিজের প্রচেষ্টারই ফল পায়। তাই শুধু দোয়া করলেই হবে না, শুধু প্রার্থনা করলেই হবে না, নিজের জায়গা থেকে চেষ্টাটাও করতে হবে। বৌদ্ধধর্মের শিক্ষাতেও অধ্যবসায়, আত্মসংযম এবং সঠিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব রয়েছে। খ্রিস্টীয় শিক্ষাতেও কাজকে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করার কথা বলা হয়েছে। ধর্মের পথ আলাদা হতে পারে, উপাসনার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু সৎভাবে কাজ করা, মানুষের উপকার করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করার শিক্ষা সব মানুষের জন্যই মূল্যবান। তাই আপনি যখন পরিশ্রম করবেন, কাউকে দেখানোর জন্য করবেন না। মানুষ আপনাকে দেখুক, প্রশংসা করুক, বাহবা দিক, এসবের জন্য পরিশ্রম করবেন না। কারণ মানুষের প্রশংসা আজ আছে, কাল নাই। মানুষের স্মৃতি আজ আপনাকে মনে রাখবে, কাল অন্য কাউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। আপনি নিজের পরিবারের জন্য পরিশ্রম করুন। আপনার সন্তান যেন আপনার কষ্ট দেখে শিখতে পারে, জীবনে কিছু পেতে হলে চেষ্টা করতে হয়। আপনি নিজের জন্য পরিশ্রম করুন, যাতে একদিন আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বলতে পারেন, আমি চেষ্টা কম করি নাই। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী লড়াই করেছি। আমি পড়ে গিয়েছি, আবার দাঁড়িয়েছি। আমি হেরেছি, কিন্তু হাল ছাড়ি নাই। আর যদি আপনি বিশ্বাসী মানুষ হন, তাহলে আপনার পরিশ্রমের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসাটাও রাখুন। তবে ভরসা মানে বসে থাকা নয়। দোয়া করবেন, প্রার্থনা করবেন, তারপর নিজের কাজটাও করবেন। শুধু ভাগ্যের ওপর বসে থেকে সাফল্যের অপেক্ষা করলে জীবন বদলায় না। মনে রাখবেন, সঠিক পরিশ্রম কখনোই বৃথা যায় না। হয়তো তার ফল সঙ্গে সঙ্গে পাবেন না। আপনি এক বছর পরিশ্রম করবেন, দুই বছর করবেন, তারপরও ফলাফল আপনার প্রত্যাশামতো নাও আসতে পারে। তখন মনে হবে, এত কষ্ট করলাম, এত সময় দিলাম, এত চেষ্টা করলাম, তবুও কেন কিছু হলো না। সেই সময়টাতেই আসল পরীক্ষা। যে মানুষ ফল না পেয়েও সঠিক কাজ করে যেতে পারে, যে মানুষ প্রশংসা না পেলেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে, যে মানুষ মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার জন্য পরিশ্রম করতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটাই ভিতর থেকে সবচেয়ে শক্ত মানুষ হয়ে ওঠে। আর একটা কথা মনে রাখবেন, শুধু অনেক পরিশ্রম করলেই হবে না, সঠিক জায়গায় সঠিক পরিশ্রম করতে হবে। ভুল পথে দৌড়ালে দ্রুত এগিয়ে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। তাই পরিশ্রমের সঙ্গে জ্ঞান দরকার, ধৈর্য দরকার, সততা দরকার, পরিকল্পনা দরকার এবং নিজের ভুল থেকে শেখার মানসিকতা দরকার। আপনার আজকের ছোট ছোট চেষ্টা হয়তো আজ কারও চোখে পড়ছে না। আপনার রাত জাগা, আপনার চিন্তা, আপনার ব্যর্থতা, আপনার নীরব কান্না, আপনার পরিবারের জন্য করা ত্যাগ, এগুলোর কোনো সাক্ষী হয়তো নাই। কিন্তু আপনি থামবেন না। কারণ মানুষের চোখে আপনার পরিশ্রমের মূল্য কম হতে পারে, কিন্তু আপনার জীবনে সেই পরিশ্রমের মূল্য একদিন ঠিকই দেখা যাবে। আপনি যতটা পারেন সৎভাবে কাজ করুন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করুন। কারও ক্ষতি করে নয়, কাউকে ঠকিয়ে নয়, অন্যের অধিকার মেরে নয়। নিজের ঘাম দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার চেষ্টা করুন। কারণ অন্যের চোখে বড় হওয়ার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে বড় হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাফল্য শুধু টাকা, বাড়ি, গাড়ি কিংবা পরিচিতির নাম নয়। সাফল্য হলো, আপনি এমন একজন মানুষ হতে পারলেন কিনা, যার কারণে আপনার পরিবার নিরাপদ বোধ করে, আপনার সন্তান আপনার কাছ থেকে ভালো কিছু শেখে, আপনার প্রতিবেশী আপনার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আপনার নিজের বিবেক আপনাকে কোনো প্রশ্ন না করে। কয়েকদিন আগে মেকানিক দোকানদার আবদুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই, আপনার মধ্যে একটা জিনিস আমি দেখছি, আপনি অনেক চিন্তা করেন, আপনি অনেক পরিশ্রমী, আর এই পরিশ্রমের কারণেই আজকে আপনি এত দূরে আসছেন। আবদুল্লাহ ভাইয়ের কথাটা আমার মনে দাগ কেটে গেছে। কারণ জীবনে অনেক সময় আমরা নিজের পরিশ্রমের মূল্য নিজেরাই বুঝতে পারি না, কিন্তু দূর থেকে তাকিয়ে থাকা একজন মানুষ আমাদের সেই পরিশ্রমটা দেখতে পায়। তাই বলি, পরিশ্রম করতে কখনো ফাঁকি দেবেন না। অলসতাকে নিজের বন্ধু বানাবেন না। মানুষের বাহবার জন্য নয়, নিজের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করুন। সৎ থাকুন, ধৈর্য ধরুন, সঠিক পথে থাকুন, আর নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যান। কারণ আজ আপনার পরিশ্রম হয়তো নীরব, কিন্তু একদিন সেই পরিশ্রমই আপনার হয়ে কথা বলবে। –

“পরিশ্রম”আপনার চেহারাটা মনে রাখে Read More »

অনুভূতি

কখনো কখনো জীবনের ছোট্ট একটা ঘটনা আমাদের ভেতরে অনেক বড় একটা উপলব্ধি তৈরি করে।প্রায় এক বছর আগে অনলাইনে একজন মানুষের কাছে আমি কিছু টাকা পাওনা হয়েছিলাম। তার কাছ থেকে প্রোডাক্ট কিনেছিলাম, কিন্তু প্রোডাক্টটা পাইনি, টাকাটাও আর ফেরত পাইনি। বিষয়টা একসময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।হঠাৎ আজকে সেই মানুষটা আমাকে মেসেজ দিয়ে বললেন, ভাই, আমার কাছে একটু গিল্টি ফিল হচ্ছে। আমি আপনার টাকাটা দিয়ে দিতে চাই। এরপর তিনি আমার সেই পুরোনো পাওনা টাকাটা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মাত্র দুই দিন আগে একজন ক্যান্সার রোগী আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। সামর্থ্য অনুযায়ী আমি তাকে কিছু টাকা সাহায্য করেছিলাম। সেই সাহায্য করার সময় আমি কোনো বিনিময়ের আশা করিনি। শুধু মনে হয়েছিল, একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে দাঁড়ানো উচিত।দুই দিন পর হঠাৎ করে এক বছরের পুরোনো সেই পাওনা টাকা আমার কাছে ফিরে এলো।আমি এটাকে কোনো হিসাবের সূত্র হিসেবে দেখছি না। বরং আমার কাছে এটা একটা সুন্দর আত্মিক অনুভূতি। মনে হলো, আমরা যখন মন থেকে একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, তার জন্য মন থেকে দোয়া করি, তখন হয়তো সেই ভালো কাজের প্রভাব কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনেও ফিরে আসে।আল্লাহ কীভাবে কার রিজিকের দরজা খুলে দেন, সেটা আমরা কেউ জানি না। কখনো মানুষের মাধ্যমে, কখনো এমন কোনো জায়গা থেকে, যেখান থেকে আমরা আর কিছু পাওয়ার আশাই করি না।তাই ভালো কাজ করে সঙ্গে সঙ্গে বিনিময় আশা করবেন না। কাউকে সাহায্য করলে মনে রাখবেন, আপনি হয়তো তার জীবনটা একটু সহজ করে দিচ্ছেন। আর আপনার নিজের জীবনের হিসাবটা আল্লাহ নিজের মতো করে সামলে নিতে পারেন।আমার আজকের উপলব্ধি খুব সহজ।মানুষের উপকার করুন, সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়ের পাশে দাঁড়ান, মন থেকে দোয়া করুন। বিনিময়ে কিছু পাওয়ার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।কারণ রিজিক শুধু টাকা দিয়ে আসে না। কখনো রিজিক আসে শান্তি হয়ে, কখনো মানুষের ভালোবাসা হয়ে, কখনো বিপদের সময় একজন মানুষের হাত হয়ে, আর কখনো এক বছর আগের হারিয়ে যাওয়া পাওনা টাকা হয়ে।আমরা শুধু ভালো কাজটা করে যাই। বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিই।

অনুভূতি Read More »

শিক্ষিত জাতি হলেই হয় না, দীক্ষিত জাতিও হতে হয়একজন মানুষ শিক্ষিত হতে পারেন, অনেক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, দেশের উন্নয়ন করতে পারেন, কিন্তু শুধু শিক্ষিত হলেই একজন মানুষ সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন না। শিক্ষার সঙ্গে যদি নৈতিকতা না থাকে, জ্ঞানের সঙ্গে যদি বিবেক না থাকে, ক্ষমতার সঙ্গে যদি আত্মসংযম না থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা অনেক সময় মানুষের চরিত্রকে আলোকিত করার বদলে ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।শিক্ষিত আর দীক্ষিত, এই দুই শব্দের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে। শিক্ষিত মানুষ জানেন কীভাবে একটি কাজ করতে হয়, আর দীক্ষিত মানুষ বোঝেন কোন কাজটি করা উচিত এবং কোন কাজটি করা উচিত নয়। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, দীক্ষা মানুষকে বিবেক দেয়। শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, দীক্ষা মানুষকে মানবিক করে। শিক্ষা মানুষকে ক্ষমতার কাছে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু দীক্ষা শেখায় সেই ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামো তৈরি করা নয়। রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ অন্য মানুষের অধিকারকে সম্মান করবে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করবে না, ভিন্ন মতের মানুষকে শত্রু মনে করবে না এবং আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার না করে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।একটি দেশের পতন শুধু অর্থনীতির পতন দিয়ে শুরু হয় না। একটি দেশের পতন শুরু হয় মানুষের বিবেকের পতন দিয়ে। যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, যখন ন্যায়ের চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে যায়, যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ভিতরে একটি নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।তাই কোনো রাষ্ট্রনায়ক যদি সত্যিই সুদূরদৃষ্টিসম্পন্ন হন, তাহলে তার দায়িত্ব শুধু জনগণকে শিক্ষিত করা নয়, জনগণকে নৈতিকভাবে সচেতন করাও। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা দিয়ে শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা যায়, কিন্তু পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শের মাধ্যমে দীক্ষিত মানুষ তৈরি করতে হয়।আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে বিবেকবান মানুষ তৈরি করার কাজটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করতে পারিনি। ফলে ডিগ্রি বেড়েছে, জ্ঞান বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা সবসময় সেই অনুপাতে বাড়েনি।ক্ষমতায় থাকা মানুষের দায়িত্ব এখানে আরও বেশি। কারণ একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলে তার প্রভাব সীমিত থাকে, কিন্তু একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি ভুল করলে তার প্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, সমাজও ধীরে ধীরে সেই পথ অনুসরণ করে। আবার নেতৃত্ব যদি বিভাজন, প্রতিহিংসা, অহংকার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, সেটিও সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।তাই আমি মনে করি, রাষ্ট্রনায়ককে প্রথমে নিজের ভেতরেই দীক্ষিত হতে হবে। ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, ক্ষমতার ব্যবহারই মানুষকে বড় করে। একজন নেতা কত বছর ক্ষমতায় ছিলেন, কতটি প্রকল্প করেছেন, কত বড় স্থাপনা তৈরি করেছেন, তার পাশাপাশি ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে, তিনি মানুষের চরিত্র কতটা উন্নত করেছিলেন, মানুষের মধ্যে কতটা সহনশীলতা তৈরি করেছিলেন, ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করেছিলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন একটি সমাজ রেখে গেছেন।বাংলাদেশের মানুষকে শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের বিবেকবান, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ, প্রত্যেকেই এই দেশের মানুষ। রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত। যে শিক্ষা মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, যে রাজনীতি মানুষকে ভিন্নমতের মানুষকে অমানুষ ভাবতে শেখায়, যে ক্ষমতা মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেয় না, সেই শিক্ষা এবং সেই ক্ষমতা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।কোনো একজন ব্যক্তির ওপর বাংলাদেশের সব ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ রাষ্ট্রের পতন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আর রাষ্ট্রের উন্নতিও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ, প্রত্যেকেরই এখানে দায়িত্ব আছে।তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা থাকেন, তাদের দায় অবশ্যই বেশি। কারণ তাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তাই তাদের কাছ থেকেই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি।আমাদের এখন এমন বাংলাদেশ দরকার, যেখানে শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, দীক্ষিত মানুষও তৈরি হবে। এমন মানুষ, যে জানে তার অধিকার আছে, আবার অন্য মানুষেরও অধিকার আছে। এমন মানুষ, যে নিজের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু অন্যের ধর্মকে অপমান করে না। এমন মানুষ, যে দেশকে ভালোবাসে, কিন্তু দেশের ভুলকে ভুল বলতেও ভয় পায় না। এমন মানুষ, যে ক্ষমতাকে সম্মান করে, কিন্তু ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না।একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সেতু, পদ্মা, ভবন কিংবা রাস্তাঘাট নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। মানুষ যদি নৈতিক হয়, সৎ হয়, মানবিক হয় এবং বিবেকবান হয়, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।তাই আজ আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন শিক্ষিত মানুষ তৈরি করেছি, শুধু সেটা নয়। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন ভালো মানুষ তৈরি করেছি। কারণ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করতে পারে, কিন্তু দীক্ষাই মানুষকে মানুষ করে।

Read More »

বাংলাদেশে একসময় বলা হয়েছিল চাকরির বন্যা আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই জবের বন্যার পানি গেল কই।ইউনূস সরকারের সময়টা ছিল মাত্র প্রায় ১৮ মাস। এই সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিল্প এবং কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একটি সরকারি অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, এতে প্রায় এক লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে নতুন কারখানা চালু হলেও সেগুলোর বড় অংশ ছিল ছোট আকারের প্রতিষ্ঠান।২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্যও খুব একটা আশার কথা বলছে না। পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন বলে শিল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।এখন আমার প্রশ্ন খুব সহজ।যে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোর কী হবে।যে শ্রমিকগুলো চাকরি হারিয়েছে, তারা আজ কীভাবে সংসার চালাচ্ছে।যে পরিবারে একজন মানুষ কারখানায় কাজ করে পাঁচজনের সংসার চালাতো, সেই মানুষটি চাকরি হারানোর পর তার পরিবারের দায়িত্ব কে নিচ্ছে।যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান কোথায়।বিনিয়োগ কোথায়।নতুন শিল্প কোথায়।আর সবচেয়ে বড় কথা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে শুধু বেকারত্ব নিয়ে কথা বললে বেকারত্ব কমবে কীভাবে।বেকার মানুষকে শুধু উপদেশ দিয়ে কর্মসংস্থান দেওয়া যায় না। চাকরি তৈরি করতে হলে শিল্প চালু রাখতে হয়, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়, ব্যাংক ঋণের পথ সহজ করতে হয়, বিদ্যুৎ গ্যাসের নিশ্চয়তা দিতে হয়, আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে হয় এবং উদ্যোক্তাকে নিরাপদ পরিবেশ দিতে হয়।কারণ একটি কারখানা শুধু একটি ভবন নয়। একটি কারখানার ভেতরে শত শত পরিবারের রান্নার চুলা জ্বলে।একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো মানে শুধু একজনের আয় বন্ধ হওয়া নয়, একটা পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া।তাই সরকার যে দলেরই হোক, আমার প্রশ্ন সরকারের কাছেই।চাকরির বন্যার প্রতিশ্রুতি যদি সত্যি হয়, তাহলে সেই বন্যার পানি আমরা দেখতে পাচ্ছি না কেন।আর যদি শিল্প প্রতিষ্ঠান একের পর এক বন্ধ হতে থাকে, তাহলে আগামী দিনের লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান হবে কোথায়।দেশের মানুষ রাজনৈতিক স্লোগান কম শুনতে চায়। মানুষ কাজ চায়, নিরাপদ আয় চায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ চায়।কারণ খালি পেটে কোনো সংস্কার, কোনো স্লোগান, কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতাই মানুষের ঘরে শান্তি আনতে পারে না।

Read More »

পালের সাথে চলুন, নিরাপদ থাকুন

আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ওয়াইল্ড বিস্টের পাল যখন একসাথে থাকে, তখন তাদের নিরাপত্তা অনেকটাই বেড়ে যায়। শিকারিরা সাধারণত দুর্বল, অসুস্থ অথবা দল থেকে বিচ্ছিন্ন প্রাণীকে সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়। প্রকৃতির এই দৃশ্য আমাদের মানুষের সমাজের জন্যও একটা বড় শিক্ষা বহন করে।একজন মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন তার বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ কমে যায়। কিন্তু মানুষ যখন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন অন্যায়কারীর জন্য অন্যায় করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ ঐক্য শুধু শক্তি দেয় না, ঐক্য মানুষের মনে সাহসও তৈরি করে।বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা যেন নিজেদের মধ্যে বিভক্ত না থাকে। তবে এই ঐক্য কোনোভাবেই অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। বরং হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাইকে নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে একসাথে দাঁড়াতে হবে।আজ যদি কোনো হিন্দু পরিবার আক্রান্ত হয়, মুসলমান প্রতিবেশীকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। কোনো মুসলমান পরিবার আক্রান্ত হলে হিন্দু প্রতিবেশীকেও তার পাশে দাঁড়াতে হবে। বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ বিপদে পড়লেও একইভাবে সবাইকে পাশে দাঁড়াতে হবে।কারণ একজন মানুষকে রক্ষা করা মানে শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়, নিজের সমাজের মানবিকতাকেও রক্ষা করা।রংপুরের সাহারপুরের মতো কোনো ঘটনায় যদি মানুষের ওপর হামলা হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে অপরাধীর ধর্ম পরিচয় নয়, অপরাধটাই প্রধান বিষয়। তদন্ত সঠিকভাবে হতে হবে, সত্য বের করতে হবে, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা যাবে না এবং অপরাধী যে ধর্মেরই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচ্ছিন্ন মানুষকে ভয় দেখানো সহজ, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সমাজকে ভয় দেখানো কঠিন। তবে ঐক্য মানে কারও বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হওয়া নয়। ঐক্য মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হওয়া।হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক, খ্রিস্টান হোক, এই দেশ সবার। একজনের নিরাপত্তা নষ্ট হলে অন্যজনও নিরাপদ থাকে না।তাই দলবদ্ধ হই, কিন্তু বিদ্বেষের জন্য নয়। একত্রিত হই, কিন্তু প্রতিশোধের জন্য নয়। একসাথে দাঁড়াই, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।যে সমাজে মানুষ বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সেই সমাজকে সহজে ভেঙে দেওয়া যায় না।

পালের সাথে চলুন, নিরাপদ থাকুন Read More »

যে আম পাড়া হয়নি

আমার বাবা খুব দরিদ্র মানুষ ছিলেন। দারিদ্র্য কী জিনিস, সেটা বুঝে ওঠার বয়স তখন আমার হয়নি। কিন্তু এখন পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, বাবার জীবনটা ছিল নদীর মতো, কখনো নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারেনি। আমাদের পুরোনো বাড়ি ছিল গাঙের পাশে। শান্তির হাটের পশ্চিম দিকে যে গাঙটা ছিল, তার পাড়েই ছিল বাবাদের বাড়ি। বন্দে আলী ভূঁইয়া বাড়ি , দাদার বাড়ি। সেই বাড়ি, সেই উঠান, সেই মাটি, সবকিছু একদিন গাঙের পেটে চলে গেল। গাঙ ঘর নেয়, উঠান নেয়, গাছ নেয়, মানুষের স্মৃতিও নিয়ে যায়। বাবা মা আমাদের সবাইকে নিয়ে তখন উঠে এলেন জামালপুরে। নানার বাড়িতে। নানা আমাদের থাকার জন্য একটু জায়গা দিলেন। বাবা সেখানে একটা ঘর তুললেন। সেই ঘরেই আমরা থাকতে শুরু করলাম। যতদিন না অন্য জায়গায় একটু জমি কিনে নিজেদের একটা বাড়ি করা যায়, ততদিন সেই ঘরটাই ছিল আমাদের পৃথিবী। আমি তখন খুব ছোট। কত ছোট ছিলাম, সেটা আজ আর মনে নেই। বয়সের হিসাব হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য মানুষের স্মৃতিতে বয়সের চেয়েও বেশি শক্ত হয়ে বেঁচে থাকে। আমারও একটা দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভাসে। আমি তখন বাবার কোলে ছিলাম। বাবা আমাকে কোলে নিয়ে উঠানে হাঁটছিলেন। উঠানের একপাশে একটা আমগাছ ছিল। বাবা হঠাৎ আমাকে কোলে রেখেই আমগাছের দিকে গেলেন। গাছ থেকে একটা আম পাড়বেন, তারপর আমাকে দেবেন। কেন জানি না, সেই দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে আছে। বাবা আম পাড়তে গেলেন। ঠিক তখনই নানী শুরু করে দিলেন গালিগালাজ, চিৎকার চেঁচামেচি । বাবা সেদিকে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মনোযোগ অন্যদিকে চলে গেল। আর সেই আমটা বাবা আমার জন্য আর পাড়লেন না। আমটা পাড়া হলো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পরও সেই আমটা আমার স্মৃতিতে পেকে আছে। জীবনে আমি কত আম খেয়েছি, কত মিষ্টি ফল খেয়েছি, কত ভালো ভালো খাবার খেয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু ছোটবেলায় বাবার হাতে পাড়া সেই আমটা, যেটা আসলে কোনোদিন আমার হাতে আসেনি, সেটাই আজও আমার মনে সবচেয়ে বেশি রয়ে গেছে। ছোটবেলায় ঘটনাটা হয়তো আমার কাছে ছিল একটা অপূর্ণতা। একটা ছোট্ট দুঃখ। একটা অদ্ভুত স্বপ্নের মতো স্মৃতি। কিন্তু এখন বড় হয়ে বুঝি, ওই আমটা শুধু একটা আম ছিল না। ওই আমের মধ্যে ছিল আমার বাবার দরিদ্র জীবন। ছিল আমাদের নদীভাঙা বাড়ি। ছিল গাঙের কাছে হারিয়ে যাওয়া শৈশব। ছিল নানার বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া একটা পরিবার। ছিল বাবার সামান্য সামর্থ্যের মধ্যে সন্তানকে কিছু দেওয়ার চেষ্টা। বাবা হয়তো সেদিন জানতেনই না, তাঁর পাড়া হয়নি যে আমটা, সেটা একদিন তাঁর সন্তানের স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল আম হয়ে থাকবে। জীবন বড় অদ্ভুত। কিছু জিনিস আমরা পেয়েও ভুলে যাই। আর কিছু জিনিস কোনোদিন পাই না, অথচ সারাজীবন বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরি। আমার বাবার সেই আমটা আজও আমার কাছে তেমনই একটা আম। যে আম বাবা পাড়তে পারেননি, কিন্তু যেটা আমার শৈশবের উঠানে আজও ঝুলে আছে।

যে আম পাড়া হয়নি Read More »

শিক্ষিত এবং দীক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক দরকার

শিক্ষিত জাতি হলেই হয় না, দীক্ষিত জাতিও হতে হয় একজন মানুষ শিক্ষিত হতে পারেন, অনেক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, দেশের উন্নয়ন করতে পারেন, কিন্তু শুধু শিক্ষিত হলেই একজন মানুষ সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন না। শিক্ষার সঙ্গে যদি নৈতিকতা না থাকে, জ্ঞানের সঙ্গে যদি বিবেক না থাকে, ক্ষমতার সঙ্গে যদি আত্মসংযম না থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা অনেক সময় মানুষের চরিত্রকে আলোকিত করার বদলে ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষিত আর দীক্ষিত, এই দুই শব্দের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে। শিক্ষিত মানুষ জানেন কীভাবে একটি কাজ করতে হয়, আর দীক্ষিত মানুষ বোঝেন কোন কাজটি করা উচিত এবং কোন কাজটি করা উচিত নয়। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, দীক্ষা মানুষকে বিবেক দেয়। শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, দীক্ষা মানুষকে মানবিক করে। শিক্ষা মানুষকে ক্ষমতার কাছে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু দীক্ষা শেখায় সেই ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামো তৈরি করা নয়। রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে মানুষ অন্য মানুষের অধিকারকে সম্মান করবে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করবে না, ভিন্ন মতের মানুষকে শত্রু মনে করবে না এবং আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার না করে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। একটি দেশের পতন শুধু অর্থনীতির পতন দিয়ে শুরু হয় না। একটি দেশের পতন শুরু হয় মানুষের বিবেকের পতন দিয়ে। যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, যখন ন্যায়ের চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে যায়, যখন মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের ভিতরে একটি নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তাই কোনো রাষ্ট্রনায়ক যদি সত্যিই সুদূরদৃষ্টিসম্পন্ন হন, তাহলে তার দায়িত্ব শুধু জনগণকে শিক্ষিত করা নয়, জনগণকে নৈতিকভাবে সচেতন করাও। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা দিয়ে শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা যায়, কিন্তু পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শের মাধ্যমে দীক্ষিত মানুষ তৈরি করতে হয়। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে বিবেকবান মানুষ তৈরি করার কাজটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করতে পারিনি। ফলে ডিগ্রি বেড়েছে, জ্ঞান বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা সবসময় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ক্ষমতায় থাকা মানুষের দায়িত্ব এখানে আরও বেশি। কারণ একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলে তার প্রভাব সীমিত থাকে, কিন্তু একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি ভুল করলে তার প্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, সমাজও ধীরে ধীরে সেই পথ অনুসরণ করে। আবার নেতৃত্ব যদি বিভাজন, প্রতিহিংসা, অহংকার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়, সেটিও সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমি মনে করি, রাষ্ট্রনায়ককে প্রথমে নিজের ভেতরেই দীক্ষিত হতে হবে। ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, ক্ষমতার ব্যবহারই মানুষকে বড় করে। একজন নেতা কত বছর ক্ষমতায় ছিলেন, কতটি প্রকল্প করেছেন, কত বড় স্থাপনা তৈরি করেছেন, তার পাশাপাশি ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে, তিনি মানুষের চরিত্র কতটা উন্নত করেছিলেন, মানুষের মধ্যে কতটা সহনশীলতা তৈরি করেছিলেন, ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করেছিলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন একটি সমাজ রেখে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষকে শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের বিবেকবান, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ, প্রত্যেকেই এই দেশের মানুষ। রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত। যে শিক্ষা মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, যে রাজনীতি মানুষকে ভিন্নমতের মানুষকে অমানুষ ভাবতে শেখায়, যে ক্ষমতা মানুষকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেয় না, সেই শিক্ষা এবং সেই ক্ষমতা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কোনো একজন ব্যক্তির ওপর বাংলাদেশের সব ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ রাষ্ট্রের পতন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আর রাষ্ট্রের উন্নতিও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ, প্রত্যেকেরই এখানে দায়িত্ব আছে। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা থাকেন, তাদের দায় অবশ্যই বেশি। কারণ তাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তাই তাদের কাছ থেকেই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। আমাদের এখন এমন বাংলাদেশ দরকার, যেখানে শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, দীক্ষিত মানুষও তৈরি হবে। এমন মানুষ, যে জানে তার অধিকার আছে, আবার অন্য মানুষেরও অধিকার আছে। এমন মানুষ, যে নিজের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু অন্যের ধর্মকে অপমান করে না। এমন মানুষ, যে দেশকে ভালোবাসে, কিন্তু দেশের ভুলকে ভুল বলতেও ভয় পায় না। এমন মানুষ, যে ক্ষমতাকে সম্মান করে, কিন্তু ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সেতু, পদ্মা, ভবন কিংবা রাস্তাঘাট নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ। মানুষ যদি নৈতিক হয়, সৎ হয়, মানবিক হয় এবং বিবেকবান হয়, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই আজ আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন শিক্ষিত মানুষ তৈরি করেছি, শুধু সেটা নয়। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কতজন ভালো মানুষ তৈরি করেছি। কারণ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করতে পারে, কিন্তু দীক্ষাই মানুষকে মানুষ করে।

শিক্ষিত এবং দীক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক দরকার Read More »

পলাশ চন্দ্র দে। আমার বন্ধু

আমাদের গ্রামখানি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া এক টুকরো স্বর্গ। গ্রামের পূর্ব দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়, যার গায়ে সকালের রোদ পড়লে সোনার মতো ঝিলমিল করে ওঠে। ছোটবেলায় আমরা দল বেঁধে সেই পাহাড়ে যেতাম কাঠ কাটতে। কাঁধে দা, নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠতাম, পথের ধারে বুনো ফুলের গন্ধ আর পাখির ডাকে মন ভরে যেত। কাঠ কেটে বোঝা বাঁধতাম, তারপর ঘামে ভেজা গায়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরতাম। বর্ষাকাল এলে আমাদের গ্রামের রূপ পাল্টে যেত সম্পূর্ণ। মাঠঘাট জলে ভরে যেত, খাল-বিল একাকার হয়ে যেত চারদিকে। তখন আমরা মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়তাম । কই, শিং, মাগুর, পুঁটি মাছে ভরে যেত আমাদের ডালা। কাদামাখা শরীরে, ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফেরার সেই আনন্দ আজও ভুলিনি। সন্ধ্যা নামলে গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত প্রদীপ। তখন বিদ্যুৎ ছিলো না।, দূর থেকে ভেসে আসত রাখালের বাঁশির সুর।আর শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক।এমনি করে পাহাড়, ছোট নদী, মাঠ, আর সহজ-সরল মানুষের ভালোবাসায় গড়া আমাদের গ্রাম আজও আমার স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে আছে। মেহেদিনগরেই আমার ছোটবেলা কেটেছে। আর এই মেহেদিনগরেই আমার একজন বন্ধু ছিল।তার নাম পলাশ। পলাশ কে এখন মনে করলে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেটা হলো একটা ফুটফুটে সুন্দর ছেলে। চেহারায় একটা অদ্ভুত মায়া ছিল। চুলগুলো ছিল কোকড়ানো। ছোটবেলায় তার মা যখন চুল আঁচড়ে দিতেন, তখন চুলগুলো পুরোপুরি বশ মানত না। একটু পরেই আবার কোকড়ানো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।মায়ের কাছে পলাশ ছিল আদরের ছেলে। বাবার কাছেও। বাড়ির সবার চোখের মণি ছিল সে। আমাদের বন্ধুত্বটা খুব বড় কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হয়নি । আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম। পাশাপাশি বসতাম। একসঙ্গে পড়তাম। একসঙ্গে হাসতাম। কখনো অঙ্ক বুঝতে না পারলে একজন আরেকজনকে বুঝিয়ে দিতাম।হারাধন স্যারের কাছে আমরা দুজন অঙ্ক পড়তাম।হারাধন স্যার অঙ্ক খুব সুন্দর করে বুঝাতেন। তার পড়ানোর মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ ছিল। কঠিন অঙ্কও তিনি এমনভাবে বুঝাতেন, মনে হতো অঙ্ক আসলে কঠিন কোনো জিনিস না। শুধু ঠিক জায়গাটা বুঝে ফেলতে হয়।পলাশ অঙ্কে খুব ভালো ছিল।আসলে ভালো বললে কম বলা হয়। অঙ্কের ওপর তার একটা আলাদা দখল ছিল। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোও খুব ভালো বুঝত। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, এই ছেলেটা যদি ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে, অনেক দূর যাবে। এসএসসিতে আমরা দুজনেই ভালো করলাম। তারপর দুজনেই নিজামপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলাম।সেই সময় আমাদের জীবনটা ছিল খুব সুন্দর।দুজনেই কলেজের হোস্টেলে রুম নিলাম। একই রুমে থাকতাম। একই মেসে খাওয়া দাওয়া করতাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে কাটত।পলাশ বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হলো।আমি বিজ্ঞান থেকে ভালো ফল করেও আর্টসে ভর্তি হলাম। আমার জীবনে তখন একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। কে আমাকে কোন পথে যেতে হবে সেটা বলবে, এমন কেউ ছিল না। পড়াশোনায় আমি খারাপ ছিলাম না। বরং নিজের প্রতি একটু বেশি বিশ্বাস ছিল। কিন্তু জীবনের পথ দেখানোর মতো কোনো গাইড ছিল না।কখনো কখনো একটা ছেলে খুব মেধাবী হয়েও শুধু পথ দেখানোর অভাবে অন্যদিকে চলে যায়।আমার জীবনেও হয়তো তেমন কিছু হয়েছিল। কিন্তু পলাশ বিজ্ঞানেই রয়ে গেল।হোস্টেলের সেই ছোট্ট রুমটা এখনো মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে।দুজনের বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা খাটে কাপড়। টেবিলের ওপর খাতা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে কলেজের মাঠ দেখা যায়।রাতে পড়তে পড়তে কখন যে ঘুম চলে আসত, বুঝতাম না।সকালে একজন আরেকজনকে ডাকতাম।এই ওঠ।ক্লাস আছে।আরেকটু ঘুমাই।আরে বেটা,আরেকটু ঘুমালে স্যার তোরে উঠায় দিবে।এই ছিল আমাদের জীবন। বাড়িতে যাওয়ার আগে বলত, তোর বাড়িতে কোনো খবর দেয়া লাগবে?কখনো পলাশ বাড়িতে যেত।সে বাড়িতে গিয়ে আমার পরিবারের কাছে আমার খবর দিত।আবার আমি যখন বাড়িতে আসতাম, তাকে হোস্টেলে রেখে তার বাড়িতে গিয়ে খবর দিতাম।এই ছোট ছোট কাজগুলো তখন আমাদের কাছে কোনো বিশেষ ব্যাপার ছিল না।বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই। তখন বোঝা যায় না, কোন স্মৃতিটা একদিন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে।পলাশের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল।তার মা আমাকে খুব পছন্দ করতেন।আমি তাকে মাসিমা বলে ডাকতাম।মাসিমা আমাকে দেখলেই খুব আদর করতেন।কখনো লাড্ডু দিতেন।আমি লাড্ডু খেতাম আর ভাবতাম, এই বাড়িতে আসলে আমার নিজের বাড়ির মতোই লাগে।পলাশের বোনও আমাকে খুব শ্রদ্ধা করত। বড় ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে আমার প্রতি তার একটা আলাদা সম্মান ছিল। পলাশ ও আমাদের বাড়িতে আসত।আমার বাবার অসুখ বিসুখ হলে সে ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে আসত। কখনো ইঞ্জেকশন নিয়ে আসত। কখনো স্যালাইন নিয়ে আসত।তখন বুঝিনি, বন্ধুত্বের অর্থ অনেক সময় বড় বড় কথা নয়।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, একজন অসুস্থ মানুষের জন্য ওষুধ নিয়ে বাড়িতে চলে আসা।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তার বাবার পাশে দাঁড়ানো।বন্ধুত্ব মানে হতে পারে, বন্ধুর মা তোমাকে লাড্ডু দিলে নিজের মায়ের মতো করে সেই লাড্ডু খেয়ে ফেলা।পলাশ এমনই একজন বন্ধু ছিল। তারপর জীবন বদলাতে শুরু করল।পলাশের পড়াশোনা আর বেশি দূর এগোতে পারল না।ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ল।তারপর সংসারের চাপ এসে তার সামনে দাঁড়াল। বোনের বিয়ে। পারিবারিক দায়িত্ব।টাকার অভাব। আর তার ওপর বাবার মৃত্যু। বাবা মারা যাওয়ার পর ওর ওপর দায়িত্ব যেন এক লাফে অনেক গুণ বেড়ে গেল। একটা ছেলে তখন আর শুধু ছেলে থাকে না।সে হয়ে যায় পরিবারের ভরসা।মায়ের ভরসা।বোনের ভরসা।ঘরের ভরসা।নিজের স্বপ্ন তখন অনেক সময় নিজের কাছেই ছোট হয়ে যায়। পলাশ ও হয়তো নিজের স্বপ্নগুলো এক এক করে সরিয়ে রাখছিল।তারপর সে ফার্মেসির কাজে ঢুকে গেল।মেহেদিনগর রোডে তাদের ফার্মেসি ছিল।তার বাবা আগে ফার্মেসি চালাতেন। পরে পলাশ সেখানে বসত।ফার্মেসিটা ভালোই চলত।গ্রামের মানুষ তাকে চিনত।কেউ ওষুধ নিতে আসত।কেউ অসুখের কথা বলত।কেউ পরামর্শ চাইত।পলাশ ধৈর্য ধরে সবার কথা শুনত।তার স্বভাবটাই এমন ছিল।মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলতে পারত।আমার তখন বিদেশ নিয়ে অনেক ব্যস্ততা ছিল।এই অংশটা আজ আর বলব না।কারণ কিছু গল্পের কিছু দরজা পরে খুলতে হয়।আজ শুধু এতটুকুই থাক।আমি দূরে ছিলাম।ও মেহেদিনগরে ছিল।ফার্মেসিতে বসত।সংসার করত।মায়ের দেখাশোনা করত।নিজের মতো করে জীবন চালানোর চেষ্টা করত। তারপর একদিন খবর পেলাম, ওর জীবনে ভালো সময় নেই।ধার হয়েছে।অনেক ধার।গ্রামের অনেক মানুষের কাছ থেকে সে টাকা নিয়েছিল।সম্ভবত সব ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি।মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া খুব সহজ।ফেরত দেওয়াটা কঠিন।আর টাকা ফেরত দিতে না পারলে মানুষ শুধু টাকা হারায় না, নিজের মুখটাও হারাতে শুরু করে।একসময় নিজের গ্রামের রাস্তায় হাঁটাও কঠিন হয়ে যায়।কারণ পরিচিত প্রতিটি মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, এই মানুষটার কাছ থেকে তো টাকা নিয়েছি।এই মানুষটাকে তো এখনো দিতে পারিনি।মানুষের চোখের দিকে তাকানো তখন কঠিন হয়ে যায়।পলাশ ও হয়তো সেই কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। এক সময় সে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার দিতে বলেছিলো।আমি তাকে টাকা দিয়েছিলাম।সে পরে সেই টাকা আমাকে ফেরত দিয়েছিল।এই ঘটনাটা খুব ছোট মনে হতে পারে।কিন্তু আমার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ।কারণ ও কৃতজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার মানুষ ছিল না।টাকা নেওয়ার সময় সে যেভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল, সেটা আমার মনে আছে।আর টাকা ফেরত দেওয়ার সময়ও তার মধ্যে সেই মানুষটাকেই দেখেছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে সে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেল।শুধু আমার কাছ থেকে না।আমাদের গ্রাম থেকে।তারপর একদিন শুনলাম, সে তার মা, বোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে

পলাশ চন্দ্র দে। আমার বন্ধু Read More »

রংপুরের ৪খুনের অবাক করা তথ্য /ভোর পর্যন্ত জীবিত ছিল পরিবার

রংপুরের চার খুন, পুলিশের বয়ানের বাইরে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মিলল না রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের করুণ পরিণতি নয়, এই ঘটনা এখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, আমরা কি সত্যিটা জানতে পারব। চারটি প্রাণ চলে গেছে, একটি পরিবার পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, তারা হত্যার পর বাড়ির ভেতরে গোসল করেছে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খেয়েছে এবং পরে আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করে ঘটনাটিকে অন্য রকম দেখানোর চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার দুই তরুণ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু এখানেই মানুষের প্রশ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং শুরু হচ্ছে। কারণ কোনো মামলায় পুলিশের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটাই শেষ সত্য নয়। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, সময়ের হিসাব, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ময়নাতদন্ত এবং আদালতে যাচাইযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে। আর এই মামলায় ইতোমধ্যেই এমন কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের জানা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে নিহত আগামী চক্রবর্তীর কথিত একটি শেষ মেসেজকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে, ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে আগামী তাঁর পরিচিত একজনকে বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়ে মেসেজ করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। যদি স্ক্রিনশটটি সত্যি হয় এবং সময়ের তথ্যটি প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা যায়, তাহলে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটকে চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। ওই মেসেজ সত্যিই আগামী পাঠিয়েছিলেন কি না, কোন ডিভাইস থেকে পাঠানো হয়েছিল, সার্ভার বা প্ল্যাটফর্মের তথ্য কী বলছে এবং সেই সময় তাঁর ফোনের অবস্থান কোথায় ছিল, এসব ফরেনসিকভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ একটি সত্যিকারের ডিজিটাল প্রমাণ পুরো মামলার সময়ের হিসাবই বদলে দিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়িটি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের বক্তব্যেও বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ কখন বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, কে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, মিটার বা বৈদ্যুতিক লাইনে কোনো কারসাজির চিহ্ন ছিল কি না, বিদ্যুৎ বিভাগের রেকর্ড কী বলছে, এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, সেটি হলো গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট। ঘটনাস্থলে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর পরনের শার্টের সঙ্গে সিদ্ধার্থের পরনের শার্টের মিল দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাস দাবি করেছেন, পুলিশ যখন সিদ্ধার্থকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে যায়, তখন তার গায়ে নকশার ওই শার্ট ছিল না, গায়ে ছিল একটি গেঞ্জি। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, শার্টটি আড়ংয়ের এবং একই ধরনের শার্ট অনেক মানুষের কাছেই থাকতে পারে। তাঁর দাবি, সিদ্ধার্থকে যখন হেফাজতে নেওয়া হয় তখনও তার গায়ে ওই শার্ট ছিল। এখানে কাউকে দোষী বলার মতো কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু প্রশ্নটি তদন্ত করে পরিষ্কার করা খুবই সহজ। সিদ্ধার্থকে প্রথম আটক করার সময়ের ভিডিও ফুটেজ কোথায়, কে তাকে প্রথম দেখেছে, তখন তার পরনে কী ছিল, পুলিশের বডি ক্যামেরা বা ঘটনাস্থলের ভিডিওতে কী দেখা যায়, আদালতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তার পোশাক কার হেফাজতে ছিল, এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে শার্ট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। একটি মামলায় এমন ছোট একটি বিষয়ও কখনো কখনো বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করে। আরও একটি বড় প্রশ্ন পুলিশের কথিত ইয়াবা সেবনের কাহিনী নিয়ে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে ওই বাড়ির ছাদে গিয়েছিল এবং গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলায় হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে একে হত্যার শিকার হন। পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে দুই তরুণকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, পাশের নির্মাণাধীন ভবনটি যদি ফাঁকা ও নিরিবিলি হয়ে থাকে, তাহলে মাদক সেবনের জন্য দুই তরুণ কেন একটি বসতবাড়ির ছাদ বেছে নেবে। তারা সেখানে কীভাবে প্রবেশ করল, তাদের গতিবিধি কোনো সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে কি না, মোবাইল ফোনের অবস্থান কী বলছে, ঘটনাস্থলে পাওয়া মাদক বা মাদক সেবনের সরঞ্জামে তাদের আঙুলের ছাপ বা ডিএনএ পাওয়া গেছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরই আসল সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। এদিকে গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনদের পক্ষ থেকে বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবির একটি ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এই তথ্যও তদন্তের বাইরে রাখা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার করে বলা দরকার, চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল বলেই এই হত্যাকাণ্ড তার কারণে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। তদন্তকারীদের উচিত এই সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা, পাশাপাশি ডাকাতি, ব্যক্তিগত বিরোধ, মাদক, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সবগুলো সম্ভাবনা সমান গুরুত্বে যাচাই করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিহত পরিবারটির জন্য সত্যের কোনো বিকল্প নেই। গণপতি চক্রবর্তী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ছোট ছেলেটিও এই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে। একটি পরিবার শেষ হয়ে গেছে। এখন যদি তদন্তে কোনো ভুল হয়, যদি তাড়াহুড়ো করে কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলা হয়, অথবা প্রকৃত অপরাধী কিংবা অপরাধের পেছনের অন্য কোনো কারণ আড়ালে থেকে যায়, তাহলে শুধু একটি মামলার বিচারই ব্যর্থ হবে না, মানুষের রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই অভিযুক্ত আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু জবানবন্দি দিয়েছে মানেই তদন্তের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে, এমনটা বলা যায় না। জবানবন্দির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত, মোবাইল ফোনের তথ্য, ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যের মিল থাকতে হবে। ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে আজকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখন এই তথ্য পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে কীভাবে মিলে যায়, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। এই কারণেই মামলার তদন্তভার ডিবিতে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখন নতুন করে পুরো ঘটনাটি যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কে কখন কোথায় ছিল, বাড়িতে কে ঢুকেছিল, কে বের হয়েছিল, বিদ্যুৎ কখন বন্ধ হয়েছিল, মোবাইল ফোনগুলো কখন সক্রিয় ছিল, কথিত শেষ মেসেজের সত্যতা কী, অভিযুক্তদের পোশাক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার বাস্তবতা কী, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত কার সঙ্গে মেলে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময় কতটা, এবং সবচেয়ে বড় কথা, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী

রংপুরের ৪খুনের অবাক করা তথ্য /ভোর পর্যন্ত জীবিত ছিল পরিবার Read More »

সরকার বদলেছে, মানুষের ভাগ্য কি বদলেছে?

সরকার বদলেছে, ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, নেতৃত্বের মুখ বদলেছে, এখন বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাজনীতির স্বরূপও কি বদলাবে, নাকি শুধু ক্ষমতার হাতটাই বদলাবে। এই প্রশ্নটা কোনো দলের বিরুদ্ধে না, কোনো দলের পক্ষে না, এই প্রশ্নটা দেশের সাধারণ মানুষের। কারণ মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে নাই, মানুষ অপেক্ষা করছে নিজের জীবনের পরিবর্তনের জন্য। মানুষ চায় বাজারে গেলে নিত্যপণ্যের দাম যেন তার সামর্থ্যের মধ্যে থাকে, একজন বাবা যেন সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থাকে, একজন শিক্ষিত তরুণ যেন চাকরির আশায় বছরের পর বছর ঘুরতে না হয়, একজন ব্যবসায়ী যেন ঘুষ আর হয়রানি ছাড়া নিজের ব্যবসা করতে পারে, একজন কৃষক যেন নিজের ফসলের ন্যায্য দাম পায়, একজন শ্রমিক যেন তার শ্রমের সম্মান পায়, একজন সাধারণ মানুষ যেন থানায় গেলে ভয় না পায়, অফিসে গেলে ঘুষ না দিতে হয়, হাসপাতালে গেলে অসহায় হয়ে ফিরতে না হয়। মানুষ চেয়েছিল এমন একটা রাষ্ট্র, যেখানে দল পরিচয় দিয়ে বিচার হবে না, ক্ষমতার কাছের মানুষ আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা আইন থাকবে না, যেখানে অন্যায় করলে সে যে দলেরই হোক, তাকে জবাব দিতে হবে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মানুষের মনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার জায়গাটা এখনো খুব গভীর। মানুষ জানতে চায়, এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত কান্না, এত স্বপ্নের পরে আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলে হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। শুধু নতুন মন্ত্রী দরকার না, নতুন চিন্তা দরকার। শুধু নতুন সরকার দরকার না, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা দরকার। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে, অনেক স্লোগান শুনেছে, অনেক নির্বাচনী ইশতেহার দেখেছে, কিন্তু এবার মানুষ কথার চেয়ে কাজ দেখতে চায়। মানুষ দেখতে চায়, দুর্নীতি কমেছে কি না, বাজারের আগুন কমেছে কি না, কর্মসংস্থান বেড়েছে কি না, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, ব্যাংকিং খাতের আস্থা ফিরেছে কি না, প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্য সহজ হয়েছে কি না, বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস বেড়েছে কি না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে পারে, রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো হতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের ঘরে যদি বাজারের ব্যাগ ছোট হয়ে যায়, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি ভয় বাড়ে, চাকরির দরজা যদি বন্ধ থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল মানুষ নিজের জীবনে অনুভব করতে পারবে না। অর্থনীতির আসল পরীক্ষা কাগজের হিসাব না, মানুষের সংসারের হিসাব। রাজনীতির আসল পরীক্ষা বক্তৃতার মঞ্চ না, মানুষের জীবনের বাস্তবতা। তাই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দেশ চালানো না, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ কাউকে চিরস্থায়ী ক্ষমতা দেয় না, জনগণ দায়িত্ব দেয়, আর সেই দায়িত্বের হিসাব একদিন জনগণের কাছেই দিতে হয়। আজ যারা ক্ষমতার ঘরে বসে আছেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এই চেয়ার কারও বাপ দাদার সম্পত্তি না, এই চেয়ার জনগণের আমানত। জনগণ যদি দেখে তাদের কষ্ট কমেছে, তাদের নিরাপত্তা বেড়েছে, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছে, তাদের কথা রাষ্ট্র শুনছে, তাহলে মানুষ সরকারকে ভালোবাসবে। কিন্তু যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসে, যদি দলীয় পরিচয় আবার যোগ্যতার ওপরে চলে যায়, যদি দুর্নীতি আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, যদি ক্ষমতাবানরা আবার আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তাহলে শুধু সরকারের নাম বদলাবে, মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে পাঁচ বছর পর পর শুধু ক্ষমতার মালিক বদলাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন একই জায়গায় পড়ে থাকবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে সরকার বদলালে মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম হবে, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের জন্য, রাষ্ট্র হবে নাগরিকের জন্য, আইন হবে সবার জন্য সমান, আর ক্ষমতা হবে সেবা করার দায়িত্ব। তাই আজ প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু উত্তরটা অনেক কঠিন, সরকার বদলেছে, এবার কি রাজনীতির স্বরূপ বদলাবে, দেশের মানুষের ভাগ্য কি সত্যিই বদলাবে, মানুষ সরকারের কাছে যে অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সুশাসন আর সম্মান চেয়েছিল, মানুষ কি সেগুলো পাবে। এই প্রশ্নের উত্তর এখন বক্তৃতায় দেওয়া যাবে না, উত্তর দিতে হবে কাজ দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, মানুষ ফলাফল দেখতে চায়। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন তখনই সত্যিকারের পরিবর্তন হবে, যখন সেই পরিবর্তনের আলো গিয়ে পৌঁছাবে গ্রামের কৃষকের ঘরে, শ্রমিকের ঘরে, মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে, বেকার তরুণের চোখে, ছোট ব্যবসায়ীর দোকানে, মায়ের চিন্তায় আর সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্নে। সরকার বদলেছে, এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার, শুধু ক্ষমতার মানুষ বদলায় নাই, বাংলাদেশ বদলানোর রাজনীতিটাও সত্যিই বদলেছে।

সরকার বদলেছে, মানুষের ভাগ্য কি বদলেছে? Read More »

Shopping Cart